অনলাইন ডেস্কঃ
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন দিল্লিতে, আর বাংলাদেশের সরকারপ্রধান ঢাকায়; ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তারা উদ্বোধন করলেন সহযোগিতার তিনটি প্রকল্প; পারস্পরিক প্রশস্তি বিনিময়ের মধ্যেই তাদের কথায় এল দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীরে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার।

সোমবার বিকালের এই অনুষ্ঠানেই পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর গ্রিড থেকে বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে আরও ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্বোধন হল। কলকাতা থেকে তাই ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এছাড়া আখাউড়া-আগরতলা ডুয়েল গেজ রেললাইন প্রকল্পের বাংলাদেশ অংশ এবং মৌলবীবাজারের কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্পের নির্মাণ কাজেরও উদ্বোধন হয় এ অনুষ্ঠানে। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দেন আগরতলা থেকে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানে বলেন, বহু বছরের পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধাবোধ ও সুনামের কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক আজ পরিপক্কতা পেয়েছে।
“আমি বিশ্বাস করি, আমাদের এ সম্পর্ক বিশ্বের অন্যান্য অংশের জন্য একটি রোল মডেল হয়ে উঠেছে।”
আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলায় বলেন, “আজ আমরা আরও কাছে এলাম। আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হল।”
একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নানাভাবে সহযোগিতা করেছে ভারত। ওই যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন কয়েক হাজার ভারতীয় সেনা।
মাঝে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে কিছুদিন টানাপড়েন থাকলেও হাসিনা ও মোদীর নেতৃত্বে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের উন্নয়নে সমর্থনের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সে বলেন, “এই সুসম্পর্ক আমাদের দৃঢ় আস্থার সঙ্গে পারস্পরিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে।”
বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার ভূমিকার প্রশংসা করে নরেন্দ্র মোদী বলেন, “দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে যাচ্ছে আপনারই নেতৃত্বে।”
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশী দেশের নেতাদের মধ্যে সম্পর্ক হওয়া উচিত প্রতিবেশীদের মতই । এই সম্পর্কের মধ্যে প্রটোকল আসা উচিত নয়।
আগামীতেও এভাবে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশে আরও প্রকল্পের উদ্বোধন করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জনে সাহযোগিতা করতে পারা আমাদের জন্য গর্বের।”
বহরমপুর-ভেড়ামারা গ্রিড আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে ভারত থেকে বাংলাদেশে নতুন করে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানিকে দুই দেশের মধ্যে ‘সোনালী অধ্যায়ের প্রতীক’ হিসেবে বর্ণনা করেন নরেন্দ্র মোদী।
আর আগরতলা থেকে বাংলাদেশের আখাউড়া পর্যন্ত রেল সংযোগের ভিত্তিফলক এবং রেলওয়ের কুলাউড়া-শাহবাজপুর বিভাগের পুনর্বাসন কাজের উদ্বোধনকে তিনি বর্ণনা করেন ‘যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনন্য নিদর্শন’ হিসেবে।
এ দুই প্রকল্প ব্যয়ের সাড়ে ১১ শ কোটি টাকার একটি বড় অংশ আসবে ভারতীয় ঋণ থেকে। এই রেল সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রেলপথে ত্রিপুরা থেকে কলকাতার দূরত্ব ১ হাজার ৬৫০ কিলোমিটার থেকে কমে দাঁড়াবে ৫১৫ কিলোমিটারে।
অন্যদিকে ভারত থেকে এতদিন ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছিল বাংলাদেশ। নতুন ৫০০ মেগাওয়াট যুক্ত হওয়ার পর ভারত থেকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ দাঁড়াল ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াটে।
শেখ হাসিনা বলেন, “বিদ্যুৎ খাত আমাদের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।… ভারত থেকে আরও তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে।”
হাসিনার বক্তব্যের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ভারতের কেন্দ্র সরকারের অনুমতি পেলে পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশে আরও এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিতে পারে।
আর শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে বলেন, ‘মোদীজি’ এ ব্যাপারে সম্মতি দেবেন বলেই তিনি আশা করছেন।
“আমাদের উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য আরও বিদ্যুৎ প্রয়োজন। এজন্য আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোর অধীনে ২০৪১ সালের মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে নয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎআমদানির পরিকল্পনা করছি। আমি আশা করি, এই লক্ষ্য অর্জনে ভারত আমাদের পাশে থাকবে।”
রেল খাতেও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি নিশ্চিত, আমাদের যৌথ প্রচেষ্টার এ ধরনের অনেক সাফল্যগাঁথা আগামীতে আমাদের সামনে উপস্থিত হবে, যা আমরা উদযাপন করার সুযোগ পাব।”
অনুষ্ঠানে মোদীর সঙ্গে উপস্থিত ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এসব প্রকল্পের উদ্বোধনকে দুই দেশের ‘নিবিড় বন্ধুত্বের প্রতীক’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, “দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমাদের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় যাচ্ছে।”
আর মমতা বলেন, “এই প্রকল্পগুলো আমাদের সম্পর্ককে আরও বিল্ড-আপ করবে। বাংলাদেশ ভালো থাকলে আমরা ভালো থাকি। আমরা ভালো থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকে।”
বিপ্লব কুমার বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সরাসরি পণ্য পরিবহনের কথা বলেন। অনুষ্ঠান শেষে তাকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
চলতি বছর বিপুল ভোটে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া বিপ্লব কুমার দেবের পিতৃপুরুষের ভিটা বাংলাদেশের চাঁদপুরের কচুয়ায়। শেখ হাসিনার আমন্ত্রণের জবাবে তিনি বলেন, “আমি আপনার কাছেই প্রথম আসব।”
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতাকেও বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানান শেখ হাসিনা। জবাবে মমতা বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের দিকে ইংগিত করে বলেন, “আপনি জিতুন, আমরা আসব।”
সূত্রঃ বিডিনিউজ





