উপজেলা গঠনের মূল লক্ষ্য জনসেবা সহজ করা, ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করা নয়।
কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার পূর্বাঞ্চলের গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, ঈদগড় ও কাউয়ারখোপ ইউনিয়ন নিয়ে নতুন ‘বাঁকখালী উপজেলা’ বা ‘পূর্বসীমান্ত উপজেলা’ গঠনের একটি প্রস্তাব ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। ১০ জুন ২০২৬ পূর্বাঞ্চলীয় চার ইউনিয়ন নিয়ে নতুন উপজেলা গঠনের দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবকারীদের বক্তব্যে পূর্বাঞ্চলের দুর্গম জনগোষ্ঠীর প্রশাসনিক সেবা ও উন্নয়ন-সুবিধা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।
দুর্গম এলাকার মানুষের জন্য প্রশাসনিক সুবিধা বাড়ানোর দাবি নিঃসন্দেহে যৌক্তিক এবং গণতান্ত্রিক অধিকার। গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, ঈদগড় কিংবা কাউয়ারখোপ কোনো এলাকার মানুষ উন্নয়ন ও সহজ প্রশাসনিক সেবা থেকে বঞ্চিত থাকুক, সেটি কারও কাম্য নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের নামে এমন কোনো সীমানা কি তৈরি করা উচিত? যার ফলে একটি এলাকার মানুষের জন্য উপজেলা সদর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি প্রশাসনিক সহায়তা আরও দূরে সরে যায়।
কাউয়ারখোপকে প্রস্তাবিত নতুন উপজেলার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত, মানুষের কাছে সেবা পৌঁছানো নতুন উপজেলা বা প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের উদ্দেশ্য কেবল মানচিত্রে একটি নতুন সীমানা আঁকা নয়। এর উদ্দেশ্য হলো প্রশাসনকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে যাওয়া। সেবা গ্রহণের সময় ও ব্যয় কমানো, আইনশৃঙ্খলা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সাড়া নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় উন্নয়নকে কার্যকর করা।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে নতুন উপজেলা ও থানা স্থাপনের বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিবেচিত হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দায়িত্বের মধ্যেই নতুন উপজেলা ও থানা স্থাপনসংক্রান্ত কাজ এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের জাতীয় নীতিমালা রয়েছে।
সুতরাং কোনো প্রস্তাবের ক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, প্রস্তাবিত সীমানা মানুষের প্রশাসনিক সুবিধা বাড়াবে, নাকি কমাবে? কাউয়ারখোপের ক্ষেত্রে উত্তরটি খুব সতর্কতার সঙ্গে খুঁজে দেখা দরকার।
কাউয়ারখোপের ভৌগোলিক বাস্তবতা অন্য তিন ইউনিয়নের তুলনায় ভিন্ন। বর্তমান সরকারি তথ্য অনুযায়ী কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের পূর্বে রয়েছে কচ্ছপিয়া ইউনিয়ন ও বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা। দক্ষিণে সোনাইছড়ি, পশ্চিমে ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন এবং উত্তরে জোয়ারিয়ানালা। অন্যদিকে কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের সরকারি তথ্যেও এর পূর্ব ও দক্ষিণ সীমানায় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার অবস্থান এবং পশ্চিমে কাউয়ারখোপের কথা উল্লেখ রয়েছে। কচ্ছপিয়া থেকে রামু উপজেলা সদর প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে। অর্থাৎ কাউয়ারখোপকে কচ্ছপিয়া-গর্জনিয়া-ঈদগড়কেন্দ্রিক একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার আগে শুধু চার ইউনিয়নের জনসংখ্যা বা আয়তন যোগ করলেই হবে না। দেখতে হবে এই চারটি এলাকার মধ্যে প্রশাসনিকভাবে কার্যকর, সারাবছর ব্যবহারযোগ্য এবং দুর্যোগের সময়ও সচল যোগাযোগ কাঠামো আদৌ আছে কি না।এখানেই বড় প্রশ্নটি সামনে আসে।
