এম.এ আজিজ রাসেল:
ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৪২ বছর পুনর্মিলনী উৎসব। আজ রবিবার দিনব্যাপি জমজমাট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ উৎসব পালন করা হয়।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বিদ্যালয়ের ২ জন ছাত্র ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র-শিক্ষক সহ ৬ জনের আত্মত্যাগ কে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণ করেই দিনের কর্মসুচি শুরু করা হয়। সেই সাথে বিদ্যালয়টির ৪০ জন ছাত্র যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তাদেরও সম্মাননা প্রদান করা হয়। বিদ্যালয়ের এ্যাসেম্বলী ক্লাশের ন্যায় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে অনুষ্টানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
২৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পুনর্মিলনী উৎসবে প্রধান অতিথি ছিলেন মন্ত্রী পরিষদ সচিব কক্সবাজারের কৃতি সন্তান মোহাম্মদ শফিউল আলম। মুখ্য আলোচক ছিলেন বরেণ্য শিক্ষাবিদ বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।
উদযাপন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক সোমেশ্বর চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উদ্ভোধনী অনুষ্টানে স্থানীয় এমপি আশেক উল্লাহ রফিক, এমপি সাইমুম সরওয়ার কমল, আমেরিকা প্রবাসী ছাত্র ব্যারিষ্টার রফিক মাহমুদ, প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক এম,এম সিরাজুল ইসলাম বক্তৃৃতা করেন।
বক্তারা বলেন-‘বৃটিশ-পাকিস্থান-বাংলাদেশ ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। গৌরবময় ইতিহাসের এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে হাতে গোনা কয়েকটি। বৃটিশ থেকে মুক্ত, পাকিস্থান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় স্কুলের যে অবদান অনস্বীকার্য, তা ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়। তেমন প্রতিষ্ঠানটি শুধু বিদ্যালয়ের নয়, কক্সবাজারের নয়, এটি বাংলাদেশের গৌরবময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
২৫ ডিসেম্বর ইতিহাস গাঁথা এই বিদ্যালয়ের ১৪২ বছর পূর্তি উৎসব। উৎসবের আনন্দ শুধু কক্সবাজারের নয় এটি বাংলাদেশের আনন্দ। এই বিদ্যালয়ের উৎসবের আমেজের হাওয়া কক্সবাজারের সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে, বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিশ্বময় হাওয়া বইছে। কারণ এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা এখন দেশবিদেশে আলো ছড়াচ্ছে। আর তারা নিজেদের প্রিয় স্কুল কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের গুণকীর্তনের আলো ছড়াচ্ছে।’
সুদীর্ঘ ৪৮ বছর পর নিজের বিদ্যালয়ে এসে ছাত্র বনে গেলেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার হেলাল উদ্দিন আহমদ। বিদ্যালয়ের নতুন-পুরানো সকল ছাত্রের সাথে মিশে গেলেন তিনি। ভুলে গেলেন তিনি সরকারের উচ্চ পদস্থ একজন কর্মকর্তা। সাধারণ পোশাক গায়েই জড়িয়ে সবার সাথে একাকার হয়ে গেছেন। আড্ডা, হৈ চৈ আর আনন্দ ভাগাভাগি করেন স্কুল বন্ধুুদের সাথে। কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের (কসউবি) র্যালী মাতিয়ে দিলো কক্সবাজার শহর। র্যালীর ঢোল, শ্লোগান ও ভেপুর শব্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠে চারিদিক।
প্রথম অধিবেশন শেষে বেলা ১২টার দিকে র্যালীর আয়োজন করা হয়।
র্যালীর উদ্বোধন করেন মন্ত্রী পরিষদ সচিব কক্সবাজারের কৃতি সন্তান শফিউল আলম। এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার কক্সবাজার সদরের চৌফলদন্ডীর সন্তান কসউবির প্রাক্তন ছাত্র হেলাল উদ্দীন।
