নিউজ ডেস্কঃ
পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর যে ধরনের রাষ্ট্রীয় বৈষম্য করা হচ্ছে, তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে কড়া ভাষায় চিঠি লিখেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) পার্লামেন্টের অন্তত ৫১ জন সদস্য। চিঠিতে পাকিস্তানে ধর্মীয় অবমাননা আইনের (ব্ল্যাসফেমি অ্যাক্ট) অপব্যবহারেরও তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। এদিকে, বিষয়টি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকরা মনে করছেন, সংখ্যালঘুদের নির্যাতন ইস্যুতে ইইউ পার্লামেন্ট এমপিরা পাকিস্তানের পাশাপাশি বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে ‘সতর্ক পর্যবেক্ষণ’ রেখেছেন। দিল্লিতে ইইউ রাষ্ট্রদূত টমাস কোজলোওস্কির কার্যালয় বাংলা ট্রিবিউনের কাছে চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

চিঠিতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এমপিরা জানিয়েছেন, পাকিস্তান যদি সব ধর্মের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে তারা ইউরোপীয় কমিশনকে সুপারিশ করবেন, যেন পাকিস্তানের দেওয়া সব ধরনের ভর্তুকি ও বাণিজ্যসুবিধা প্রত্যাহার করা হয়।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানকে শত শত কোটি ইউরো ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। এমনিতেই তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে আছে পাকিস্তান। এ কারণে আইএমএফের আপৎকালীন ঋণের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে পাকিস্তানকে। এখন ইউরোপের ভর্তুকি-বাণিজ্যসুবিধা বন্ধ হয়ে গেলে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে দেশটি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকরা এই আভাসও দিয়েছেন যে, সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের প্রশ্নে তাদের এমপিরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যেমন চরম পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন, তেমনি ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায়ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অবস্থা তাদের ‘সতর্ক পর্যবেক্ষণে’ আছে।
কিন্তু এক্ষেত্রে পাকিস্তানের যা অবস্থা, তার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনও দেশেরই বোধহয় তুলনা চলে না। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অর্ধশতাধিক সদস্যের চিঠি থেকে সেটি স্পষ্টও হয়ে গেছে।
তারা ওই চিঠিতে লিখেছেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ অঙ্গীকার করেছিলেন, মুসলিম-গরিষ্ঠ দেশ হলেও সেখানে খ্রিষ্টান, হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, আহমদিয়া, শিয়াসহ সবার সমানাধিকার থাকবে। অথচ বিগত সাত দশকে আমরা সে দেশে দেখেছি একের পর এক সরকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক নীতি নিয়ে চলেছে। তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নির্যাতন চলেছে, মৌলবাদী ইসলামী গোষ্ঠীগুলো তাদের বিরুদ্ধে হামলা চালাতেও উৎসাহিত হয়েছে।
‘ব্ল্যাসফেমি অ্যাক্ট’ বা ধর্মীয় অবমাননা আইনের অপব্যবহার করে আসিয়া বিবি নামে এক খ্রিস্টান নারীকে কীভাবে পাকিস্তান হেনস্তা করেছে এবং সাজানো অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দিয়েছিল, ইউরোপীয় এমপিরা চিঠিতে সে কথাও উল্লেখ করেছেন।
যেসব সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো ব্যবহার করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ‘উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে’ আক্রমণের নিশানা করা হচ্ছে, সেগুলো ভেঙে দেওয়ার জন্যও প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কাছে তারা আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে, চিঠির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সেখানে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, এরপরও পাকিস্তান ব্যবস্থা না নিলে এই পার্লামেন্ট সদস্যরা পাকিস্তানের যাবতীয় ভর্তুকি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-সুবিধা বন্ধ করার জন্য তৎপর হবেন।
চিঠিতে যে ৫১ জন এমইপি (মেম্বার অব ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট) স্বাক্ষর করেছেন, তাদের অন্যতম হলেন পর্তুগালের সোশ্যালিস্ট ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সোফিয়া রিবেইরো। তিনি এক ইমেইল বার্তায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের জীবনযাপন এতটাই দুর্বিষহ অবস্থায় পৌঁছেছে যে, আমরা আর নীরব থাকতে পারি না। সে কারণেই এই চিঠি লিখতে আমরা বাধ্য হয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাকিস্তান ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি আমরা নিয়মিত খতিয়ে দেখছি।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ‘আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসে ধর্মের ভিত্তিতে কেবল দুটি রাষ্ট্রেরই জন্ম হয়েছে। একটি ইসরায়েল, অন্যটি পাকিস্তান। কাজেই এই দু’টি দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অবস্থা যে বিশেষ আন্তর্জাতিক নজর দাবি করে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।’
ইজরায়েলে আরব ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের যেমন দায়বদ্ধতা আছে, তেমনি পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকারের প্রতি মর্যাদাবোধ থেকেই এমইপি’রা এই পদক্ষেপ নিয়েছেন বলেও সূত্রটি জানায়।
সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন





