সুনীল বড়ুয়া,নাইক্ষ্যংছড়ির চাকঢালা থেকে ফিরে,
‘আমি তখন আট মাসের অন্তসত্বা। সেনাবাহিনীর দমন নিপীড়নের কারণে দিন মজুর স্বামী কাজে যেতে পারছিলনা। তাই ঘরে খাবার-দাবার কিছুই নেই। কয়েকদিন ধরে চার ছেলে মেয়ে নিয়ে উপোস ছিলাম। কখন পালাতে হয় ঠিক নেই। এমন পরিস্থিতিতে বোঝা কমাতে পাড়াপড়শীরা ঘরে পালন করা হাঁস মুরগী রান্না করে খাচ্ছে। আমারও দুইটি মুরগী ছিলো। সন্তানেরা খাবারের জন্য পিড়াপিড়ী করায় খাওয়ানোর জন্য একটি জবাই করি। কিন্তু ঘরে তেল-মসল্লা কিছুই নেই। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে তা যোগাড় করি। রান্না করবো এমন সময়ে সেনাবাহিনী আমাদের গ্রামের এক পাশে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। গুলির শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ওই মুরগী রান্না করে খাওয়াতে পারিনি। কাটা মুরগী ফেলে চার ছেলে মেয়েকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। পাহাড়ে-জঙ্গলে ছিলাম এক রাত । এক পর্যায়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে অনেক কষ্টে এখানে চলে আমি। এখানে পেীঁছার পরে প্রায় ৫দিন পরে সন্তানদের মুখে খ¦াবার দিতে পেরেছি’।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির চাকঢালার দুর্গম বড় ছনখোলা এলাকায় অস্থায়ী শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া নবী সোনা এভাবেই মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার কথা বর্ণনা করছিলেন। মিয়ানমারের মংডু উপজেলার তইনছং এলাকার দিন মজুর নুর হোসেনের স্ত্রী নবী সোনা যখন ঘটনার বর্ণণা দিচ্ছিলেন তখন তার কোলে ছিলো তিনদিনের অসুস্থ ঠোঁট কাটা) নব জাতক। ১৫দিন পরে এই ক্যাম্পেই নবী সোনার এই সন্তানটি প্রসব হয়। গত কোরবানীর ঈদের দুইদিন আগে অর্থ্যাৎ ৩০ আগস্ট এই অসুস্থ শরীরে পাহাড়-পর্বত,খাল পেরিয়ে নবী সোনা এই শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন।
নবী সোনা বলেন,হাঁটতে হাটতে পথে রাত হয়ে গেলে পাহাড়ের ভেতরে একটা ঝিরির মধ্যে আমরা বসে ছিলাম। পরদিন সকাল হলে আবার হাঁটা শুরু করি। হাঁটতে পারছিলামনা,ভীষন পেট ব্যাথা করছিল । মনে হচ্ছিল ওখানেই মরে যাব। অনেক কষ্ট ভোগের পর আল্লাহর রহমত ছিলো এখানে পৌঁছেছি।
কিন্তু এখন অসুস্থ শিশুটিকে নিয়েই যতই উৎকন্ঠা নবী সোনার। তিনি বলেন,সন্তান প্রসব হয়েছে গত বৃহস্পতিবার ( ১৫ সেপ্টেম্বর)। ঠোঁট কাটা কেউ বলছে ভাল করতে পারবে,কেউ বলছে পারবেনা। একবার ডাক্তার কতগুলো আসছিল তাদেরকে দেখিয়েছি। তারা বলেছে ভাল করতে ছয়মাস লাগবে। বিজিবি বলেছে তারা ভাল করতে পারবে।
মিয়ানমারের মংডু শহরের তইনছং এলাকা থেকে আসা হাফেজ আহাম্মদের গল্পটি আরো ভয়াবহ। তিনি বলেন, ‘গত ২৯ আগস্ট ভাই হাফেজ মো. হানিফসহ বাংলাদেশে পালিয়ে আসছিলাম। একপর্যায়ে সেনাবাহিনী আমাদেরকে চারপাশ থেকে গুলি করা শুরু করে। একপর্যায়ে আমরা দুইভাই আলাদা হয়ে যাই। কে কোথাই জানিনা। আমি সারাদিন জঙ্গলে লুকিয়ে ছিলাম। সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি একটু শান্ত মনে হলে ভাইকে খুঁজতে জঙ্গল থেকে বের হই। এক পর্যায়ে একটু দূরে ভাইয়ের মরদেহ দেখতে পাই। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখি,মরদেহের দুই পায়ে দুটি বোমা বেঁধে দিয়েছে। তাই ভাইয়ের মরদেহও আর ছুঁতে পারিনি। ওখানে রেখেই আমার এক মামাসহ এখানে চলে আসি।
