সুখময় চক্রবর্তীঃ
সরস্বতী বিদ্যা ও কলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী, বাগ্দেবী, বীণাপাণি। সরস্বতী প্রাচীন নদীর নামও। সনাতন-হিন্দু শাস্ত্রের সার গ্রন্থ বেদে সরস্বতীকে জ্যোতির্ময়ী অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। পুরাকালে আর্যরা ব্রহ্মাবর্ত নামক স্থানে উপনিবেশ স্থাপন করে। সেই স্থানে যেই নদী ছিল তাকে সরস্বতী নদী বলা হয়। এ নদী দেশকে উর্বরা, শস্য শ্যামলা করে তুলতো। গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী-এই তিন নদীর মিলন ক্ষেত্রকে বলা হয় ত্রিবেণী-তা প্রয়াগ নামেও খ্যাত। সরস্বতী ত্রিবেণীর অংশ। বেদের অংশ ব্রাহ্মণে অর্থাৎ ব্রাহ্মণ ভাগে ও মহাভারতে উল্লেখ আছে যে, সরস্বতী নদীর তীরেই ঋষিদের গ্রাম ও আবাসস্থল ছিল এবং সারা বছর ব্যাপী সে স্থানে বেদধ্বনি হতো বলেই ঐ স্থান বাগদেবীর বাসস্থান বলে অভিহিত। কালক্রমে বেদের এই অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতী দেবীতে পরিণত হয়। সরস্বতী দেবী নরনারীর হৃদয়ে জ্যোতি: সঞ্চার করেন। এ দেবী শুক্ল বর্ণা, বীণা ধারিণী ও চন্দ্রের শোভাযুক্তা এবং এ দেবী শ্রুতি শাস্ত্রের শ্রেষ্ঠা, কবিদের ইষ্ট দেবতা। এ দেবী কৃষ্ণ-কণ্ঠ হতে উদ্ভূতা। শ্রীকৃষ্ণ এ দেবীকে প্রথমে পূজা করেন। দেবী ভাগবত মতে সরস্বতী ব্রহ্মার স্ত্রী। কিন্তু ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে লক্ষ্মী ও সরস্বতী দু’জনই নারায়ণের স্ত্রী। শাস্ত্রে আরো উল্লেখ আছে যে, বিদ্যাদেবী সরস্বতী দেবাদিদেব মহাদেব ও নারায়ণের কাছেও অতীব শ্রদ্ধাভাজন। মাঘ মাসের শুক্ল পক্ষের পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজা হয়। বিদ্যার্থীদের অর্থাৎ ছাত্র সমাজের জন্যে এটি একটি বৃহৎ উৎসবও। রক্তিম আভায় অপরূপ সাজে সজ্জিত পলাশ ফুলও এসময় ফুটে ওঠে। সরস্বতী পুজোয় তাই পলাশ ফুলের ব্যবহার নতুন মাত্রা এনে দেয়। বিদ্যার্থীদের মনও রংধনুর ন্যায় সাত রঙে রাঙিয়ে ওঠে। ফাগুনের জাগরণের মতো পলাশও উদ্বুদ্ধ করে বিদ্যার্থীদের। স্রষ্টা ও সৃষ্টির বন্দনার মতোই সনাতনী বিদ্যার্থীগণ সরস্বতীর মৃন্ময়ী মূর্তিতে চিন্ময়ীর আরাধনা করেন ও উচ্চারণ করেন-
“ ওঁ সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমল লোচনে।
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষি বিদ্যাংদেহি সরস্বতী ॥”

