মাইকেল এ. বেকারঃ
গেল সপ্তাহে দ্য হেগের গ্রেট হল অব জাস্টিস অব দ্য পিস প্যালেসের মঞ্চে গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের যে তর্কযুদ্ধ হয়ে গেল, তার সম্ভাব্য ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এখন বোঝার চেষ্টা করছি।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, ২০১৬ সালে দেশটির সরকার সেখানকার রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর গণহত্যার মাত্রায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে দেশটি ১৯৪৮ সালের আন্তর্জাতিক জেনোসাইড কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে।
জেনোসাইড কনভেনশনের সদস্যদেশ হিসেবে গাম্বিয়া ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। গত সপ্তাহে যে শুনানি হয়েছে, তা এই মামলার প্রথম ধাপ। মিয়ানমারে গণহত্যার ঝুঁকিতে থাকা অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের যাতে এখনই নিরাপত্তা দেওয়া যায় এবং গণহত্যার প্রমাণ ও আলামত যাতে মিয়ানমার নষ্ট করতে না পারে, সে জন্য মামলার এই প্রথম ধাপেই গাম্বিয়া আইসিজেকে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছে। নতুন বছরের শুরুতেই আদালত আপৎকালীন বা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এই মামলায় অভিযোগ এতটাই গুরুতর যে এ বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় দিতে কয়েক মাস নয়, বরং কয়েক বছর লেগে যাবে। তবে এই প্রাথমিক শুনানি অত্যন্ত গুরুত্ববহ এবং নানা দিক থেকে এটি সত্য উন্মোচনের পথ খুলে দিয়েছে।
প্রথমত, এই শুনানি মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে একটি কাঠামোগত আইনি মাপকাঠিতে পর্যালোচনা করার সুযোগ করে দিয়েছে। এবং এর মধ্য দিয়ে বেশ কয়েকটি বিষয়কে আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে আনা সম্ভব হয়েছে।
গাম্বিয়া ৫৭টি দেশের সংগঠন ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সমর্থন নিয়ে এই মামলা করেছে এবং তারা হয়তো ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর কাছ থেকে আর্থিক ও আইনি পরামর্শের সহায়তা পেয়েছে—এই ভাষ্যই মিয়ানমার বারবার তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। এটি যদি সত্যি হয়েও থাকে, তাহলেও আইনি দিক থেকে গাম্বিয়ার কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। গাম্বিয়া একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে মামলাটি করেছে এবং এ বিষয়ে সে যার কাছ থেকে ইচ্ছা সহায়তা নিতে পারে।
মিয়ানমারের যুক্তি ছিল, গাম্বিয়ার অভিযোগ উত্থাপনের এখতিয়ারই থাকতে পারে না। তাদের কথা হলো, আইসিজেতে যদি মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ তোলার এখতিয়ার কারও থেকে থাকে, তাহলে সেটি হলো বাংলাদেশ। কারণ, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের আশ্রয়ে আছে। মামলার দ্বিতীয় ধাপেও মিয়ানমার গাম্বিয়ার এই এখতিয়ারকে বাতিল ঘোষণার দাবি তুলতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এই শুনানিতে মামলার মেরিট পর্যালোচনায় মিয়ানমার যে একটি বড় ধাক্কা খেয়েছে, তা পরিষ্কার হয়েছে। শুনানিতে মিয়ানমার প্রথম থেকেই তাদের সেনাবাহিনীর ভাষ্যকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে। তারা আদালতকে বোঝাতে চেয়েছে, রাখাইনে অভ্যন্তরীণ সংঘাত ছাড়া কিছু হয়নি এবং অভ্যন্তরীণ ‘সন্ত্রাসীদের’ দমন ও ‘জননিরাপত্তা’ নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালানোর এখতিয়ার আছে।
মিয়ানমারের আইনজীবীরা বোঝাতে চেষ্টা করেছেন, রোহিঙ্গাদের হত্যার উদ্দেশ্যে নয়, মূলত তারা যাতে রাখাইন ছেড়ে চলে যায়, সে জন্যই তাদের ওপর কঠিন অবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের এই যুক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গণহত্যার বিচারের উদ্দেশ্যে গঠিত এই আদালতে এখন মিয়ানমারে গণহত্যার বিষয়টি প্রমাণ করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোনো গোষ্ঠীর কিছু সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে—এটা প্রমাণ করাই জেনোসাইড কনভেনশনের ধারা ২ ভুক্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। গণহত্যা হিসেবে বিষয়টিকে আমলে নিতে হলে এটি প্রমাণ করতে হবে যে কোনো সুরক্ষিত এলাকায় ঢুকে পরিকল্পিতভাবে সেখানকার সব অথবা আংশিক লোককে মেরে ফেলা হয়েছে।
