এম.এ আজিজ রাসেল:
চলছে শীতকালীন অবকাশ। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বড়দিন, শুক্র-শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটিতে আগে থেকেই পর্যটকের ঢল নামে কক্সবাজারে। আবার ইংরেজি বর্ষকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণসহ বীচ কার্নিভাল কে সামনে রেখে পর্যটন শহর এখন পর্যটকে টইটুম্বুর। আগত পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিষ্ট পুলিশ সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করলেও হোটেল-মোটেল ও রেস্টুরেন্ট গুলো গলাকাটা বাণিজ্যে নেমেছে।
পর্যটন এলাকার ছোট-বড় অর্ধসহস্রাধিক আবাসিক হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউস, কটেজের কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়ে যাওয়ায় কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ীরা এখনকার সুনাম ক্ষুন্ন করছে প্রতিনিয়ত। যা পর্যটন শিল্পে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রেস্তোঁরা গুলোতে বিক্রি হচ্ছে পঁচা-বাশি খাবার। পর্যটনের ভরা মৌসুমে এসব জায়গায় চরম নৈরাজ্যে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে কক্সবাজারে আগত পর্যটকরা। আর অসাধু গাড়ী চালক ও মালিকরা সুযোগ বুঝে মাইক্রু, টমটম, রিক্সা ও সিএনজিসহ সাধারণ যাত্রী পরিবহণসমূহে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। পর্যটকসহ সাধারণ যাত্রীদের নিকট থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে দ্বিগুন তিনগুন টাকা।
এ কারণে দেশ বিদেশের পর্যটকদের কাছে কক্সবাজারের মান ক্ষুন্ন হওয়ার পাশাপাশি ক্ষুব্ধও হচ্ছেন তারা। এ দিকে পর্যটক আগমণ যেন কক্সবাজারবাসীর জন্য ‘অভিশাপ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হোটেল, রেস্তোঁরা ও পরিবহনসহ প্রায় সকল জায়গায় স্থানীয়দের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
কক্সবাজার পৌরসভার সীমানায় ছোট বড় মিলে সাড়ে ৪’শতাধিক হোটেল মোটেল ও দেড়’শতাধিক রেস্তোঁরা রয়েছে। বিশেষ করে কলাতলী কেন্দ্রীক হোটেল ও রেস্তোঁরাগুলোতে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাণিজ্য চলছে। অফ সিজনে যেসব কটেজে সাধারণত ২’শ টাকা রুম ভাড়া নেয়া হয় সেসব কটেজে এখন ২ হাজার থেকে চার হাজার টাকারও উপরে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। অধিকাংশ রেস্তোঁরায় বিরানীর নামে পঁচা-দূর্গন্ধযুক্ত খাবার বিক্রি করে পর্যটকদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। তবে এ জন্য প্রশাসনের দূর্বলতাকে দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা।
ফেনি থেকে স্বপরিবারে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা আমানত উল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, রবিবার রাতে আমরা কক্সবাজারে পৌঁছি। এরপর ‘আরমান কটেজ’ নামে একটি বাসায় বাধ্য হয়ে ২৫০০ টাকায় রুম ভাড়া নিই। রুমটিতে ঢুকে দেখি একটি ছোট চৌকি ছাড়া আর কিছুই নাই। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এখানে রাত যাপনের পরিবেশ না থাকলেও কোন রকম রাত কাটিয়ে দিই।’
কুমিল্লা থেকে আসা আব্দুল বাসেত নামে আরেক পর্যটক জানান, ‘এলাকার নামে রেস্তোঁরা দেখে ঢাকা রেস্তোরা থেকে আমরা দুই জনের জন্য দুইটি বিরানির প্যাকেট ৩০০ টাকায় কিনে নিই। কিন্তু পঁচা ও বাশি গন্ধের কারণে ‘স্বাদের বিরানী’ খাওয়া সম্ভব হয়নি।
একই কথা জানালেন ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কৌশিক। তিনি বলেন, ‘এবারে কক্সবাজার বেড়াতে এসে মহাঝামেলায় পড়ে গেলাম। টাকা এনেছি সীমিত, খরচের হিসাব দ্বিগুন। রুম ভাড়া নিতে গিয়ে প্রথমে ‘রুম খালি নাই’ জবাব দিলেও পরে টাকা বাড়িয়ে দিলে হোটেল ম্যানেজার রুম বরাদ্ধ দিল। বেড়ানোর জন্য সিএনজি-টমটমে উঠতে গিয়ে ’রিজার্ভ ভাড়া’ না দিলে গাড়ীওয়ালা চাকা ঘুরায়না। এ যেন মহা বিপদ। কক্সবাজারে বেড়াতে এসে এরকম যন্ত্রণায় আর কোন সময় পড়িনি।’
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি ওমর সোলতানের মতে, শহরের আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউস, কটেজ ও সরকারী রেস্ট হাউসে প্রায় লক্ষাধিক মানুষের রাত যাপনের সুবিধা রয়েছে। পুরো ডিসেম্বর মাস জুড়েই আবাসিক হোটেল গুলোতে শতকরা ৭০ ভাগ কক্ষ ভরপুর ছিল। আর সাপ্তাহিক ছুটি ও বড়দিন মিলে টানা তিনদিনের জন্য প্রায় সব হোটেলের কক্ষই অগ্রিম বুক হয় আরও কয়েকমাস আগেই।
এ অবস্থায় বছরের শেষ দিনগুলোতে এবং নতুন বছরের শুরুতে লাখো পর্যটকে মুখর থাকবে কক্সবাজার।
কক্সবাজারের তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের পরিচালক সূত্রে জানাগেছে, একটি কোম্পানি বার্ষিক কনফারেন্স’র জন্য গত বছর থেকে হোটেলের ৭০ শতাংশ রুম বুকিং দিয়ে রেখেছিল।
সৈকত পারের তারকা হোটেল কক্স টু ডে সূত্রে জানাগেছে, ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাদের হোটেলে কোন কক্ষ খালি নেই। প্রায় একই অবস্থা কলাতলির তারকা হোটেল সী-গাল, সাইমন বচি রিসোর্ট, বেস্ট ওয়েস্টার্ন হেরিটেজ, লং বিচসহ তারাকা মানের হোটেলগুলোর অবস্থা একই বলে জানাগেছে। মাঝারি হোটেলগুলোতে রুম পাওয়ার তো কথাই নেই।
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার এইচ এম রায়হান কাজেমী। তিনি বলেন, আবাসিক হোটেলসমূহ সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় নেয়া হয়েছে। এছাড়া ২৪ ঘন্টায় সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে সার্বক্ষনিক নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশের একাধিক টিম। রয়েছে সাদা পোশাকধারী টহল দল।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেনের মতে, পর্যটকদের হয়রানি বন্ধে হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁয় মূল্য তালিকা টাঙানোর নির্দেশনা দেয়া আছে। এসব তদারকিতে মাঠে রয়েছে জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত। তার পরেও ব্যবসায়ীরা অনেক সময় এগুলো মানতে চায় না। তবে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হয়।






