শিশুদের বাংলা ভাষা শিখতে হবে আগে তারপর অন্য ভাষা। ভাষা মানুষের অসাধারণ অর্জন। এটা ছাড়া মানুষ আজকের সভ্যতার যে-সব প্রাপ্তি তাতে কোনদিন পৌঁছুতে পারত না। বাংলা তেমনই একটা প্রসিদ্ধ ভাষার নাম। মাতৃভাষা অন্যান্য ভাষা শেখার ভিত্তি। মাতৃভাষা ভালোভাবে শিখলে শিশুরা অন্যান্য ভাষা সহজে বুঝতে ও শিখতে পারে। বাংলা ভাষা শিখতে শিখতে শিশুরা কথা বলতেও শেখে। অভ্যাসের দ্বারা সব বৈশিষ্ট্য আয়ত্ত করার জন্য কথা শেখা ও শেখানোর প্রয়োজন আছে। আবৃত্তি ও বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় শিশু কিশোরদের এমন তথ্যসমৃদ্ধ বিস্ময়কর বক্তব্য উপস্থাপন দর্শকদের বিমোহিত করেছে।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) বিকালে রামুতে শব্দায়ন আবৃত্তি একাডেমির প্রশিক্ষণ পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হয় অর্ধবার্ষিক মূল্যায়ন, আবৃত্তি ও বক্তৃতা প্রতিযোগিতা। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা পরিষদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতায় নার্সারি-কেজি শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণির শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
রামু উপজেলা পরিষদের বাঁকখালী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আবৃত্তি ও বক্তৃতা প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করেন শব্দায়ন আবৃত্তি একাডেমির অভিভাবক প্রয়াত শিক্ষক মনমোহন বড়ুয়ার স্ত্রী রেবা বড়ুয়া। শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ ও পদচারণায় উৎসবমুখর হয়ে ওঠা নান্দনিক এ অনুষ্ঠান স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রয়াত শিক্ষক মনমোহন বড়ুয়াকে উৎসর্গ করা হয়। রামু প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা পরিষদের আহ্বায়ক মাস্টার মোহাম্মদ আলম এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।
অনুষ্ঠানের মুখ্য আলোচক শব্দায়ন আবৃত্তি একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জসীম উদ্দিন বকুল বলেন, মাতৃভাষা অন্যান্য ভাষা শেখার ভিত্তি। রক্তের বিনিময়ে যে বাংলা ভাষা আমরা কিনেছি, বর্তমান প্রজন্মে তার সঠিক ব্যবহার ঠিক কতটুকু আছে? কিংবা আগামী প্রজন্মকে শুদ্ধ বাংলা ভাষা শেখাতে আমরা কতটা তৎপর? আজকাল ভাষার ব্যবহারে ইংরেজি কিংবা নানান জাতের ভাষার সংমিশ্রণ হয়ে গেছে। বাংলার সাথে দু-চারটে ইংরেজি মিশিয়ে বললে নিজেদের স্মার্ট মনে হয়। অথচ মূল্যে অর্জিত বাংলা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ, সঠিক ব্যবহার একজন বাঙালি হিসেবে কতটা পরিপাটি করে তোলে নিজেকে সেদিকে খুব একটা খেয়াল আমাদের নেই। সেই চক্করে আমাদের সন্তানেরাও শুদ্ধ বাংলাটা শিখছে না, বাংলা ভাষার মূল্যায়ন বা কদর করার মানসিকতা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলবে অচিরেই। কয়েক বছর ধরে দেখছি, অসংখ্য অভিভাবক সন্তানদের ইংরেজি শেখার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ভালো। তবে বাংলা ভাষার শেখার ওপর গুরুত্ব হারিয়ে নয় কোনভাবে। তাই জরুরি আমাদের শিশুদেরকে শুদ্ধ বাংলা ভাষা শেখানো।

বাচিকশিল্পী জসীম উদ্দিন বকুল আরও বলেন, ভাষা শেখার প্রথম পদক্ষেপ শিশু যখন ভাষা শিখছে তখনই তাকে প্রমিত বাংলায় কথা বলতে শেখানো প্রয়োজন। আপনার সন্তানকে শুদ্ধ বাংলা শেখান। বাংলা ভাষাকে যথার্থ মূল্যায়নের সাথেই বাঁচিয়ে রাখুন। বাংলা আমাদের ভাষা। তাই ভাষাকে সুন্দর সুরক্ষিত রেখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও আমাদের। সুদীর্ঘ ৪২ বছর ধরে শব্দায়ন আবৃত্তি একাডেমি প্রমিত উচ্চারণ, বাচনিক উৎকর্ষ, আবৃত্তি নির্মাণ, উপস্থাপনা, বক্তৃতা ও বাংলা শুদ্ধ বলা ও লেখা বিষয়ে নিয়মিত কক্সবাজার ও রামুতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
