সুনীল বড়ুয়াঃ
বাংলাদেশী বৌদ্ধদের তৃতীয় সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু ও উপসংঘরাজ, কক্সবাজারের রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহা বিহারের অধ্যক্ষ, একুশে পদকপ্রাপ্ত, উপসংঘরাজ পণ্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথেরো আর নেই।

দীর্ঘ ৭০ বছরের ভিক্ষু জীবনের অবসান ঘটিয়ে তিনি বৃহস্পতিবার (৩ অক্টোবর) দিনগত রাত পৌনে একটার দিকে ঢাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে পরলোক গমন করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশের বৌদ্ধ সমাজে শোকের ছায়া নেমে আসে।

এদিকে শুক্রবার (৩ অক্টোবর) বেলা পৌনে তিনটার দিকে এই বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরুর মরদেহ বহনকারী এম্বুল্যান্সটি রামু বাইপাসে পৌঁছালে হাজারো বৌদ্ধ নরনারী তাকে শ্রদ্ধা জানাতে এবং তার মরদেহ এক নজর দেখার জন্য সেখানে সমবেত হন। এ সময় এক হৃদয় বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

তাঁর শিষ্য রামু সীমা বিহারের সহকারী পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু জানান, হঠাৎ করে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ১৫ সেপ্টেম্বর তাকে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে কেবিন ব্লকের ৩২০ নম্বর কক্ষে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন।

অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ২১ সেপ্টেম্বর করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিও) নেয়া হয়। শারীরিক অবস্থার একটু উন্নতি হলে গত মঙ্গলবার (১ অক্টোবর) তাকে পুনরায় কেবিনে নিয়ে আসা হয়। সেখানে রাত পৌনে একটার দিকে তিনি পরলোকগমন করেন।

এদিকে শুক্রবার বিকালে পণ্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথেরোর মরদেহ রামু বাইপাসে পৌঁছালে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ছুটে যান রামু-কক্সবাজারের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সোহেল সরওয়ার কাজল,উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রণয় চাকমা, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম, থানার ওসি মো. আবুল খায়ের, ওসি (তদন্ত) মো. মিজানুর রহমানসহ রামুর গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। তারাসহ বৌদ্ধ নেতৃব্রন্দের নেতৃত্বে মরদেহ রামু বাইপাস থেকে রামু সীমা বিহারে নিয়ে আসা হয়।

উল্লেখ্য, ১৯৩০ সালের ১০ জুন কক্সবাজারের রামুর ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের মেরংলোয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সত্যপ্রিয় মহাথেরো। তাঁর বাবা ছিলেন প্রয়াত হর কুমার বড়ুয়া আর মা হচ্ছেন প্রেমময়ী বড়ুয়া। তাঁর গৃহী নাম ছিল বিধু ভূষন বড়ুয়া।
১৯৫০ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসাবে উপসম্পদা গ্রহণ করে সত্যপ্রিয় মহাথেরো নাম ধারণ করেন।

এরপর তাঁর গুরু ভান্তে আর্য্যবংশ মহাথেরোর সঙ্গে তিনি চলে যান উখিয়ার ভালুকিয়া বৈজয়ন্তি বিবেকারাম বৌদ্ধ বিহারে। ওই বিহারের অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন পণ্ডিত সত্যপ্রিয় । সেখানে কয়েক বছর থাকার পর তিনি পড়াশোনার জন্য মির্জাপুর পালি কলেজে চলে যান।
এরপর ১৯৫৪ সালে তিনি বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য মিয়ানমারে চলে যান। প্রায় ১০ বছর পর ১৯৬৪ সালে মিয়ানমার থেকে ফিরে সেই থেকে রামু সীমা বিহারে অবস্থান করেন তিনি। তখন থেকে দীর্ঘ ৭০ বছরের ভিক্ষু জীবনে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার প্রসারে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সত্যপ্রিয় মহাথেরো ১৯৫৫ সালে মিয়ানমারের ধর্মদূত পালি কলেজে অগ্রমহাপণ্ডিত উ. বিশুদ্ধায়ু মহাথেরো ও প্রজ্ঞালোক মহাথেরোর কাছে পালি ভাষা ও বিনয় শিক্ষা লাভ করেন। এ মহান পুণ্যপুরুষ পৃথিবীর বহু ভাষায় পারদর্শী। বৌদ্ধ ধর্মের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ ত্রিপিটকের বিভিন্ন অধ্যায় থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন সত্যপ্রিয় মহাথেরো।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধেও অসাধারণ সাহসী ভূমিকা রাখেন পণ্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথেরো। যুদ্ধ-চলাকালীন তিনি এলাকার সহস্রাধিক অসহায় ও নির্যাতিত মানুষকে ২০১২ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় পুড়িয়ে দেয়া ঐতিহ্যবাহী পুরাতন সেই কাঠের বিহারে আশ্রয় দেন। এ নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে তাঁর বাকবিতণ্ডাও হয়।





