অনলাইন ডেস্কঃ
দীর্ঘদিন কর্মস্থলে না গিয়ে নিয়মিত বেতন তুলে নিচ্ছেন অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের তমুক শিক্ষক; খাতা-কলমে হাজির কিন্তু বাস্তবে অনুপস্থিত অমুক প্রতিষ্ঠানের তমুক কর্মকর্তা—এ ধরনের খবর প্রায়ই পত্রিকায় আসে। এসব খবর আমাদের চোখ-সওয়া হয়ে গেছে। কর্মস্থলে কর্মীর অনিয়মিত হাজিরা কিংবা দেরি করে আসা এ সমাজে এতটাই সাধারণ ঘটনা যে, এ নিয়ে নতুন করে কিছু বলারও থাকে না; অর্থাৎ সামাজিকভাবে তো বটেই, এমনকি প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও আমরা বিষয়টিকে একপ্রকার মেনে নিয়েছি। এর মধ্যেও কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ আছেন, যাঁরা কোনো পুরস্কারের আশা না করেই আজীবন কর্তব্যনিষ্ঠায় অবিচল থাকেন। তাঁদেরই একজন যশোরের মনিরামপুর উপজেলার ধোপাদী মাধ্যমিক উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক সত্যজিৎ বিশ্বাস।

তিনি তাঁর ৩১ বছরের শিক্ষকতা জীবনে এক দিনও কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেননি; এক দিনের জন্যও দেরিতে হাজির হননি। নিজের বাবা যেদিন মারা যান, সেদিনও তিনি ক্লাস নিয়েছেন। নিজের বিয়ের দিনও ক্লাস করেছেন। নিজের বাড়ি থেকে সাত কিলোমিটার দূরের স্কুলে সাইকেল চালিয়ে নিয়মিত হাজির হয়েছেন। ঝড়-বৃষ্টি-বন্যা—কিছুই তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি। ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে সত্যজিতের এই কর্মনিষ্ঠার খবর উঠে এসেছে।
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের নানা জটিলতা কর্তব্যের পথে বাধা হয়ে আসে। সে কারণেই সমাজের সবার পক্ষে ‘সত্যজিৎ’ হওয়া সম্ভব নয়। সবাই সত্যজিৎ বিশ্বাসের মতো দৃঢ় কর্তব্যনিষ্ঠ হবে—এমন আশা করাও বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু একটি প্রত্যন্ত গ্রামের একজন অতি সাধারণ স্কুলশিক্ষক হয়ে সত্যজিৎ পুরো জাতির সামনে যে অসাধারণ বার্তা রেখে যাচ্ছেন, তা সবারই উপলব্ধি করা দরকার।
নিয়মানুবর্তিতা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের ক্ষেত্রে সত্যজিৎ নিঃসন্দেহে এক আদর্শের নাম। একটি মহান চেতনার নাম। তাঁকে শতভাগ অনুসরণ করা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু তিনি সবার (বিশেষ করে সব শিক্ষকের) অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। আদর্শ নিয়ে এগিয়ে যেতে প্রতিটি মানুষের সামনে একজন রোল মডেল থাকতে হয়; একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব থাকতে হয়। আদর্শচ্যুত ও ঘুণে ধরা এই সমাজে সত্যজিৎ এক নজিরবিহীন আলোকবর্তিকা।
কূটাভাস হলো এই, বাঙালি হৃদয়ে সত্যজিতরা মনীষীর মতো থাকেন। সেই মনীষী শুধু পূজ্য, অনুসরণীয় নন। তাঁকে অনুসরণ করতে গেলে জাগতিক ভোগ-বিলাস ত্যাগ করা অনিবার্য হয়ে ওঠে। আত্মত্যাগের সেই দৃঢ় চেতনা থেকে জাতি দৃশ্যত বহু দূরে সরে গেছে। সেখান থেকে তাকে আবার ফিরিয়ে আনতে গেলে সেই সত্যজিতের মতো লোকজনই ভরসা। সত্যজিতের কর্তব্যনিষ্ঠা আমাদের নাড়া দিক, আমাদের ঘুম ভাঙাক।
সূত্রঃ প্রথম আলো