বর্ষায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে জরুরি সেবা কীভাবে পৌঁছাবে? কাউয়ারখোপের অন্যতম বড় বাস্তবতা হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং বর্ষাকালীন দুর্যোগঝুঁকি।
পার্বত্য এলাকা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে রামুর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন সড়ক ও সংযোগপথ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। বৃহত্তর পূর্বাঞ্চল যে দুর্যোগপ্রবণ, তারও প্রমাণ রয়েছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি অতীতে গর্জনিয়া ও কচ্ছপিয়ায় দুর্যোগ সহনশীলতা কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে।
এখন একটি বাস্তব পরিস্থিতি কল্পনা করা যাক। ধরা যাক, বর্ষার রাতে কাউয়ারখোপে একটি বড় দূর্ঘটনা হলো। অথবা পাহাড়ি ঢলে কোনো গ্রাম প্লাবিত হলো। অথবা কোনো গুরুতর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তৈরি হলো। অথবা শত শত পরিবারকে দ্রুত উদ্ধার করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কত দ্রুত উদ্ধারকারী দল, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, চিকিৎসা সহায়তা কিংবা ত্রাণ পৌঁছাতে পারবে।
যদি প্রস্তাবিত উপজেলার সদর গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া বা অন্য কোনো পূর্বাঞ্চলীয় কেন্দ্রে হয় এবং সেই সময়ে নাইক্ষ্যংছড়ি হয়ে সংযোগকারী পথ পাহাড়ি ঢল, সড়ক ক্ষতি বা অন্য কোনো কারণে বন্ধ থাকে, তাহলে কাউয়ারখোপে জরুরি সরকারি সহায়তা পৌঁছানোর জন্য বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হতে পারে। আর বিকল্প পথ হিসেবে যদি ঈদগড় হয়ে, ঈদগাঁ হয়ে রামু দিয়ে কাউয়ারখোপ আসতে হয় সে ক্ষেত্রে কম পক্ষে ১০০ কিলোমিটারের বেশি পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে কাউয়ারখোপ আসতে হবে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে একই উপজেলা হলেও বাস্তবে জরুরি প্রশাসনিক সেবা পৌঁছাতে সময় বেড়ে যেতে পারে। এটি কি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্য পূরণ করবে?
ফায়ার সার্ভিসের বাস্তবতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। ২০২৪ সালের একটি সংবাদ প্রতিবেদনে বৃহত্তর গর্জনিয়া অঞ্চলে ফায়ার স্টেশন না থাকার কারণে রামু সদর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরের এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে দ্রুত সাড়া দেওয়া কঠিন হওয়ার কথা উঠে এসেছিল। অর্থাৎ পূর্বাঞ্চলের মানুষের সমস্যা বাস্তব। কিন্তু এর সমাধান কি কাউয়ারখোপকে প্রশাসনিকভাবে আরও দূরে সরিয়ে নেওয়া?
নাকি সমাধান হতে পারে গর্জনিয়ায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন, কচ্ছপিয়া-গর্জনিয়া এলাকায় জরুরি সেবা অবকাঠামো তৈরি। পুলিশ ফাঁড়ি ও স্বাস্থ্যসেবা জোরদার, দুর্যোগকালীন উদ্ধার ও ত্রাণের জন্য স্থানীয় সক্ষমতা তৈরি। রামু সদর থেকে দ্রুত বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা; পাহাড়ি ঢল ও বন্যাপ্রবণ সড়কে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ। প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তনের আগে এসব বিকল্পের কার্যকারিতা অবশ্যই মূল্যায়ন করা উচিত।
কাউয়ারখোপকে রামু থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রশ্নে ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। কাউয়ারখোপ বর্তমান রামু উপজেলার একটি ইউনিয়ন। বর্তমানে কাউয়ারখোপের জনসংখ্যা প্রায় ৫৫,২৭৭ এবং পুরো রামু উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৫৪৫।