মংডুর পালইংগ্যাখালীর মো. আয়াছ বলেন,‘লুকিয়ে লুকিয়ে সাত-আটদিন জঙ্গলে জঙ্গলে ছিলাম। সেনাবাহিনি এসে যখন গ্রামে একপাশ থেকে বাড়িঘরে আগুন দেওয়া শুরু করে,গুলি মারা শুরু করে তখন আমরা সবাই মিলে চলে আসি’।
এই শিবিরে আশ্রয় নেওয়া মাহমুদা খাতুন (৩৬) নামের এ নারী বলেন ‘মগেরা যখন আমাদের বাড়ি-ঘরে পোড়া দিচ্ছে আমরা পালিয়ে জঙ্গলে ঢুকে যাই। মাগরিবের পরে জঙ্গল থেকে বের হই। তখন দেখি আবার গুলি মারছে। আল্লাহ রক্ষা করেছে। ছেলের বাপও কোথাই জানিনা। আমি সন্তাদের নিয়ে অন্যদের সাথে এখানে চলে আসি’।
এই শিবিরে আশ্রয় নেওয়া শতবর্ষী মকবুল আহম্মদের যন্ত্রনার গল্প ভিন্ন রকম। তার চোখের সামনেই নির্মমভাবে মানুষ হত্যার দৃশ্য এখনো তার চোখে ভাসছে। প্রাণ বাঁচাতে তাকেও দিনের পর পর পাহাড়-জঙ্গল মাড়িয়ে তাকেও পালিয়ে আসতে হয়েছে এখানে।

‘সেখানে মগেরা মানুষ কেটে ফেলছে। আমার চোখের সামনে একটা ছেলেকে কেটেছে। কত সুন্দর ছেলে। আমার বাড়ির পাশের। গরু-ছাগল পযন্ত কেটে ফেলেছে। গরু একশোর বেশি হবে। পাঁ-সাতজনকে আমার সামনে কেটে তারা চলে গেছে। এই বয়সে আমার কি হাঁটার শক্তি আছে? কি করবো ভয়ে কোনো রকমে পালিয়ে আসি। এভাবেই পালিয়ে আসার পেছনের গল্প শোনান শতবর্ষী মকবুল হোসেন।
শুধু নবী সোনা বা বৃদ্ধ মকবুল হোসেনেরা নন,বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির চাকঢালা,আছাড়তলীর সাপমারা ঝিরি ও ফুলতলি এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে এরকম দুইহাজার তিনশো পরিবারের ২০ হাজার রোহিঙ্গা। এদের বেশিরভাগই নারী-শিশু। নিজের জন্মভুমি ছেড়ে পালিয়ে আসার পেছন এবং সামনের গল্প এরকমই ভয়াবহ।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সদর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে চাকঢালার বড় ছনখোলা এলাকাটি। জায়গাটি এতটাই দুর্গম সাত কিলোমিটারের মতো বিভিন্ন যান বাহনে যাওয়া গেলেও প্রায় তিন কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ী পথ পাড়ি দিতে হয় পায়ে হেঁটে। কক্সবাজারের উখিয়া -টেকনাফে এ ধরনের রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিরে দেশি-বিদেশী বিভিন্ন গণমাধ্যমের ভীড় লক্ষ্য করা গেলেও এখানকার চিত্র ঠিক ভিন্ন। এমনকি কয়েকজন ত্রাণদাতা ও একটি মাত্র মেডিকেল টিম দেখা গেছে। পার্শ্ববরতী রামুর প্রপ্রজন্ম’৯৫ নামের একটি সামাজিক সংগঠন থেকে ত্রাণ দিতে আসেন একদল যুবক। সংহঠনটি সহ-সভাপতি বজলুছ সাত্তার (বস) জানান, উখিয়া-টেকনাফে প্রতিদিন ট্রাকে ট্রাকে ত্রাণ সামগ্রী গেলে এলাকাটি খুব দুর্গম হওয়ায় এখানে কেউ ত্রাণ নিয়ে আসছেন না। খবর শুনে একটু কষ্ট হলে আমরা এখানে আসি। আমরা প্রায় ৩০০ পরিবারের জন্য থামি-লুঙ্গি ও কিছু খাবার-দাবার দিয়েছি।
নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তসলিম ইকবাল চৌধুরী জানান, এখানে ২৩শ পরিবারের প্রায় বিশ হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এদের বেশিরভাগই নারী-শিশু। আগে অনেকেই বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। যারা আছেন ইতিমধ্যে এসব রোহিঙ্গাদের এনালগ পদ্ধতিতে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের সিদ্বান্ত অনুযায়ী নিবন্ধন কাজ শেষ হলেই এদেরকে উখিয়ার বালুখালীতে স্থানান্তর করার কথা রয়েছে। তবে এদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত মেডিকেল টিম পাঠানোর দাবি জানান তিনি।







