সবুজ পাতার বৃত্তে হলুদ ফুল সূর্যমুখী। একটু বাতাসে দোলে উঠে সৌন্দর্য্য ছড়ানো সূর্যমুখী ফুল। সৌন্দর্য্য উপভোগে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভীড়, পরিণত হয়েছে বিনোদন কেন্দ্রে। সূর্যের দিকে মুখ করে ফোটে বলেই হয়তো এ ফুলের নাম সূর্যমুখী। সূর্য যেদিকে সেদিকেই ঘাড় ফেরায় সূর্যমুখী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যেম ফেসবুকের বদৌলতে দেখতে আসা দর্শনার্থীদের পদচারণায় নতুন বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে কৃষি উদ্যোক্তা আকতার কামালের সূর্যমুখী ফুলের বাগান। পরিবার পরিজন সহ নানা বয়সের মানুষ বিনোদনের জন্য ছুটে আসছেন এখানে। পিছিয়ে নেই ভিডিও তৈরি করা টিকটকাররাও। বিনোদন প্রেমী দর্শনার্থীর ভিড়ে, বাগানের ভেতরে ঢুকে সেলফি ও ছবি তোলার কারণে ব্যাপক ক্ষতিও হচ্ছে অভিযোগ কৃষকের।
সরজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, মহাসড়কের পাশের সবুজের বুকে হলুদ রঙে ফুলের চাদর। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে সৌন্দর্য্য ছড়াচ্ছে সূর্যমুখী ফুল। সৌন্দর্য্য উপভোগে ভীড় করেছেন নানা বয়সের মানুষ। এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে কেউ স্মার্টফোনে তুলছেন ছবি, কেউ তৈরি করছেন ভিডিও কন্টেন্ট। পাহারা দিয়েও দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অতি উৎসাহী দর্শনার্থীরা সূর্যমুখী ফুল গাছের মাঝে হেঁটে হেঁটে ছবি তোলতে গিয়ে, মুল চাষাবাদ আলু চাষ নষ্ট করে দিচ্ছেন। নিষেধ করেও সামলানো যাচ্ছে না।
জানা গেছে, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে রামু উপজেলার পূর্ব মেরংলোয়া গ্রামে ১ বিঘা জমিতে, ওই গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা আকতার কামাল আলু চাষের সাথী ফসল হিসেবে চাষ করেছেন সূর্যমুখী ফুল। ৮৫ দিন পূর্বে বপন করা বীজ, চার-পাঁচ ফুট উঁচু গাছে পরিণত হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে পরিপক্ক গাছে ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে। দূর থেকে দেখে মনে হয় সবুজের বুকে হলুদ ফুলের চাদর।
রামু কৃষি বিভাগ জানান, সাধারণ সূর্যমুখী বীজ বপনের ৬৫-৭০ দিনে ফুল ফোটা শুরু হয়। জাত এবং আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে আরও কয়েক দিন বেশী সময় লাগতে পারে। বীজ থেকে পরিপক্ক গাছ, এরপর ফুল সংগ্রহ করতে সময় লাগে প্রায় তিন থেকে চার মাস। তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদনে উৎসাহী করতে রামু উপজেলা কৃষি বিভাগ প্রণোদনায় আলু চাষ করেন কৃষি উদ্যোক্তা আকতার কামাল। নিজ উদ্যোগে সাথী ফসল হিসেবে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করেছেন তিনি। সূর্যমুখী ফুলের তেলের একটি বাড়তি সুবিধা আছে। তাই এটি খাওয়া আমাদের জন্য উপকারী। স্থানীয়ভাবে যে প্রদর্শনীগুলো কৃষি বিভাগের আওতায় বাস্তবায়ন করা হয়, এর সবগুলোতেই দর্শনার্থীদের খুব ভিড় থাকে। ফসলের ক্ষতি যেন না হয়, সে দিকে নজর দেয়া এবং সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। কৃষকরাই দেশের প্রাণ।