রামুর প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসও দীর্ঘ ও স্বতন্ত্র। সরকারি রামু উপজেলা পোর্টাল রামুর দীর্ঘ বৌদ্ধ ঐতিহ্য, বৌদ্ধবিহার ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের কথা উল্লেখ করেছে।
কাউয়ারখোপের মানুষের প্রশাসনিক পরিচয়, শিক্ষা, ভূমি, নাগরিক সেবা, সরকারি নথিপত্র এবং দৈনন্দিন অর্থনৈতিক যোগাযোগ দীর্ঘদিন ধরে রামুর সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নে এই ঐতিহাসিক ও সামাজিক সংযোগও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
কাউয়ারখোপ ঐতিহাসিকভাবে রামুর সদর ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের সাথে ছিল। ১৯৭২ সালে ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন থেকে আলাদা করে কাউয়ারখোপ ইউনিয়ন গঠিত হয়, যার প্রথম ইউনিয়ন নির্বাচন হয় ১৯৭৩ সালে। তাই ঐতিহাসিক বিবেচনায় কাউয়ারখোপ রামু উপজেলার সদর ইউনিয়ন ফতেখাঁরকুলের সাথে গেলেই বরঞ্চ অনেকটা যুক্তিযুক্ত হবে বলে মনে হয়।
নতুন উপজেলা চাইলে কাউয়ারখোপকে কেন অবশ্যই যুক্ত করতে হবে? এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া ও ঈদগড়ের মানুষ যদি মনে করেন যে তাদের জন্য একটি নতুন উপজেলা প্রয়োজন। সেই দাবি নিয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক। পূর্বাঞ্চলের মানুষের প্রশাসনিক সেবা ও উন্নয়ন ঘাটতি থাকলে তার সমাধান অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু নতুন উপজেলা প্রয়োজন, এই যুক্তি থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাউয়ারখোপকেও সেই উপজেলার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, এমন কোনো প্রশাসনিক যুক্তি নেই। বরং নতুন উপজেলা গঠনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় প্রতিটি ইউনিয়নের সঙ্গে সম্ভাব্য উপজেলা সদরের দূরত্ব, যাতায়াত সময়, সড়কের স্থায়িত্ব, বর্ষাকালীন যোগাযোগ, নদী খাল পাহাড়ের বাধা, জরুরি সেবা পৌঁছানোর সময়, জনগণের প্রশাসনিক অভ্যাস সামাজিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ। এসব সূচক আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। এই পরীক্ষা যদি কাউয়ারখোপের ক্ষেত্রে করা হয়, তাহলে রামুর সঙ্গে এর সংযোগকে উপেক্ষা করার সুযোগ খুবই কম।
চার ইউনিয়নের মোট জনসংখ্যা বড়, কিন্তু জনসংখ্যার যোগফলই সব নয়। প্রস্তাবিত চার ইউনিয়নের মোট জনসংখ্যা এক লাখের বেশি, এমন দাবি স্মারকলিপিতে করা হয়েছে। সংবাদ প্রতিবেদনেও এই তথ্য এসেছে। কিন্তু উপজেলা গঠনের ক্ষেত্রে শুধু জনসংখ্যা যোগ করে সিদ্ধান্ত নিলে চলবে না। কারণ চারটি ইউনিয়নের ভৌগোলিক বিন্যাস যদি প্রশাসনিক সদর থেকে সমানভাবে সহজে যোগাযোগযোগ্য না হয়, তাহলে একটি বড় জনসংখ্যাকে একটি প্রশাসনিক ইউনিটে যুক্ত করেও কার্যকর সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নাও হতে পারে। একটি ভালো প্রশাসনিক মানচিত্র হলো সেটি, যেখানে মানুষ সবচেয়ে কম সময়ে প্রশাসনের কাছে পৌঁছাতে পারে এবং প্রশাসনও সবচেয়ে কম সময়ে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। এই নীতিতে কাউয়ারখোপকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
কাউয়ারখোপকে রামুর বাইরে ঠেলে দেওয়া কেন ঝুঁকিপূর্ণ? কাউয়ারখোপকে যদি গর্জনিয়া কচ্ছপিয়া ঈদগড়কেন্দ্রিক নতুন উপজেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাহলে একটি অদ্ভুত প্রশাসনিক বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।
