সকালে ছোটদের কলতানে মুখরিত অমর একুশে বইমেলা সন্ধ্যায় ছিল আড্ডা-গল্প, গান-কবিতায় প্রাণবন্ত।
কেউ এসেছেন ঘুরে বেড়াতে, কেউ আবার বিভিন্ন স্টলে পছন্দের বই দেখছিলেন।
মগবাজার থেকে আসা আতিক রহমান ও আনিসা মেহরিন বিকেল থেকেই মেলায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। ছবি তুলেছেন এবং বিভিন্ন স্টলে ঘুরে ঘুরে বইয়ের তালিকা তৈরি করেছেন।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্টলের সামনে কথা হয় তাদের সঙ্গে। আতিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এবার তো মেলা একটু দেরিতে শুরু হয়েছে। প্রতিবারই মেলায় আসা হয়। প্রথম সপ্তাহ থেকে নতুন বইয়ের তালিকা খুঁজে তালিকা করি। শেষ সপ্তাহে একসঙ্গে বই কিনি। এর মধ্য কিছু কিছু বই পছন্দ হলে তাৎক্ষণিক কিনে ফেলি। তবে বেশিরভাগ বই কেনা হয় শেষ সপ্তাহে।”
আনিসা বললেন, “এবার তো মনে হয়েছিল বইমেলা হবেই না। তবুও যে বইমেলা হচ্ছে, এজন্য ভালো লাগছে।”
শুক্রবার সকাল থেকেই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ছিল মুখরিত। সকাল সাড়ে ৯টায় বইমেলা প্রাঙ্গণে হয় শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। আর বেলা সাড়ে ১০টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হয় শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার প্রাথমিক পর্ব।
সকালে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিশুদের নিয়ে অনেক অভিভাবক যান মেলার মাঠে। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মেলায় ছিল ‘শিশুপ্রহর’। বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা ছিল উন্মুক্ত।
এবার শিশুচত্বরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘পুতুল নাটক’। কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার পরিবেশন করে পুতুল নাটক। সঙ্গে ছিল ছোটদের নিয়ে আনন্দ আয়োজন।
রূপন্তি এসেছিল মায়ের সঙ্গে, পাপেট থিয়েটার দেখে মুগ্ধ হওয়ার কথা জানায় সে।
রূপান্তির মা সাবিকুন্নাহার শাপলা বলেন, “আমার মেয়ের বয়স সাড়ে তিন বছর। পাপেট থিয়েটার দেখে খুব আনন্দ পেয়েছে। আমিও বাবার কাছে শুনেছি, গ্রামের মেলায় পুতুল নাচ হত। আমার কখনো দেখা হয়নি। আজকে পুতুলনাটক দেখে ভালো লেগেছে।”
দুপুর গড়াতেই রোদের তীব্রতা কমতে থাকে, লোক সমাগমও কিছুটা বাড়তে থাকে। তবে ছুটির দিনে বিগত বছরে যে উপচেপড়া ভিড় দেখা যেত- তেমনটা এবার ছিল না। যারা এসেছেন, তারা আনন্দ নিয়ে মেলায় ঘুরে বেড়িয়েছেন।
লাবনী প্রকাশনীর সেলস এক্সিকিউটিভ সিয়ামুল হক বলছিলেন, “উপচেপড়া ভিড়ে ঘুরে বেড়ানোর কিছু ভোগান্তিও আছে। সেই জায়গায় আজকের লোক সমাগম সন্তোষজনক। মানুষ আসছে। মেলা তো মাত্র শুরু হল। মেলায় তো প্রথম কয়েক দিন লাগে জমে উঠতে। এবার দ্বিতীয় দিনেই শুক্রবার, ছুটির দিন। মেলা জমে উঠতে শুরু করেছে।”
মেলার মাঠে ঘুরে দেখা যায় কয়েকটি স্টলের নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। কোথাও কাঠামো দাঁড় করানো হচ্ছে, কোথাও রঙের তুলিতে ফুটে উঠছে ভাষা আন্দোলনের প্রতীকচিত্র।
ছাপাখানা প্রকাশনীর স্টলে গিয়ে দেখা যায়, এক পাশে বিক্রি চলছে, অন্য পাশে শিল্পী আঁকছেন একুশে ফেব্রুয়ারি ও জাতীয় পতাকার নকশা।
স্টলের দেয়ালে ছবি আঁকতে ব্যস্ত শিল্পী মাইশা মোবাশ্বেরা বললেন, “সাজসজ্জা দেখে যেন পাঠকরা স্টলে এসে একবার হলেও ঘুরে যায়, এটাই আমাদের চেষ্টা।”
বইমেলায় ফরিদা পারভীনকে স্মরণ
বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হয় ‘স্মরণ: ফরিদা পারভীন’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।
সেখানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মোহাম্মদ রোমেল। আলোচনায় অংশ নেন ড. আবু ইসহাক হোসেন। সভাপতিত্ব করেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার।
মোহাম্মদ রোমেল বলেন, “বাংলাদেশের সংগীত জগতে অনন্য একজন শিল্পী ফরিদা পারভীন। শিশুকাল থেকেই তিনি সংগীত সাধনায় মনোনিবেশ করেন। সংগীতের বিভিন্ন ধারায় বিচরণ করলেও লালনসংগীতের শিল্পী হিসেবেই তিনি সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করেন।
“লালনসংগীতের ভাব, আধ্যাত্মিক কথা ও দর্শন তাকে আকৃষ্ট করেছিল। ফলে শিল্পী হিসেবে তার রূপান্তর ঘটে। ফরিদা পারভীন লালনসংগীতের একজন সাধক-শিল্পী হিসেবে আবিভূর্ত হন। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে লালনের গান পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। এই সাধক-শিল্পী তার অতুলনীয় গায়কীর কারণে উত্তরপ্রজন্মের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।”