আবৃত্তি ও বক্তৃতা প্রতিযোগিতা বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক নীলোৎপল বড়ুয়ার স্বাগত বক্তব্যে ও সদস্য সচিব দিপক বড়ুয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন, সাহিত্যিক এরশাদুল হক। অভিভাবকদের মধ্যে অনুভূতি ব্যক্ত করেন রামু সরকারি কলেজের শিক্ষক শারমিন আক্তার, রামু খিজারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক নাজনিন আকতার মেরি, রূপম কুমার দাশ, মেরংলোয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নাছরিন আকতার, রামু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওয়ার্ড ইনচার্জ কুসুম আকতার। অনুষ্ঠানের সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন, রামু প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা পরিষদ সদস্য খালেদ শহীদ, সুনীল বড়ুয়া, নুরুল আমিন নান্নু, সোয়েব সাঈদ, জয়শ্রী বড়ুয়া, মিজানুর রহমান, দিবস বৈদ্য, মিজানুল হক ও রেজাউল আমিন মোরশেদ।
আবৃত্তি ও বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন, বাচিকশিল্পী জসিম উদ্দিন বকুল, অধ্যাপক নীলোৎপল বড়ুয়া, শব্দায়নের সহকারী পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষক অধ্যাপক রোমেনা আক্তার, সহকারী পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষক মিনহাজ চৌধুরী, সানজিদুল ইসলাম মাহিন, চৈতী দাশ। সঞ্চালকের দায়িত্বে ছিলেন দিপক বড়ুয়া ও সোমা বড়ুয়া। ফটোগ্রাফিতে ছিলেন শব্দায়নের জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী আবিদ মোহাম্মদ মাহাদী।
স্বাগত বক্তব্যে অধ্যাপক নীলোৎপল বড়ুয়া বলেন, আমাদের লক্ষ্য, আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন শুদ্ধ বাংলা ভাষার প্রায়োগিক ও নান্দনিক ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠে। কবিতা ও অন্যান্য সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিসহ তাদের মধ্যে যেন সুকুমারবৃত্তিক ও সৃজনশীল মানসিকতা তৈরি হয়। তার সাথে তারা যেন আত্মবিশ্বাসী হয়ে গড়ে উঠে। সে লক্ষ্যে শব্দায়ন আবৃত্তি একাডেমির প্রশিক্ষণ পরিচালনায়, রামু উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে প্রতি শুক্রবার বিকালে নিয়মিত পরিচালিত হয় শিশুকিশোরদের উচ্চারণ, উপস্থাপনা, আবৃত্তি ও বক্তৃতা শেখানোর ক্লাস।
প্রতিযোগিতায় শিশুদের উপস্থাপনায় মুগ্ধ হয়ে রামু প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা পরিষদের আহ্বায়ক মাস্টার মোহাম্মদ আলম বলেন, মাত্র সাত মাস রামুতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এত কম সময়ে শিশুরা চমৎকার ভঙ্গিতে আবৃত্তি করেছে, বক্তব্য উপস্থাপন করেছে, তা আমাকে মুগ্ধ করেছে। এভাবেই আমাদের প্রজন্ম শিশুরা কথা বলা শিখবে। তাদের উচ্চারণ, তাদের কথা বলা মানুষ মুগ্ধ হয়ে শুনবে এবং সমাজে তারা ভালো ও জ্ঞানী মানুষ হয়ে বড় হবে। শিশুরা যে চর্চা নিয়ে বেড়ে উঠবে, সে বড় হয়ে তাই হবে। শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি চর্চায় বেড়ে উঠুক আমাদের সন্তানরা। শুদ্ধতার চর্চায় মানবিক মানুষ হবে, আমরা সেই লক্ষে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের শুদ্ধ সংস্কৃতি, আমার আপনার মন পাহারা দেয় এবং সম্প্রীতির সেতুবন্ধন রচনা করে।

রামু প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা পরিষদের সদস্য সচিব রেজাউল আমিন মোরশেদ বলেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে রামুতে শুরু হয়েছে শব্দায়ন আবৃত্তি একাডেমির প্রশিক্ষণ পরিচালনায় প্রমিত উচ্চারণ, বাচনিক উৎকর্ষ, আবৃত্তি নির্মাণ, উপস্থাপনা ও বক্তৃতা সহ- বাংলা ভাষা শুদ্ধ বলা এবং শুদ্ধ লেখার ওপর পাঠ্যবিষয় ভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। শিশু শিক্ষার্থীরা আবৃত্তি করতে করতে উচ্চারণ শিখবে, কথা বলা শিখবে।
অনুষ্ঠানে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা পরিষদ সদস্যরা শব্দায়ন আবৃত্তি একাডেমির সহকারী পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষক মিনহাজ চৌধুরীর জন্মদিন উদযাপন করেন। বাচিকশিল্পী মিনহাজ চৌধুরী জন্মদিনের কেক কাটেন এবং অনুভূতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন। শুক্রবার ৭ আগস্ট ছিলো মিনহাজ চৌধুরী জন্মদিন। একই সময়ে শিশু শিক্ষার্থী ওয়ানিয়া আজিজ ইরহা ও প্রজন্ম ৯৫ সদস্য মীর কাশেমকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো হয়। ৭ আগস্ট ছিলো তাদেরও জন্মদিন।