একদিকে থাকবে রামু উপজেলার সদর ও মূল প্রশাসনিক কেন্দ্র। অন্যদিকে কাউয়ারখোপের পূর্বে থাকবে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা। আর কাউয়ারখোপকে প্রশাসনিকভাবে যুক্ত করা হবে পূর্বাঞ্চলের নতুন একটি উপজেলার সঙ্গে। অর্থাৎ কাউয়ারখোপ তার ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এমন একটি কাঠামোর মধ্যে পড়তে পারে, যেখানে জরুরি সময়ে প্রশাসনিক যোগাযোগের বাস্তব সুবিধা প্রশ্নের মুখে পড়বে।
এটি শুধু একটি ইউনিয়নের বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রীয় সেবা পৌঁছানোর সময় ও সক্ষমতার বিষয়।
সমাধান কী হতে পারে? কাউয়ারখোপকে নতুন উপজেলার সঙ্গে যুক্ত না করেও পূর্বাঞ্চলের মানুষের জন্য প্রশাসনিক সুবিধা বাড়ানোর একাধিক পথ রয়েছে।
প্রথমত, গর্জনিয়া-কচ্ছপিয়া-ঈদগড়কে কেন্দ্র করে নতুন উপজেলা গঠনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে। যদি বাস্তব সমীক্ষায় দেখা যায় যে, এই তিন ইউনিয়নকে নিয়ে একটি কার্যকর উপজেলা গঠন সম্ভব। তবে সেই প্রস্তাব আলাদাভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, কাউয়ারখোপকে রামুর সঙ্গে রাখা যেতে পারে, এটাই ভৌগোলিক, প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিকভাবে অধিক যৌক্তিক বিকল্প বলে মনে হয়।
তৃতীয়ত, কাউয়ারখোপকে রামু পৌর এলাকার সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা পরীক্ষা করা যেতে পারে। যদি নগরায়ন ও জনসংখ্যাগত বাস্তবতা সেই সুযোগ সৃষ্টি করে, তাহলে কাউয়ারখোপকে রামুর সঙ্গে রেখে পৌর কাঠামোর আওতায় আনার বিষয়টি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বিবেচনা করা যেতে পারে।
চতুর্থত, পৃথক পৌরসভা বা শক্তিশালী স্থানীয় সরকার কাঠামোর সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে
কাউয়ারখোপের নিজস্ব জনসংখ্যা, বাজার, অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও নগরায়নের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে পৃথক পৌরসভা গঠনের সম্ভাবনাও একটি নীতিগত বিকল্প হতে পারে।
পঞ্চমত, কাউয়ারখোপে জরুরি সরকারি সেবা বাড়ানো দরকার। বিশেষ করে পুলিশ ফাঁড়ি, ফায়ার সার্ভিস বা ফায়ার সাব-স্টেশন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও জরুরি চিকিৎসা, দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র, উন্নত সড়ক ও সেতু, পাহাড়ি ঢল ও বন্যা মোকাবিলার অবকাঠামো, দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণ সরবরাহের স্থানীয় ব্যবস্থা। এসবই হতে পারে প্রকৃত প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ।
এটি গর্জনিয়া বনাম কাউয়ারখোপের প্রশ্ন নয়, এই বিতর্কে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। গর্জনিয়ার মানুষ কাউয়ারখোপের শত্রু নয়। কচ্ছপিয়ার মানুষ কাউয়ারখোপের শত্রু নয়। ঈদগড়ের মানুষও নয়। কাউয়ারখোপের মানুষও গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া কিংবা ঈদগড়ের উন্নয়নের বিরোধী নয়। বরং প্রত্যেক এলাকার মানুষ তাদের নিজ নিজ বাস্তবতা থেকে একটি প্রশাসনিক কাঠামোর প্রস্তাব করছেন। এখানে বিরোধটা মানুষের সঙ্গে মানুষের নয়; প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে।
তাই কাউয়ারখোপকে প্রস্তাবিত উপজেলা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি কোনো আঞ্চলিক বিরোধ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে নয়। এটি হওয়া উচিত একটি তথ্যভিত্তিক প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের দাবি।
সরকারের কাছে একটি বিনীত আবেদন
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে প্রশাসনিক দক্ষতা, জনসেবা এবং স্থানীয় উন্নয়নকে আরও কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার ২০২৬ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর সুশাসন ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে। তাই প্রস্তাবিত ‘বাঁকখালী উপজেলা’ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মাঠপর্যায়ে একটি নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা জরুরি।
