রামুতে তিন হাজার কুকুর, বিড়ালকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধক টিকা (রেবিস ভ্যাকসিন) প্রদান করা হবে। আগামী ১৪ থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত রামু উপজেলার ১১ ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৩৫টি টিম জলাতঙ্ক টিকাদান কর্মসূচীতে কাজ করবে। পর্যক্রমে রামু উপজেলা সহ কক্সবাজার সদর উপজেলা, পেকুয়া ও চকরিয়া উপজেলায় গৃহপতি কুকুর বিড়াল সহ পথপ্রান্তের কুকুরকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধক টিকা প্রদান করা হবে। জলাতঙ্ক নির্মূলে দরকার সঠিক টিকাদান কর্মসূচী ও জনসচেতনতা।
বুধবার (১০ ডিসেম্বর) দুপুর দেড়টায় রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আয়োজিত রামু উপজেলায় ব্যাপক হারে কুকুরের টিকাদান (এমডিভি) কার্যক্রম অবহিতকরণ সভায় এ তথ্য জানানো হয়। জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচির আওতায় রামু উপজেলায় ১৪ থেকে ১৮ ডিসেম্বর, এই পাঁচ দিনে ৩ হাজারের অধিক কুকুরকে টিকা দেওয়া হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে শতভাগ মরণঘাতী জলাতঙ্ক রোগ মুক্ত করার লক্ষ্যে এ কর্মসূচির পালন করা হচ্ছে বলে সভায় জানানো হয়।
রামু উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু জাফর মোহাম্মদ সেলিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অবহিতকরণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্বরূপ মুহুরী। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. অসীম বরণ সেন, রামু থানার ওসি (তদন্ত) মোহাম্মদ ফরিদ, রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. টিএমএম ইসলাম মিয়াজি, রামু উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক খালেদ শহীদ। অবহিতকরণ সভায় মূল তথ্য উপস্থাপন করেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার এমডিভি প্রোগ্রাম সুপারভাইজার মো. দিলশাদ হোসেন ও মোহাম্মদ ইমরোজ করিম।
সভায় বক্তারা বলেন, জলাতঙ্ক ভাইরাসজনিত মারাত্মক মরণঘাতী সংক্রামক রোগ। এই রোগ প্রান্তিক পর্যায়ে এখনো অনেক অবহেলিত। প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে এই রোগটি শনাক্ত হলেও এর চিকিৎসা পদ্ধতি এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির মাঝে এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেলে মৃত্যু অনিবার্য। মূলত কুকুরের কামড় বা আঁচড় থেকে এ রোগ ছড়ায়। এই রোগকে হাইড্রোফোবিয়া বা পাগলা রোগও বলা হয়। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি পানি দেখলেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে প্রতিবছর জলাতঙ্ক রোগে বহু মানুষ মারা যায়। কুকুরকে টিকা দেওয়ার মাধ্যমে জলাতঙ্ক রোগের বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবু জাফর মোহাম্মদ সেলিম বলেন, কুকুকের কামড়ের পরে জলাতঙ্ক রোগ নার্ভের মাধ্যমে ব্রেইনে পৌঁছাতে ১৫ দিন থেকে ৬মাস সময় লাগে। জলাতঙ্ক শনাক্ত হলেই রোগীর মৃত্যু ছাড়া কোন নিস্তার নেই। কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আক্রান্তস্থানে তাৎক্ষণিক ঘরে থাকা খারযুক্ত সাবানে ১৫ থেকে ২০ মিনিট ভালো করে ধুতে হবে। এবং দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে জলাতঙ্ক প্রতিরোধক টিকা (রেবিস ভ্যাকসিন) দিতে হবে। অবশ্যই আক্রান্ত হওয়ার ২৪ ঘন্টার মধ্যে প্রথম ডোজ দিতে হবে। এরপর নির্ধারিত সময়ে বাকি টিকাগুলো সম্পন্ন হবে।
ডা. টিএমএম ইসলাম মিয়াজি বলেন, সাধারণ গৃহপালিত কুকুর বিড়াল দ্বারা আক্রান্ত হয় বেশি। পথপ্রান্তের কুকুর বিড়াল দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা কম। আক্রান্ত হলে ক্যাটেগরি অনুয়ায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ক্যাটেগরি ১ লেহন (চাটা): শরিরের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া। মনে মনে ভয় লাগবে, সন্দেহ হবে। সন্দেহ দূর করার জন্য লেহন বা হেঁটে যাওয়ার স্থানে সাবান পানি দিতে হবে। যদি না জ্বলতে থাকে তাহলে প্রতিরোধের জন্য শুধু ওয়াশিং দিতে হবে, ভ্যাকসিন দিতে হবে না। যদি জ্বলতে থাকে ( জ্বালা পোড়া) তাহলে বুঝতে হবে চামড়াতে ক্ষত হয়েছে। ভাইরাস ( যদি লালায় বা নখ থেকে থাকে) ক্ষত দিয়ে ভিতরে ঢুকে যেতে পারে। প্রতিরোধের জন্য ওয়াশিং এবং ভ্যাকসিন দিতে হবে। ক্যাটেগরি ২, আঁচড় (যত ছোট বা সামান্যই হোক) এবং রক্ত গড়িয়ে যদি না পড়ে তাহলে ওয়াশিং এবং ভ্যাকসিন দিতে হবে। ক্যাটেগরি ৩, কামড় বা আঁচড় যেখানে রক্ত বের হয়ে গড়িয়ে পড়বে সেই ক্ষেত্রে ওয়াশিং, ভ্যাকসিন এবং আরআইজি দিতে হবে।
তথ্য উপস্থাপনে মো. দিলশাদ হোসেন বলেন, জলাতঙ্ক বিভিন্ন প্রাণির কামড়ে ছড়ালেও, এই রোগটির সংক্রমণে শতকরা ৯৫-৯৯ ভাগ ক্ষেত্রে কুকুর দায়ী। বাংলাদেশে জলাতঙ্কে মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে শিশুদের আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি। শতভাগ মরণঘাতী জলাতঙ্ক মুক্ত করার অভিষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে দেশ। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা সমূহের পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করণের মাধ্যমে জলাতঙ্ক সংক্রমন হ্রাস করাই এই সময়ের মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেশ থেকে জলাতঙ্ক রোগ নির্মূলের নিমিত্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার জুনোটিক ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রামের আওতায় ‘জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচি’ নিরন্তন প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। শুধুমাত্র অবহেলার দরুন প্রতিবছর সারাবিশ্বে প্রায় ৫৯ হাজার মানুষ জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এর মধ্যে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে এ রোগে মৃত্যু হার সবচেয়ে বেশি।
অবহিতকরণ সভায় প্রশাসনিক ও এমডিভি কার্যক্রমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, টিকাদান কর্মসূচীর সদস্য, সাংবাদিক ও জন প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।







