প্রেস বিজ্ঞপ্তিঃ
বিশিষ্ট ইসলামী রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোটের সাবেক মহাসচিব, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসমাজের প্রতিষ্ঠালগ্ন আহবায়ক মাওলানা নুরুল হক আরমান রহ. ১৭ তম এর ইন্তেকালবার্ষিকী আজ। দেখতে দেখতে এই কীর্তিমান রাজনীতিবিদের ইন্তেকালের ১৭ টি বছর পূর্ণ হয়ে গেল। ২০০২ সালের এই দিনে (৫ ফেব্রুয়ারি) তাহাজ্জুদের সময় ৫৭ বছর বয়সে সংগ্রামী এ মনীষী ইন্তেকাল করেন। কক্সবাজার জেলার খুরস্কুল ইউনিয়নের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের এই কৃতি সন্তান ইসলামী নেজাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অগ্রসেনানী হিসেবে জাতীয় ও আন্তজার্তিক পরিমন্ডলে অসমান্য অবদান ও কুরবানীর নজির স্থাপন করেন।

অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী মাওলানা নুরুল হক আরমান রহ. উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাকেন্দ্র জামেয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটাহাজারীতে তাফসীর, হাদিস, আরবী ব্যাকরণ ও তর্কশাস্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর বিরল প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন। তিনি কওমী মাদ্রাসা বোর্ড থেকে দাওরায়ে হাদিস ও বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে হাদিস বিভাগে কামিল ডিগ্রী লাভ করেন।বহুমূখী প্রতিভাসম্পন্ন এই আলেমেদ্বীন কক্সবাজার হাশেমিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসায় বহুকাল যাবৎ দ্বীনি শিক্ষার মহৎ খেদমত আনজাম দেন। এছাড়াও তিনি দ্বীনি শিক্ষার প্রচার-প্রসারের লক্ষে নিজ এলাকায় মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসা নামে একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। আমৃত্যু তিনি এ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নব্য জাহেলিয়াতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ছাত্রসমাজকে ইসলামী আদর্শের অনুসারী হিসেবে গড়ে তোলার অভিপ্রায়ে উপ-মহাদেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়েকেরামের তত্ত¡াবধানে ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ইসলামী ছাত্রসমাজ’এর প্রতিষ্ঠাতা আহবায়কের দায়িত্ব তাঁর উপর অর্পিত হলে তিনি হাঁটি হাঁটি পা পা করে এ সংগঠনকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষে নজিরবিহীন ঝুঁকি ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ছাত্রজীবন শেষে উপ-মহাদেশে ইসলামী আন্দোলনের পথিকৃৎ আলামা আতহার আলী রহ., খতীবে আজম আলামা ছিদ্দিক আহমদ রহ., আলামা ছৈয়দ মুছলেহ্ উদ্দিন রহ. ও এ্যাড. শহীদ মৌলভী ফরিদ আহমদ রহ. এর রাজনৈতিক চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে তিনি ঐতিহ্যবাহী নেজামে ইসলাম পার্টিতে যোগদান করেন। তিনি নেজামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি, মহাসচিব এবং ইসলামী ঐক্যজোটের কেন্দ্রীয় মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সর্বস্তরে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, অন্যায়ের প্রতিরোধ এবং দূর্নীতি ও দুঃশাসনসহ যাবতীয় অপকর্মের বিরুদ্ধে তিনি সর্বদা জনতার মিছিলে বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতেন। সৌদি আরব হতে মার্কিন এবং কুয়েত থেকে ইরাকী সৈন্য প্রত্যাহারের দাবীতে ১৯৯০ ইংরেজী সনে ঢাকায় মার্কিন দুতাবাসের সামনে আয়োজিত নেজামে ইসলাম পার্টির এক বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তৃতা দেওয়ার সময় তিনি ১৮ জন নেতা-কর্মীসহ গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেছিলেন । এভাবে মরহুম মাওলানা আরমান সাহেব ইসলাম ও জাতির কল্যাণে বহু ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তাঁর এই বিরল ত্যাগ ইতিহাসের পাতায় চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।
আজীবন মাওলানা নুরুল হক আরমান রহ. ছিলেন বাতিলের প্রতিরোধ ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় আপোষহীন লড়াকু সৈনিক। তাঁর বিশ্বাস ছিল সংস্কৃতির নামে অশ্লীল নৃত্য, নগ্ন ছবি প্রদর্শন, গানের আসর ও নাটক ইত্যাদি অনৈতিক তৎপরতার কারণে জাতির ভবিষ্যত প্রজন্ম ছাত্র ও যুবসমাজ চারিত্রিক অধপতনের শিকার হয় এবং সমাজে সৃষ্টি হয় চরম নৈতিক অবক্ষয়। ফলে এব্যাপারে তিনি ছিলেন একেবারেই আপোষহীন। যে কোন বাতিল ও অপসংস্কৃতির প্রতিরোধে আলেম-ওলামা থেকে শুরু করে সর্বস্তরের জনসাধারণকে সাথে নিয়ে তিনি রাজপথে নেমে আসতেন। জেলার বিভিন্ন স্থানে আনন্দ-উৎসবের নামে অশ্লীলতা ও ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ড নির্মূলে মাওলানা আরমান সাহেব আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। ১৯৮০ সালে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে আনন্দ মেলার নামে অপসংস্কৃতির এক বিশাল আয়োজনকে তিনি ১০/১৫ হাজার তৌহিদী জনতাকে সাথে নিয়ে পন্ড করে দেন। এব্যাপারে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হলেও তিনি ভীত সন্ত্রস্ত হননি। ১৯৮৯ সালে কুখ্যাত লেখক সালমান রুশদী কর্তৃক পবিত্র কোরআন মজিদ, মহানবী স. ,সাহাবায়েকেরাম ও রাসুল স. এর সহধর্মীনিগণের ব্যাপারে কুটুক্তির প্রতিবাদে কক্সবাজার পাবলিক হল মাঠে বিশাল সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজনের মাধ্যমে মাওলানা আরমান সাহেব তেজোদীপ্ত ভূমিকা পালন করেছিলেন।
মরহুম মাওলানা আরমান সাহেব শুধু রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত সমাজ দরদী ব্যক্তিত্ব।
১৯৯১ সালে সর্বগ্রাসী ঘূর্ণিঝড়ে কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার সমূহের পুনর্বাসন ও বিধ্বস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহ পুনঃনির্মাণের দাবীতে তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন। একই বছর ১৫ সেপ্টেম্বর চাকমারকুল মাদ্রাসার মরহুম পরিচালক মাওলানা সুলাইমান রহ. সহ বিশিষ্ট ওলামায়েকেরামের এক প্রতিনিধিদল নিয়ে তিনি এব্যাপারে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন। এভাবে তিনি সুখে- দুঃখে অসহায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়াতেন।
মরহুম এ সংগ্রামী নেতার রুহের মাগফিরাত কামনা করে দু’আ চেয়েছেন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ও ইসলামী ছাত্রসমাজ নেতৃবৃন্দ। আলাহ মরহুম এ সংগ্রামী ও বুযুর্গ ব্যক্তিত্বকে জান্নাতের আ’লা মকাম নসীব করুন। আমিন।





