অনলাইন ডেস্কঃ
দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে আগামী ১ মার্চ থেকে সেন্টমার্টিনে রাতযাপন নিষিদ্ধ হচ্ছে। দ্বীপ রক্ষায় গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে পর্যটকরা দিনের বেলায় দ্বীপটি ঘুরে দেখতে পারবেন।

আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি জানায়, সেন্টমার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ছেঁড়া দ্বীপ ও গলাচিপা অংশে পর্যটকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের চিত্র তুলে ধরে পরিবেশ অধিদফতরের দেয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কমিটি এসব সিদ্ধান্ত নেয়।
বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের সভাপতিত্বে উচ্চ পর্যায়ের এ বৈঠকে নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মহিবুল ইসলাম, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেনসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কপি রোববার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠানো হয়। আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে। এছাড়া স্বল্প মেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদী বিভিন্ন সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় বৈঠকে।
সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সেন্টমার্টিনে নতুন করে কোনো রাস্তা নির্মাণ করা যাবে না; নাফ নদী, দ্বীপে যাওয়া-আসার পথে এবং মূল দ্বীপে কোনো প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা যাবে না; দ্বীপটির সৈকতে মোটর সাইকেল চালানো যাবে না; দ্বীপে রাতের আধারে কোনো আলো জ্বালানো যাবে না; সেন্টমার্টিন রক্ষায় কোন সংস্থার কী করণীয় তা নির্ধারণ করে আগামী এক মাসের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে।
আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্তে আরও বলা হয়েছে, আগামী তিন বছরের মধ্যে প্রতিদিনের পর্যটকের সংখ্যা ৫০০ জনে নামিয়ে আনা হবে। দুটির বেশি জাহাজ চলাচল করতে দেওয়া হবে না। রাতে হোটেলগুলোতে জেনারেটরের সাহায্যে বাতি জ্বালানোর ফলে কচ্ছপের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। তাই রাতে জেনারেটরের সাহায্যে আলো জ্বালানো যাবে না। শুধু সৌরশক্তি ব্যবহার করতে হবে। দ্বীপটিতে ভ্রমণের জন্য টুরিস্ট ফি আরোপ করা হবে। অনলাইনে আবেদন করে পর্যটকদের দ্বীপটিতে যেতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তত্ত্বাবধানে পরিবেশ রক্ষা করে ওই পর্যটন চলবে। দ্বীপে সব ধরনের নতুন স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করে পুরোনো স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা হবে। সেখানে জমি কেনা বেচা সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে। দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার আওতায় পুরো দ্বীপের ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে। দ্বীপটির মালিকানা সরকারের হাতে নিয়ে বসবাসকারীদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। দ্বীপটিতে মোটরসাইকেল, গাড়ি, স্পিডবোট চলাচল করতে পারবে না। সমুদ্রসৈকতটির ভাঙন রক্ষায় জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। এতে তীরের মহামূল্যবান প্রবালের ক্ষতি হচ্ছে এবং ভাঙন বাড়ছে। ওই ব্যাগ ফেলানো বন্ধ করতে বলেছে কমিটি।
২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে সেন্টমার্টিন নিয়ে দৈনিক সমকালে চার পর্বের সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এসব প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওই বছরের ২১ মার্চ বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) করা এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চার সচিবসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। আবেদনের সঙ্গে বেলা ‘দালানকোঠার ভারে বিপন্ন প্রবালদ্বীপ’ শিরোনামে সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। রুলে বিবাদীদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়। এরপর ওই বছরের ১৫ মে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) সেন্টমার্টিন দ্বীপে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ১০৬ আবাসিক হোটেল মালিকের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদফতরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয় মামলা করে। একই সময়ে সেন্টমার্টিনে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ৩৮টি আবাসিক হোটেল ভাঙার নির্দেশ দেয় পরিবেশ অধিদফতর। ২০ মের মধ্যে হোটেল মালিক পক্ষকে নিজ দায়িত্বে হোটেল ভেঙে তা সরিয়ে নিতে বলা হলেও তারা নির্দেশ মানেননি। নির্দেশ অমান্য করায় কয়েকটি হোটেলকে জরিমানাও করে পরিবেশ অধিদফতর।
সমকালে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সেন্টমার্টিন দ্বীপ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর থেকে তদন্ত কমিটি গঠনসহ নানা সুপারিশ করা হয়। ওই বছরের ৫ মার্চ টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথের বিষয়টি তদন্তে নৌপরিবহন অধিদফতর একটি কমিটি গঠন করে। নৌপরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালকের (ডিজি) কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত দলের প্রধান অধিদফতরের নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন। নৌপথে অত্যাধুনিক বাতি বয়া বসানোর উদ্যোগ ও অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া সেন্টমার্টিনে তিন বছরের জন্য সাময়িকভাবে পর্যটন বন্ধ করে দ্বীপটি পুনর্গঠনের সুপারিশ করে পরিবেশ অধিদফতর।
সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সেন্টমার্টিনে ১০৬টি হোটেল-মোটেলসহ নানা স্থাপনা গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন সেন্টমার্টিন দ্বীপের সৌন্দর্য, পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সেন্টমার্টিন সাগরে ১০৩টি প্রজাতির অনেকগুলোই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পর্যটকের অবাধ চলাচলের কারণে কাঁকড়ার প্রজনন কমে গেছে। অপরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন এবং যত্রতত্র আবর্জনা ফেলে পানি ও মাটিদূষণের কারণে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। বর্তমানে এ দ্বীপে ১০ হাজার মানুষের বাস। তার ওপর পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার পর্যটক দ্বীপে যাচ্ছেন। যত না মানুষ তার চেয়ে বেশি রিসোর্ট। দ্বীপের ভারসাম্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখেই অপরিকল্পিতভাবে ইট-পাথরের দালান গড়ে উঠেছে। উঁচু ভবন নির্মাণের জন্য প্রবাল খুঁড়ে মাটি বের করা হচ্ছে। অবাধে আহরণ হচ্ছে শামুক-ঝিনুক-পাথর। সৈকতসংলগ্ন এলাকায় হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট ও দোকান নির্মাণের জন্য কেয়াবন ও ঝোপঝাড় ধ্বংস করা হচ্ছে। হোটেলে চলা জেনারেটরের আওয়াজে দ্বীপে চলছে শব্দদূষণ। যে যেভাবে পারছেন, দ্বীপে ঘুরছেন। পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণহীন। মানুষের অতিরিক্ত চাপে পানি ও পরিবেশদূষণে হুমকিতে দ্বীপের প্রায় ৬৮ প্রজাতির প্রবাল।
কক্সবাজারের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) প্রধান নির্বাহী এম ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সেন্টমার্টিন নিয়ে সমকালে চার পর্বের সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সরকার সেন্টমার্টিন রক্ষার উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে তদন্ত কমিটি, হাইকোর্টের রুল, পরিবেশ অধিদফতরের সুপারিশসহ সেন্টমার্টিনে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ৩৮টি আবাসিক হোটেল ভাঙার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এবার আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করলে দ্বীপে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে।
সূত্রঃ সমকাল





