আমাদের রামু রিপোর্ট:
একদিকে উত্তরাঞ্চলে চলছে বন্যাসৃষ্ট দুর্ভোগ, অন্যদিকে কক্সবাজারে ভেসে আসছে হাজার নিপীড়িত রোহিঙ্গা। এছাড়া ভেসে আসছে তাদের লাশও। দেশের দুই অংশে এমন দুই রকম মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেই আজ পালিত হচ্ছে মুসলিম সম্প্রদায়ের ত্যাগের উৎসব কোরবানির ঈদ।
মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে মুসলমানরা এ উৎসব পালন করেন। কোরবানি থেকে আদর্শিক শিক্ষা হচ্ছে ত্যাগ। আদর্শিক শিক্ষা নিয়ে দেশের বিপদগ্রস্ত মানুষকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন ইসলামিক চিন্তাবিদ, সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা।
ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব এই ঈদুল আজহা। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে প্রায় চার হাজার বছর আগে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তার পুত্র হজরত ইসমাইলকে (আ.) কোরবানি দেওয়ার উদ্যোগ নেন। কিন্তু আল্লাহর অসীম কুদরত ও ইচ্ছায় হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়ে যায়। মূলত হজরত ইব্রাহিমের (আ.) এই ত্যাগের মহিমার কথা স্মরণ করে মুসলিম সম্প্রদায় জিলহজ মাসের ১০ তারিখে আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের আশায় পশু কোরবানি দিয়ে এই ঈদ পালন করেন। ঈদুল আজহার অন্যতম শিক্ষা হচ্ছে, মনের পশু অর্থাৎ কু-প্রবৃত্তি ত্যাগ করা। আরবি ‘আজহা’ ও ‘কোরবান’—উভয় শব্দের অর্থ হচ্ছে উৎসর্গ বা ত্যাগ। কোরবানি শব্দের উৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে আত্মত্যাগ, আত্মোৎসর্গ, আত্ম-বিসর্জন, স্রষ্টার নৈকট্য লাভের চেষ্টা।
কোরবানির এই দৃষ্টান্ত থেকেই মানুষকে সহযোগিতা করার শিক্ষা নেওয়া যায় উল্লেখ করে মুফতি ফয়েজুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোরবানি মহান ইবাদত। যারা সামর্থ্যবান, তাদের কোরবানি দিতেই হবে। মানবতার সেবা করাও আরেকটি মহান ইবাদত। মানবজাতির কল্যাণে মানুষকেই কাজ করতে হয়। মানবতার সেবা করা অপরিহার্য। কিন্তু আমরা একটির সঙ্গে আরেকটি যেন মিলিয়ে না ফেলি। সেদিক খেয়াল রাখতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে যারা বন্যার কারণে অসহায় অবস্থায় রয়েছেন, তাদের সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে সহযোগিতা করা উচিত। কোরবানিও তার আপন জায়গা থেকে দেওয়া উচিত। ঈদকে কেন্দ্র করে যে ধরনের অপচয় হয়, সেই ব্যয়কে কমিয়ে আমরা অসহায় মানুষকে সহযোগিতা করতে পারি। তবে ইবাদতের বিষয়ে কোনও ছাড় দেওয়া যাবে না।’
মুফতি বলেন, ‘কোরবানি থেকে আমরা ত্যাগের শিক্ষা পেয়েছি। এ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে, যারা না খেয়ে আছেন, তাদের সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসা উচিত।’
গত ১২ জুন রাতে প্রবল বর্ষণে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামসহ দেশের ছয় জেলায় দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। পাহাড়ের ভূমি ধসে ১৬৬ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রামের একটি অংশ ও কক্সবাজার জেলা। এই দুর্ঘটনায় কাছের মানুষ যারা হারিয়েছেন, তাদের মুখে হাসি নেই এই ঈদেও। বন্যাদুর্গত এলাকার পাশাপাশি তাদের প্রতিও সরকারের বিশেষ নজর রয়েছে বলে জানিয়েছেন সচিব শাহ্ কামাল। এ সব জেলার জেলা প্রশাসনকেও বিশেষ নজর রাখার জন্য নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণ-সহায়তা কার্যক্রমও মনিটর করা হচ্ছে।
এসব এলাকার মানুষ এখনও বন্যার ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছেন। কেউ কেউ খালি আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন। আবার কেউ স্বজন হারানোর বেদনা দিন যাপন করছেন। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার এসব মানুষের সহযোগিতার জন্য সবাইকে কোরবানি থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন এই বিশেষজ্ঞ।
ইসলামি এই বিশেষজ্ঞর সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও একমত হয়েছেন। তারা বলছেন, মানবতার সেবাও ইবাদত। আর এই সুযোগ নেওয়া উচিত। কোরবানির শিক্ষা থেকে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ ও রোহিঙ্গাদেরও সহযোগিতার কথা বলেছেন বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান ও দলটির জাতীয় ত্রাণ কমিটির প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল্লাহ আল নোমান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে বন্যাদুর্গত মানুষকে সহযোগিতার জন্য সারাদেশে ত্রাণ বিতরণ করছি। বন্যা কবলিত এলাকার মানুষদের সহযোগিতার জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা তাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘কোরবানির যে শিক্ষা সেই শিক্ষা থেকে সবাইকে সহযোগিতার করার আহ্বান জানাচ্ছি।’
এদিকে, গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বিদ্রোহী গ্রুপের সঙ্গে সে দেশের সেনা বাহিনীর সহিংস ঘটনার পর সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে দলে দলে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে থাকে। একইভাবে নাফ নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে জলসীমা অতিক্রম করে রোহিঙ্গারা নৌকা নিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করছে। নো-ম্যান্সল্যান্ডে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে। জলপথে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় নৌকা ঢুবিতে ইতোমধ্যে নারী ও শিশুসহ ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। অনেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের স্রোত দেখে অনুমান করে বলেছেন, গত এক সপ্তাহে অন্তত অর্ধলক্ষ রোহিঙ্গা অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা গত ২৪ আগস্ট থেকে পরবর্তী ৬ দিনে ১৮ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের কথা জানিয়েছিল। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব মানুষ বাংলাদেশে এসেছেন। কিন্তু তাদের গন্তব্য এখনও অজানা। বিজিবি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও প্রশাসন তাদের মানবিক সহযোগিতা করছে।
এই প্রসঙ্গে মুফতি ফয়েজুল্লাহ বলেন, ‘মানবতার সেবায় কোনও জাতি দেশ নেই। আমাদের উচিত বিপদগ্রস্ত মানুষকে সহযোগিতা করা।’
এদিকেও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী কোরবানির শিক্ষা নিয়ে দেশের বন্যাকবলিত এলাকার মানুষদের সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি আমরা সাংগঠনিকভাবে বন্যাকবলিত এলাকায় সহযোগিতা করছি। এছাড়া স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সহযোগিতা করছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমি আজও আমার এলাকায় তিনলাখ নগদ টাকা ও ৮০ বান্ডিল টিন বিতরণ করেছি। প্রত্যেকের সামর্থ্য অনুযায়ী এসব মানুষকে সহযোগিতা করা উচিত।’
তথ্য: বাংলা ট্রিবিউন।