ড. আবু ইসহাক হোসেন বলেন, “ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে ভর করে লালনের গান দেশ ও দেশের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। লালনসংগীত ছাড়াও দেশাত্মবোধক ও আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাস লিখতে গেলে ফরিদা পারভীনের নাম অপরিহার্য। তার গান শুনে বিশ্বের প্রখ্যাত অনেক পণ্ডিত ও গবেষক লালনের দর্শন ও গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন।”
ফরহাদ মজহার বলেন, “ভাষার মাসে শিল্পী ফরিদা পারভীনকে নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। লালনের গানের ভাষায় ভাবের যে শক্তি, তা ফরিদা পারভীনের হৃদয়কে স্পর্শ করেছিল। ফরিদা পারভীনের গায়কীর মধ্য দিয়ে লালন আবার নতুন করে আমাদের কাছে হাজির হয়েছেন।”
এদিন ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানেও নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন ফরহাদ মজহার।
নতুন বই
অমর একুশে বইমেলা পরিচালনা কমিটির জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, “দ্বিতীয় দিন মেলায় নতুন বই এসেছে ১৬টি।
এদিন মেলায় ঘুরে দেখা যায়, বাংলা একাডেমি এনেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত অধ্যাপক হিমেল বরকতের ‘বাংলাদেশের কবিতায় উত্তর- ঔপনিবেশিক চৈতন্য’ শিরোনামে গবেষণা গ্রন্থ। কথাপ্রকাশ এনেছে আহমাদ মোস্তফা কামালের বই ‘যৎসামান্য’।
‘শিখা পত্রিকার’ উল্লেখযোগ্য রচনা সংকলন, সম্পাদনা করেছেন অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী৷ সেই সংকলনটি ‘শিখা’ নামে বইমেলায় এনেছে পাঠক সমাবেশ৷
আগামী এনেছে ড. খুরশিদ আলমের ‘সমাজবিজ্ঞানের ধ্রুপদী ও আধুনিক তত্ত্ব’-এর সপ্তম সংস্করণ৷ মাওলা ব্রাদার্স এনেছে সেলিম জাহানের ‘সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতি/ বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত’৷
গান-আবৃত্তি পরিবেশন
বিকেল ৪ টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন কবি আবদুল হাই শিকদার এবং হাসান হাফিজ। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী নূরুল হাসনাত জিলান, আশরাফুল হাসান (বাবু), আরিফুল হাসান এবং সীমা ইসলাম।
সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী আলম আরা মিনু, চন্দা চক্রবর্তী, ইন্দিরা রুদ্র, নাফিজা ইবনাত কবির, মিরাজুল জান্নাত সোনিয়া এবং পারভীন লিপি।
যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন, শিমুল বড়ুয়া (তবলা), রাজিব আহমেদ (কিবোর্ড) মো. মেজবাহ উদ্দিন (অক্টোপ্যাড) ও পল্লব দাস (বেইজ গিটার)।
সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা
সকাল সাড়ে ৯টায় বইমেলা প্রাঙ্গণে হয় শিশুকিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। ‘ক’ শাখায় ৫৪০ জন, ‘খ’ শাখায় ৬২০ জন এবং ‘গ’ শাখায় ২৪৫ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করে।
চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখ।
সকাল সাড়ে ১০টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হয় শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার প্রাথমিক পর্ব।
‘ক’ শাখায় ২১০ জন, ‘খ’ শাখায় ২৭৯ জন এবং ‘গ’ শাখায় ৯৭ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করে।
আবৃত্তি প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
শনিবার যা থাকছে
শনিবার মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায়, শেষ হবে রাত ৯টায়।
বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত মেলায় থাকবে শিশুপ্রহর।
সকাল সাড়ে ১০টায় বইমেলা প্রাঙ্গণে হবে শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার প্রথমিক বাছাই পর্ব।
বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হবে ‘স্মরণ: আহমদ রফিক’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।
সেখানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ইসমাইল সাদী। আলোচনায় অংশ নেবেন মোস্তফা তারিকুল আহসান। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক মনসুর মুসা।
বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
বিডিনিউজ







