মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর হত্যাযজ্ঞ ও গণধর্ষণ চালিয়েছে। এ ‘সম্ভাবনা খুব বেশি’ যে ওই অভিযান মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল এবং তা সম্ভবত জাতিগত নির্মূলের পর্যায়ে পড়ে। গতকাল শুক্রবার জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যালয়ের এক প্রতিবেদনে এ মন্তব্য করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘“এই নির্মূল অভিযানে” সম্ভবত শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।’
প্রতিবেদন প্রকাশের পর একই দিন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থার হাইকমিশনার জেইদ রা’আদ আল হুসেইন বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতার যে কথা জাতিসংঘ বলেছে, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি। গতকাল সু চির সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয় রা’আদের।
জেনেভায় রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রা’আদ বলেন, ‘আমি সু চির সঙ্গে কথা বলেছি। সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান বন্ধে সব ধরনের চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছি তাঁর প্রতি। তিনি আমাকে বলেছেন, তিনি এ ব্যাপারে তদন্ত শুরু করবেন।’
তবে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থিন কিউয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ‘এগুলো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ এবং আমরা এ ব্যাপারে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা দ্রুত এসব অভিযোগের ব্যাপারে ভাইস প্রেসিডেন্ট ইউ মিন্ত সুইয়ের নেতৃত্বে তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে তদন্তের ব্যবস্থা করব। অবমাননা ও জুলুমের পরিষ্কার প্রমাণ পাওয়া মাত্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের কক্সবাজারের কুতুপালং, নয়াপাড়া, লেদা আশ্রয়শিবিরসহ জেলাটির আট জায়গায় ২২০ জনের বেশি মানুষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) একটি দল। এর মধ্যে রাখাইনের ‘অবরুদ্ধ এলাকা’ মংডু থেকে পালিয়ে আসা ২০২ জন ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। রাখাইনের অন্য এলাকা থেকে আসা দুজন রোহিঙ্গারও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। এই ২০৪ জনের মধ্যে ৭৭ জন পুরুষ, ১০১ জন নারী এবং ২৬ জন শিশু। গত ১২ থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত তাঁদের সাক্ষাৎকার নেয় ওএইচসিএইচআর দল।
এ ছাড়া জাতিসংঘের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের মানবিক সহায়তাবিষয়ক স্যাটেলাইট প্রকল্প (ইউএনওএসএটি), অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তোলা কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিগুলোও পর্যালোচনা করা হয় প্রতিবেদনের জন্য।
রাখাইনে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান বিষয়ে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
৪৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে সাক্ষাৎকার দেওয়া প্রত্যেক রোহিঙ্গাই অভিযোগ করেছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে তাঁদের পরিবারের কেউ না কেউ নিহত হয়েছে। সাক্ষাৎকার দেওয়া নারীদের ২৪ শতাংশ ধর্ষণের শিকার হন বলে অভিযোগ করেছেন।
মিয়ানমারে বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তের কাছে একটি পুলিশচৌকিতে গত বছরের অক্টোবর মাসে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাখাইন রাজ্যে অভিযান শুরু করে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় পরিদর্শক ও সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেয়নি মিয়ানমার।
ওএইচসিএইচআর প্রতিবেদনে বলছে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর গণহত্যা ও গণধর্ষণ চালিয়েছে। এতে বলা হয়, ‘মিয়ানমার বাহিনী যে নবজাতক, শিশু-কিশোর, নারী এবং প্রাপ্তবয়স্কদের হত্যা করেছে; পলায়নরত মানুষের ওপর গুলি চালিয়েছে; গ্রামকে গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে; গণহারে আটক করেছে; ব্যাপক ও পরিকল্পিত ধর্ষণ এবং যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটিয়েছে; উদ্দেশ্যমূলকভাবে খাদ্য এবং খাদ্যের উৎস ধ্বংস করেছে, তা নিশ্চিত করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।’
জাতিসংঘের তদন্তকারীদের কাছে নিজের আট মাস বয়সী শিশু ছেলেকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার বর্ণনা দিয়েছেন এক রোহিঙ্গা নারী। আরেক নারী সেনাদের দ্বারা ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। জানিয়েছেন, বাধা দিতে গিয়ে তাঁর সামনেই প্রাণ দিয়েছে তাঁর পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে।
জেইদ রা’আদ আল হুসেইন বলেছেন, ‘এই রোহিঙ্গা শিশুরা যে নিদারুণ হিংস্রতার শিকার হয়েছে, তা অসহনীয়।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাদের অভিযানের কারণে রাখাইন রাজ্যের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তরাঞ্চল থেকে প্রায় ৬৬ হাজার মানুষ পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তবে সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক কার্যালয় পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ৬৯ হাজার বলে উল্লেখ করেছে।
হাইকমিশনার রা’আদ আল হুসেইন এ নির্যাতনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, নিজের জনগণের ওপর নির্যাতন চালিয়ে মিয়ানমার মানবাধিকারের যে গুরুতর লঙ্ঘন করেছে; তার দায়দায়িত্ব অবশ্যই দেশটিকে নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘কী ধরনের ঘৃণা থেকে একজন মানুষ মায়ের দুধের জন্য ক্রন্দনরত শিশুকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করতে পারে?…এটা কী ধরনের “সাফাই অভিযান”?’
মিয়ানমারের সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। দেশটির কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, রাখাইনে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। রোহিঙ্গারা এই অভিযানকে বিতর্কিত করতে হত্যা, মারধর, গণধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের গল্প যোগ করছে।
সূত্র: প্রথম আলো।






