রামুতে বাঙালির মানস ও মনন নির্মাতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মতিথি উদযাপন করা হয়েছে। ‘আমি তোমাদেরই লোক’ এই আনন্দ উৎসব আয়োজন করেছে রামু রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন পরিষদ। সোমবার (১১ মে) রামু ইনস্টিটিউট অব মিউজিক মিলনায়তনে রাত সাড়ে সাতটায় মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালিয়ে অতিথিরা রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন। এ আয়োজনকে ঘিরে রবীন্দ্র প্রেমীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠে ‘ইনস্টিটিউট অব মিউজিক’ মিলনায়তন। রামু রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক বিভাষ সেনগুপ্ত জিগমী এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে কথা, কবিতা, গান ও নৃত্যের মাধ্যমে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করা হয়।

আমার এ জন্মদিন-মাঝে আমি হারা। আমি চাহি বন্ধুজন যারা, তাহাদের হাতের পরশে মর্তের অন্তিম প্রীতিরসে, নিয়ে যাব জীবনের চরম প্রসাদ নিয়ে যাব মানুষের শেষ আশীর্বাদ। রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠানে রামু সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ হাছানুল ইসলাম প্রধান আলোচক এবং রামু উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবুল মনসুর উদ্বোধকের বক্তৃতা করেন।
রামু রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব মানসী বড়ুয়ার সঞ্চালনায় অনুুষ্ঠিত রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন, লেখক-গবেষক রামু সরকারি কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুপ্রতীম বড়ুয়া, নাট্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মাস্টার মোহাম্মদ আলম, সংস্কৃতিকর্মী গোলাম কবির মেম্বার, রামু সরকারি কলেজের অধ্যাপক প্রধীর রঞ্জন দাশগুপ্ত।
প্রধান আলোচক প্রফেসর মোহাম্মদ হাছানুল ইসলাম বলেন, রবীন্দ্রনাথ আমাদের সার্থক ছোট গল্পের জনক। তার গল্প শুধু গল্পই ছিলনা। তার গল্পগুলো একএকটা দর্শন শাস্ত্রের নাটিকা। আমাদের প্রত্যেকের মনোজগতকে, আমাদের প্রত্যেককে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। আমাদের দেহ সাড়ে তিন হাতের মধ্যে বদ্ধ। কিন্তু আমরা যদি সেই সাড়ে তিন হাতের মধ্যে গৃহ নির্মাণ করি, তাহলে স্বাধীন ভাবে বাঁচা যায় না। এর জন্য আমাদের অনেক জায়গা দরকার। শিক্ষার বেলায়ও বিষয়টা তাই। কেবল যতটুকু আবশ্যক আমরা যদি আমাদের শিশুদের তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি, তাহলে তাদের যথাযথ পরিমাণে বৃদ্ধি ঘটবে না। তাদের আবশ্যক পাঠের সাথে স্বাধীন পাঠ প্রয়োজন। যদি আবশ্যিক পাঠের সাথে স্বাধীন পাঠ মেশানো না হয়, তাহলে তারা ঠিক ভাবে বেড়ে উঠে না। তারা বয়োপ্রাপ্ত হলেও বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে নাবালকই রয়ে যায়। আমরা আজকে বুঝতে পারছি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ত্রিকালদর্শী ছিলেন। তিনি বলেন, আমি দুঃখের সাথে বলছি, যারা কবিগুরু রবিঠাকুরকে ছোট করে, নজরুল বড় করতে চান। কিংবা নজরুলকে ছোট করে কবিগুরুকে বড় করতে চান, তারা আসলে নাবালক। বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে তারা সাবালক হয়নি। এই দায় আমাদেরও। আমরা যারা নিজেদের শিক্ষক বলে দাবি করি, আমরা তাদেরকে সেই জ্ঞানটা দিতে পারিনি।

উদ্বোধকের বক্তব্যে অ্যাডভোকেট আবুল মনসুর বলেন, আমি তোমাদেরই লোক। এ কথাটা আজীবনের, সারা যুগের। পৃথিবী যতদিন থাকবে, ততদিনের এ কথা। সত্যিই কি রবীন্দ্রনাথকে আমাদের লোক বানাতে পেরেছি। পারি নাই। রবীন্দ্রনাথকে যদি আমাদের লোক বানাতে পারতাম, তাহলে আমাদের দেশে এত হানাহানি মারামারি হতো বলে মনে হয় না। রবীন্দ্রনাথকে আমাদের লোক বানাতে পারি নাই। এ জন্যে আমাদের আগের প্রজন্মরা যেমন দায়ী, আমাদের সমবয়সীরা তেমন ভাবে দায়ী। যত দিন রবীন্দ্রনাথকে আমাদের লোক ভাবতে না পারবো, ততদিন পর্যন্ত বাঙ্গালি জাতির উত্থান হবে না। এই প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথকে ভালবাসতে শিখেছে, সম্মান করতে শিখেছে। তারা যদি সেই স্থানটা দিতে পারে। যা আমরা পারি নাই। সেই দিন হবে আমাদের সকলেরই মুক্তি। সকলের যখন মুক্তি হবে, পৃথিবীর মানুষের মুক্তি হবে।
এ আয়োজনে আলোচনা সভার পাশাপাশি রবীন্দ্র সংগীতে বিভাষ সেনগুপ্ত জিগমী, মানসী বড়ুয়া, আন্না পাল, উৎপলা বড়ুয়া, মীনা মল্লিক, জয়শ্রী বড়ুয়া, সংগীত বড়ুয়া, প্রিয়ম মল্লিক, সুনন্দন দাস ধনী। কবিতা আবৃতি করেন দিপক বড়ুয়া দিপু এবং নৃত্যে অংশ নেন, সম্প্রীতি, পসরা, হিমাদ্রী, দিয়া, চৈতী ও চিত্রাঙ্গী। ছোটদের দলীয় সংগীতে অংশ নেন, পূজা ধর, মন্দিরা দাশ, আরাধ্যা দাশ, আদ্রিজা বড়ুয়া, প্রাপ্তি বড়ুয়া, উ মে চেং রাখাইন, প্রতিধ্বনি শর্মা, অভিরুপ বড়ুয়া স্বপ্ন, অভ্র দে, পিউ দে, মেঘা দে, অর্পিতা বড়ুয়া, তিথি দাশ, মোহর বড়ুয়া, মুমু বড়ুয়া, অরিত্রি শর্মা কথা, কমলিকা ধর কমু। যন্ত্র সংগীতে ছিলেন মিজানুল হক, সজল দে ও পুঞ্জ বড়ুয়া। অনুষ্ঠানের সার্বিক সহযোগিতায় আরও ছিলেন, পুলক বড়ুয়া, এইচ বি পান্থ, খালেদ শহীদ, ইস্কান্দর মীর্জা ও মিথুন বড়ুয়া বোথাম।
সভাপতির বক্তব্যে রামু রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক বিভাষ সেনগুপ্ত জিগমী বলেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্মরণ করতে আমরা রবীন্দ্রজয়ন্তী আয়োজন করেছি। আমরা চাই আজকের প্রজন্ম কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জানুক। বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল ইসলামকে জানুক। রামুর সংস্কৃতিকর্মীদের সহযোগিতায় রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন করেছি। এভাবে আমরা বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল ইসলামকেও স্মরণ করবো।