মিয়ানমারে যে উদ্দেশ্যমূলকভাবে গণহত্যা হয়ে থাকতে পারে, তা আদালত নীতিগতভাবে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু সেখানে পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে—চূড়ান্তভাবে এই সিদ্ধান্তে আসতে সুনির্দিষ্ট জোরালো প্রমাণ দরকার। এটিই মিয়ানমারকে আটকানোর পথে প্রধান বাধা। কারণ, সেনাবাহিনী উদ্দেশ্যমূলকভাবে রোহিঙ্গাদের মারতে যায়নি; বরং তাদের ওপর আসা হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে হতাহত হয়েছে—এই যুক্তি দাঁড় করানোর বহু অনুষঙ্গ মিয়ানমার গুছিয়ে রেখেছে।
মিয়ানমারের যুক্তি মেনে আইসিজে অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ নেওয়া থেকে পিছিয়ে আসবে—এমনটি মনে হয় না। তবে মামলাটি সামনের দিকে গেলে এসব যুক্তিই মামলাটির প্রধান প্রতিপাদ্য হয়ে দাঁড়াবে। একপর্যায়ে মিয়ানমারকে ‘কাউন্টার-ইনসার্জেন্সি’র ব্যাখ্যা দিতে চাপ দেওয়া হবে। তবে এ মুহূর্তে একটি প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাচ্ছে না; সেটি হলো, সন্ত্রাসীদের হামলা প্রতিহত করতে সেনাবাহিনী কাউন্টার-ইনসার্জেন্সির যে তত্ত্ব দিচ্ছে, তার সঙ্গে শিশুহত্যা ও পৈশাচিকভাবে নারী ও শিশুদের ধর্ষণের সম্পর্ক কোথায়? রোহিঙ্গাদের গ্রামে হাজার হাজার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়াও কি কাউন্টার ইনসার্জেন্সির অংশ? এটিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে জাতিগত নির্মূল অভিযানের অভিপ্রায় ছাড়া অন্য কিছু অনুমান করার সুযোগ আছে কি?
সর্বশেষ, আদালতকক্ষে অং সান সু চির উপস্থিতির কারণে এই শুনানির প্রতি মানুষের আলাদা রকমের আকর্ষণ ছিল। শুনানির প্রথম দিন গাম্বিয়ার আইনজীবীরা যখন রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সাধারণ নাগরিকদের হত্যাযজ্ঞ চালানো ও ধর্ষণের নৃশংস বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন সু চির চুপচাপ শুনে যাওয়া ছাড়া কিছুই করার ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয় দিনে সু চি আদালতে নিজের সরকারের সমর্থনে যা বললেন, তা খুবই লক্ষ করার মতো ছিল। তিনি সেনাবাহিনীর এমন কিছু কর্মকাণ্ডের সাফাই দিয়েছেন, যা কোনো বিবেচনায়ই সাফাইযোগ্য বলে আদালতে বিবেচ্য হবে না।
এটা কারও নজর এড়ায়নি যে তিনি তাঁর পুরো ভাষণের কোথাও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি (অবশ্য ‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’ বা আরসা সংগঠনটির নাম তিনি বলেছেন)।
তাঁর ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার না করার এই সিদ্ধান্ত (এই সিদ্ধান্ত মিয়ানমারের পুরো আইনজীবী দল অনুসরণ করে আসছে) অত্যন্ত বাজেভাবে সামনে এসেছে। মানবাধিকারের আইকন হিসেবে চিত্রিত সু চির এই নীতি অনুসরণ তাঁর ভাবমূর্তির স্খলন ঘটিয়েছে বলা যায়। ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি একবারও উচ্চারণ না করে সু চি এবং তাঁর সরকার এই বার্তা দিতে চায় যে তারা মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব স্বীকার করে না। এতে বোঝা যায়, রোহিঙ্গাদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্য তাদের রয়েছে।
গাম্বিয়া গণধর্ষণের যে ভয়াবহ অভিযোগ তুলেছে, তারও গ্রহণযোগ্য জবাব দিতে সু চি ব্যর্থ হয়েছেন। এতেও মিয়ানমারের সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা খর্ব
হয়েছে। উপরন্তু সু চি আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিষয়কে টেনে আনায় রাখাইনে আন্তধর্মীয় সহাবস্থান হুমকিতে পড়তে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি আইসিজেকে মিয়ানমারের নিজস্ব বিষয় নিজেকেই সামলাতে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন।
মিয়ানমারের সামনে যে অভিযোগের পর্বত গাম্বিয়া এনে দাঁড় করিয়েছে, তার বিপরীতে সু চির এসব যুক্তি খুবই হালকা, বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে।
মাইকেল এ. বেকার: ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের সহকারী অধ্যাপক
সূত্রঃ প্রথম আলো