উদ্বোধনের পর র্যালীটি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে বের হয়ে বাজারঘাটার প্রধান সড়ক হয়ে শহীদ স্মরণি সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা পরিষদ পরিষদ সড়ক দিয়ে র্যালী ফের বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। র্যালীতে নেতৃত্ব দেন মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনের সাংসদ কসউবির প্রাক্তন ছাত্র আশেক উল্লাহ রফিক। আরো ছিলেন, নঈমুল হক চৌধুরী টুটুল,
র্যালীতে অংশ গ্রহণকারীরা ভেপু বাজিয়ে ‘শত বছরের’ উল্লাস প্রকাশ করেন। এসময় বিদ্যালয় নিয়ে তোলা শ্লোগান, ভেপু আর ঢোলের শব্দে চারিদিক মাতোয়ারা হয়ে উঠে। র্যালীতে তরুণ থেকে করে একেবারে ৫০/৬০ দশকের প্রাক্তন ছাত্র পর্যন্ত অংশ নেন।
কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি ৭৮ ব্যাচের ছাত্র হেলাল উদ্দিন আহমদ বিদ্যালয়ের ১৪২ বছর পুনর্মিলনী উৎসবে অংশগ্রহণ করেন। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার বলেন-‘আমার বাবাও এই বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ করেছেন। আমিও এসএসসি পাশ করেছি এই বিদ্যালয় থেকে। এখানে এসে মনে হচ্ছে আবারো ফিরে যাই সেদিনের দিকে।’
৮৩ বছর বয়সের বৃদ্ধ মোহাম্মদ আলী ছাত্র হয়ে এসেছেন নিজের স্মৃতি বিজড়িত এই বিদ্যালয়ে। এসেই তিনি ৬৬ টি বছর আগে ফিরে গেছেন। তিনিও বিদ্যালয়ের পুনর্মিলনী অনুষ্টান উপভোগ করেছেন। বিদ্যালয় আঙ্গিনায় সবার সাথে আচরণ করছেন ছাত্রের মতো।
বিদ্যালয়টির বয়োজেষ্ট প্রাক্তন ছাত্র এবং একই সাথে শিক্ষক সুগত বড়ুয়া হাটতে না পারলেও ছাত্ররা তাকে নিয়ে এসেছেন স্ট্র্রেচারে করে। ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ৩ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ও কে ফোর্সের অধিনায়ক মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনে এই বিদ্যালয় থেকে প্রথম মিছিলও বের করা হয়েছিল বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে। রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফের কন্যা এমপি মাহজাবীন খালেদ আজ তাঁর পিতার স্মৃতি বিজড়িত বিদ্যালয়টির অনুষ্টানে এসে যোগ দেন। এই বিদ্যালয়েরই ছাত্র ছিলেন আরেক খ্যাতিমান মানুষ- স্বাধীন বেতার কেন্দ্রে চরমপত্র খ্যাত এম,আর আকতার মুকুল।
বিদ্যালয়ের এই অনুষ্টানে অনেক ছাত্র তাদের প্রিয় শিক্ষক এম.এম. সিরাজুল ইসলামকে খুশিতে জড়িয়ে ধরেন কান্না করেন। এভাবে শতবর্ষের কোলাহলে এক সাথে সকলে মিলে মিশে উদযাপন করেন কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৪২ বছর পুনর্মিলনী উৎসব।
‘শতবর্ষের কোলাহলে, একসাথে সকলে’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে ১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় তার গৌরবের ১৪২ বছর উদযাপন করেছে প্রাক্তন ছাত্রদের পুনর্মিলনীর মাধ্যমে। দিনব্যাপি আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত বিদ্যায়লটির প্রাক্তন ছাত্রদের পুনর্মিলনী উৎসব।
১৪২ বছরের বিদ্যালয়ের ইতিহাসে এমন আয়োজন আর হয়নি। এটি প্রথম আয়োজন প্রাক্তন ছাত্রদের। দীর্ঘ বছরের পথ চলার সেই দু:খ ঘোচাতে একত্রিত হয় প্রাক্তন ছাত্ররা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রাক্তন ছাত্রসহ ১ হাজার ৮১৯ জন প্রাক্তন ছাত্র নিবন্ধন করেছেন অনুষ্টানের জন্য।
পুনর্মিলনী অনুষ্টান উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক সোমেশ্বর চক্রবর্তী বিদ্যালয়ের ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে বলেন-‘১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হলো কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। ১৮৭৪ সালে বিদ্যালয়টি প্রথমে মাদ্রাসা হিসেবে যাত্রা শুরু করে। এরপর বৃটিশ সরকারের প্রভাবে ও স্থানীয় জনগণের ইচ্ছায় এটি (এম.ই.) মিডল ইংলিশ বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় ১৯০৮ সালে।’
তিনি জানান, ১৯২৫ সালে সর্বপ্রথম বিদ্যালয় থেকে ৬ জন ছাত্র মেট্রিকুলেশান পরীক্ষার জন্য নির্বাচত হয়। তম্মধ্যে ৪ জন প্রথম বিভাগে, ১ জন ২য় বিভাগে কৃতকার্য হয়ে তাক লাগানো সাফল্য সৃষ্টি করে।