সংকীর্ণতা, উগ্রতা ও কুসংস্কার ত্যাগ করে মানবতাবোধে যিনি উদ্বুদ্ধ হন-তিনিই ‘মানুষ’ ও প্রকৃত ‘ধার্মিক’। বিদ্যার্থী-শিক্ষার্থীগণ যদি বর্ণিত মতে হৃদয়ের উপলব্ধি ও মানবতাবোধ থেকে মনুষ্যত্ব অর্জন করতে পারে-তবেই তারা হতে পারবে প্রকৃত মানুষ ও দেশ প্রেমিক নাগরিক। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর সকল সৃষ্টির ও সকল দেশের আবাসস্থল একই আকাশের নীচে। কোন ধর্মে আকাশকে পৃথক
পৃথক হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। তা সম্ভবও নয়। অখণ্ড বিশ্বের অখণ্ড আকাশ। সূর্য সকলকেই তাপ দেয়, আলো দেয় ও চন্দ্র কিরণ দেয়। বৃষ্টি ভূমির আদ্রতা এনে দেয় ও জলের অভাব পূরণ করে অর্থাৎ প্রকৃতির সকল কিছুই তথা আকাশ, আলো, বাতাস, বৃষ্টি, বৃক্ষরাজি, সাগর, নদী ইত্যাদি সর্বজনের এবং সকলের; সকল সৃষ্টির জন্যেই পৃথিবী। একথাও মনে রাখার জরুরি প্রয়োজন-‘সকলের তরে-সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা-পরের তরে’ এবং ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ বিদ্যাদেবীর আরাধনাও একটি সর্বজনীন উৎসব। ধর্ম ভেদাভেদ ভুলে সকল শিক্ষার্থীর মহামিলন ঘটে এ উৎসবে। এ উপলক্ষে প্রতিটি বিদ্যাপীঠে সর্বস্তরের মানুষের মিলন মেলা ঘটে।
স্মৃতি থেকে মহামূল্যবান একটি শ্লোক উপহার দিচ্ছি বিদ্যার্থীদের উদ্দেশ্যে। শ্লোকটি হচ্ছে :
“কাক চেষ্টা বক ধ্যান
স্বল্প নিদ্রা তথৈবচ-
স্বল্পাহারী গৃহত্যাগী
বিদ্যার্থী পঞ্চ লক্ষণ।”
বর্ণিত শ্লোকটির অর্থ শিক্ষার্থীদের পাঁচটি লক্ষণ থাকতে হবে। (১) কাকের মতো চেষ্টা করতে হবে; কাক আহার সংগ্রহের জন্যে যেমনি আপ্রাণ চেষ্টা করে। (২) শিক্ষার্থীদেরকে বকের মতো ধ্যান করতে হবে; জলাশয়ে মাছ ধরার জন্যে ক্ষুধার্ত বক যেরূপ একনিষ্ঠভাবে সাধনা করে-সেরূপ ধৈর্য ধারণ করতে হবে। (৩) সারাদিন ঘুমালে লেখাপড়ার ক্ষতি হয়; তাই স্বল্প নিদ্রা অর্থাৎ পরিমিতভাবে নিদ্রা যেতে হবে। (৪) স্বল্পাহারী-খাওয়া দাওয়াও সীমিত রাখতে হবে। অধিক খেলে অলসতা আসবে। (৫) গৃহত্যাগী-সংসারের চিন্তা বা সমস্যা থেকে দূরে থাকতে হবে অর্থাৎ ছাত্রদেরকে গৃহত্যাগী হতে হবে। এই পাঁচটি লক্ষণ অর্থাৎ কাকের মতো চেষ্টা, বকের মতো ধ্যান, স্বল্প নিদ্রা, কম অর্থাৎ পরিমিত খাওয়া ও সংসারের চিন্তা থেকে দূরে থাকা। এই পাঁচটি লক্ষণ যাদের মধ্যে থাকে তারাই প্রকৃত বিদ্যার্থী, শিক্ষার্থী। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীর মধ্যেই এই পাঁচটি গুণ থাকতে হবে।
সুখময় চক্রবর্তী, এডভোকেট, শিশু সাহিত্যিক ও মুক্তিযোদ্ধা।