কৃষি উদ্যোক্তা আকতার কামাল বলেন, আলু চাষের সাথী ফসল হিসেবে পরীক্ষা মূলকভাবে সূর্যমুখী চাষ করেছি। দেখা যাচ্ছে চাষ ভালো হবে। ভালো ফলন হলে, আগামীতে ব্যাপক হারে করবো। হয়তো আমরা দেখাদেখি আরও অনেকে উদ্বুদ্ধ হবেন। আমাদের দেশে ভোজ্য তেলের অভাব রয়েছে, দামও বেশী। সাথী ফসল হিসেবে সূর্যমুখী যদি করা যায়, হয়তো চাহিদা কিছুনা কিছু মিটবে। ভাল তেল পাওয়া যাবে। কৃষিতে নতুন কিছু করার চেষ্টা করি সবসময়। ইতিপূর্বে স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল ও সরিষা চাষ করে সফলতা পেয়েছি। রামুতে আমিই প্রথম বাণিজ্যিক ভাবে ড্রাগন ফল চাষ করেছি।

কৃষি উদ্যোক্তা আকতার কামাল আক্ষেপ করে আরও বলেন, ৮৫ দিন পূর্বে লাগানো প্রায় প্রতিটি গাছে এখন ফুল ফুটেছে। হলুদ ফুল সূর্যমুখীর সৌন্দর্য দেখতে বিকেল হলেই বাড়ে দর্শনার্থীদের উৎপাত। নতুন কিছু করেছি, মানুষ আগ্রহ করে আসেন। সুযোগ দিচ্ছি, ছবি তোলছেন। কিন্তু আমার ক্ষতি হচ্ছে ব্যাপক, ভাড়াবাড়িও হচ্ছে। ফসল বাঁচাতে আমাকেও কঠোর হতে হচ্ছে।
সূর্যমুখীর বাগান দেখতে আসা কলেজ শিক্ষার্থী নওশাদ পারভেজ, মোরশেদ আলম বলেন, রামুতে প্রথমবারের মতো সূর্যমুখী ফুলের সৌন্দর্য দেখে আমরা উচ্ছ্বসিত। সবুজের বৃত্তের হলুদ ফুল সূর্যমুখী। নতুন এ সৌন্দর্যে মন ভালো হয়ে যায়। উৎফুল্ল মনে বন্ধুদের সাথে নিয়ে ছবি তোলেছি, ভিডিও করেছি। ছবি তোলতে এসে কৃষকের ফসলের যেন ক্ষতি না হয়, সে দিকেও সজাগ থাকতে দর্শনার্থীদের প্রতি অনুরোধ জানান এ শিক্ষার্থীরা।
পরিবেশকর্মী সাংবাদিক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, রামুতে প্রথম বারের মতো সূর্যমুখী ফুল চাষাবাদ হয়েছে। সূর্যমুখী ফুলের বাগানটি সৌন্দর্যপ্রেমীদের কাছে দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। তেলবীজ উৎপাদনের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে কৃষি পর্যটনের নতুন সম্ভাবনাও। বাগান দেখে মনে হয়েছে ফলনেও সফল হবেন কৃষক। নতুন করা বাগানটি দেখে আরও অনেকে উদ্বুদ্ধ হবেন সূর্যমুখী চাষে।

রামু উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সুশান্ত দেব নাথ শুভ বলেন, রামুতে প্রথমবারের মতো সূর্যমুখী ফুলের চাষ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, কৃষি উদ্যোক্তা পূর্ব মেরংলোয়া গ্রামের আকতার কামাল। সবসময় নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন তিনি। সম্প্রীতি আলু চাষে সাথী ফসল হিসেবে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করেছেন। ফসল ভালো হয়েছে, আশাকরি ফলনও ভালো হবে। কৃষি বিভাগ সবসময় কৃষকদের উৎসাহিত করেন নিরাপদ ভোজ্য জাতীয় চাষাবাদে। উৎপাদনকৃত পণ্যের পর্যাপ্ত বিপনন ব্যবস্থা না থাকায়, ভালো ফলন হলেও চাষাবাদে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন কৃষকরা। রামুতে প্রথম সূর্যমুখী ফুলের চাষ করে সফল হয়েছে আকতার কামাল। তাঁর উৎপাদিত পণ্য সুষ্ঠু বিপনন করার বিষয়টি জেলা বিপনন অধিদপ্তরের মাসিক সমন্বয় সভায় উপস্থাপন করবো।






