রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের শুভ মাঘী পূর্ণিমা উৎসব ও বৌদ্ধ মহাসম্মেলন পূণ্যার্থীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। মঙ্গলবার ও বুধবার (১১-১২ ফেব্রুয়ারি) দুই দিনব্যাপী রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহার মাঠে বৌদ্ধদের ধর্মীয় উৎসব শুভ মাঘী পূর্ণিমা উৎসব উদযাপন করা হয়। নানা আয়োজনে প্রব্রজ্যাদান, অন্নদান, অষ্টউপকরণসহ মহাসংঘদান, আলোচনা সভা, দেশ ও বিশ্বশান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এ উৎসব। বৌদ্ধ মহাসম্মেলনে শুভেচ্ছা বক্তৃতা করবেন, রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাজু বড়ুয়া।
বৌদ্ধ মহাসম্মেলনে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বলেন, শুভ মাঘী পূর্ণিমা দিবসটি বৌদ্ধদের কাছে একটি তাৎপর্যময় পূর্ণিমা তিথি। এই পূর্ণিমা তিথিকে কেন্দ্র করে বুদ্ধের জীবদ্দশার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এ পূর্ণিমা দিনেই তথাগত বুদ্ধ তাঁর ভিক্ষুসংঘকে পাতিমোক্ষ (বিনয় পিটক) দেশনা করেন। একই তিথিতে বৈশালীর চাপাল চৈত্যে ভিক্ষুসংঘের কাছে নিজের মহাপরিনির্বাণ দিবস ঘোষণা করেন তিনি। অর্থাৎ তিনি মাঘী পূর্ণিমা দিবসে ঘোষণা করেছিলেন, ওই দিন হতে তিন মাস পর শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে স্বীয় দেহত্যাগ করে পরিনির্বাপিত হবেন। একদিকে বুদ্ধ কর্তৃক স্বীয় আয়ু সংস্কারের ঘোষনা, অপরদিকে ভিক্ষুসংঘকে উপদেশ প্রদান শুভ মাঘী পূর্ণিমাকে মহিমান্বিত করে তুলেছে। এ কারণে এদিন সব বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বুদ্ধের কথিত অনিত্য ভাবনা করে, ইহকাল ও পরকালের সুন্দর জীবন প্রতিষ্ঠার জন্য ধ্যান সমাধি করে এবং জীবনকে শীলময়, ভাবনাময় ও বিশুদ্ধিপূর্ণ করার জন্য কঠোর সংকল্পে ব্রতী হয়।
মঙ্গলবার বিকালে প্রবজ্যাদান অনুষ্ঠান ও সন্ধ্যায় দেশ ও বিশ্বশান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনার মধ্য দিয়ে দুই দিনব্যাপী উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করা হয়। পরদিন বুধবার সকাল ৭টায় ধর্মীয় ও জাতীয় পকাকা উত্তোলন করা হয়। সকাল ৯টায় ভিক্ষু সংঘকে অন্নদান করেন পূণ্যার্থী গ্রামবাসীরা। এরপর সংঘদান ও অষ্টপরিষ্কার দানসভা অনুষ্ঠিত হয়।
পটিয়া মৈতলা সদ্ধর্মজ্যোতি বিহার অধ্যক্ষ উপসংঘরাজ শাসনপ্রিয় মহাথের এ সভায় সভাপতিত্ব করেন। ভারতে মুব্বাই অজান্তা বিহার অধ্যক্ষ ও ভারতীয় ভিক্ষু মহাসভার উপসংঘরাজ ধর্মরত্ন মহাথের এ সভায় আর্শিবাদক এবং উখিয়া রুমখাঁ মহাজন পাড়া মৈত্রী বিহার অধ্যক্ষ এস ধর্মপাল মহাথের প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন। এ সভায় কুশলায়ন মহাথের প্রধান জ্ঞাতী, ইন্দ্রবংশ মহাথের, শীলরত্ন মহাথের, করুণাশ্রী মহাথের, জ্ঞানপ্রিয় মহাথের বিশেষ অতিথি, ড. ধর্মকীর্তি মহাথের প্রধান সদ্ধর্মদেশক এবং রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারে অধ্যক্ষ শীলপ্রিয় মহাথের উদ্বোধক হিসেবে দেশনা সদ্ধর্মদেশনা করেন ।
দুপুরে অনুষ্ঠিত সভায় বিজয় রক্ষিত মহাথের আর্শিবাদক, প্রিয়রত্ন মহাথের উদ্বোধক, এস লোকজিৎ মহাথের প্রধান সদ্ধর্মদেশক হিসেবে দেশনা করেন। সভায় রামু, কক্সবাজার, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলা থেকে আগত বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ও আবাসিক প্রধান সদ্ধর্মদেশক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালন করবেন, বিপুল বড়ুয়া আব্বু, লিটন বড়ুয়া (ক্লিনটন), লিটন বড়ুয়া (লুতু), স্নিগ্ধ বড়ুয়া সঞ্চয়। সন্ধ্যায় হাজার প্রদীপ, ফানুস উৎসব, রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
শুভ মাঘী পূর্ণিমা ও বৌদ্ধ মহাসম্মেলন উদযাপন পরিষদের সভপতি পলক বড়ুয়া আপ্পু জানান, শুভ মাঘী পূর্ণিমা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। একই সঙ্গে দিবসটি বৌদ্ধদের কাছে একটি ঐতিহাসিক দিন। যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে রামুতে শুভ মাঘী পূর্ণিমা উদযাপন করা হয়েছে। ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি দুই দিনব্যাপী উৎসবে রামুর পূণ্যপুরুষ আর্যবংশ মহোদয়ের প্রাণপ্রিয় শিষ্য মায়ানমার সরকার কর্তৃক আগ্গামহাসদ্ধমাজ্যোতিকাধ্বজা অভিধায় বিভূষিত এবং বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একুশে পদক প্রাপ্ত বহুগ্রন্থ প্রণেতা সমাজ সংস্কারক প্রয়াত পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের’র প্রবজ্যাস্থল এবং দিগ্বিজয়ের শেষ আবাসস্থল রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারে স্মৃতি বিজড়িত শুভ মাঘী পূর্ণিমা উদযাপন উপলক্ষে প্রব্রজ্যাদান, অন্নদান, অষ্টউপকরণসহ মহাসংঘদান ও বৌদ্ধ মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।