এই সমীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হোক—
১. চার ইউনিয়নের বাস্তব সড়ক দূরত্ব;
২. বর্ষাকালে যাতায়াতের সময়;
৩. পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ইতিহাস;
৪. উপজেলা সদর থেকে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর সম্ভাব্য সময়;
৫. হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবার দূরত্ব;
৬. জনগণের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাজার ও প্রশাসনিক যোগাযোগের বর্তমান কেন্দ্র;
৭. নদী, পাহাড় ও সীমান্তভূমির ভৌগোলিক বাস্তবতা;
৮. জনগণের মতামত; এবং
৯. ভবিষ্যৎ ২০–৩০ বছরের জনসংখ্যা ও নগরায়নের সম্ভাবনা।
তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। কারণ প্রশাসনিক সীমানা একবার পরিবর্তন করা হলে তা মানুষের জীবন, অর্থনীতি, পরিচয় ও সরকারি সেবার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
শেষ কথা : কাউয়ারখোপকে গর্জনিয়া-কচ্ছপিয়া-ঈদগড়ের সঙ্গে যুক্ত করে নতুন উপজেলা গঠনের প্রস্তাবকে তাই আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তবতার আলোকে দেখা দরকার। প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয় ‘কোন ইউনিয়ন কোন উপজেলার সঙ্গে থাকবে?’ প্রশ্নটি হওয়া উচিত ‘কোন প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে কাউয়ারখোপের একজন সাধারণ মানুষ সবচেয়ে দ্রুত সরকারি সেবা পাবে?’ একজন অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিতে হলে কোন সদর সবচেয়ে কাছে? একটি বাড়িতে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস কোথা থেকে সবচেয়ে দ্রুত পৌঁছাবে? বন্যায় মানুষ আটকা পড়লে উদ্ধারকারী দল কোন দিক দিয়ে সবচেয়ে দ্রুত যাবে? আইনশৃঙ্খলার সংকট হলে পুলিশ কোথা থেকে সবচেয়ে দ্রুত আসতে পারবে? পাহাড়ি ঢলে রাস্তা বন্ধ হলে কোন প্রশাসনিক কেন্দ্রের সঙ্গে বিকল্প যোগাযোগ সবচেয়ে কার্যকর থাকবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি কাউয়ারখোপকে রামুর সঙ্গে রাখার পক্ষে যায়, তাহলে শুধু জনসংখ্যার হিসাব বা মানচিত্রের সুবিধার জন্য কাউয়ারখোপকে অন্য একটি প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা উচিত হবে না।
প্রশাসন মানুষের জন্য; মানুষ প্রশাসনিক মানচিত্রের জন্য নয়। তাই পূর্বাঞ্চলের গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া ও ঈদগড়ের মানুষের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সুবিধার দাবিকে সম্মান জানিয়েই বলা যায়, তাদের জন্য নতুন উপজেলা গঠনের সম্ভাবনা যাচাই হোক। কিন্তু কাউয়ারখোপের ভৌগোলিক বাস্তবতা, রামুর সঙ্গে ঐতিহাসিক-প্রশাসনিক সম্পর্ক এবং জরুরি সেবা পৌঁছানোর সক্ষমতা বিবেচনা করে কাউয়ারখোপকে রামু উপজেলার সঙ্গেই রাখা হোক।
আর কাউয়ারখোপের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন হলে তাকে রামুর সঙ্গে আরও শক্তভাবে সংযুক্ত করা, পৌর কাঠামোর আওতায় আনা কিংবা ভবিষ্যতে পৃথক পৌরসভা হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা যাচাই করা হোক। এটাই হবে এমন একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, যার কেন্দ্রে থাকবে মানুষ, সেবা, যোগাযোগ ও বাস্তবতা, রাজনীতি নয়।
লেখক ড. নাছির উদ্দীন, সভাপতি, বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন। আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সোসাইটি। একজন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।






