এম.এ আজিজ রাসেল:
১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় ও পর্যটন মৌসুমের শুরুতেই পর্যটকে মূখরিত হয়েছে কক্সবাজার। বুকিং হয়ে গেছে তারকা হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউসসহ আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ পর্যন্ত পর্যটক ইতোমধ্যে কক্সবাজারের ঠাঁই করে নিয়েছেন।
পর্যটকদের এই স্রোত অব্যাহত রয়েছে। তাদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে ট্যুরিষ্ট পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন নিশ্চিত করেছে। এদিকে পর্যটক আগমনে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলছেন। শুক্রবার ও শনিবার বিকেলে সাগর পাড়ে গিয়ে দেখা গেছে, শহরের কলাতলী থেকে ডায়াবেটিক পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার সৈকতজুড়ে মানুষ আর মানুষ। আবাল বৃদ্ধ-বণিতার ভিড়ে সৈকতে হাঁটাও দুষ্কর হয়ে পড়েছে। বেড়াতে আসা পর্যটকদের মধ্যে কেউ কেউ সৈকতে হাঁটছেন, কেউবা চেয়ারে বসে গল্পগুজব করছেন, আবার কেউ কেউ সাগরে গোসলে মত্ত। অনেকেই বিচ বাইক ও ওয়াটার বাইকে চড়ে উপভোগ করছেন বিচ স্পোর্টস।
পর্যটকদের নিরাপত্তা দিতে পুলিশকে সবসময় তৎপর দেখা যায়। নিরাপত্তার লক্ষ্যে প্রশাসনের সব ইউনিট সর্বোচ্চ সতর্কবস্থায় নজরদারি বাড়িয়েছে। কোথাও যাতে কোনও অনিয়ম না হয় সেজন্য প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে সমুদ্র সৈকত লাবণীর পাশে পুলিশ কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। ১০ মিনিটের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ পর্যটকদের অভিযোগ দ্রুত আমলে নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ। ট্যুরিস্ট পুলিশের সাদা পোশাকধারী লোকজন পর্যটকদের সঙ্গে মিশে গিয়ে অপরাধী সনাক্ত করার কৌশল গ্রহণ করেছে। মোতায়েন করা হয়েছে মহিলা পুলিশও। আর সব নিরাপত্তা ও পর্যটকদের সেবা দিতে সমুদ্র সৈকতের সব পয়েন্টে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করেন ট্যুরিস্ট পুলিশের সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার হোসাইন মো: রায়হান কাজেমী।
কক্সবাজার হোটেল মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাসেম সিকদার আমাদের রামু কে বলেন, দেশিবিদেশি অগণিত পর্যটক ৩ শতাধিক হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস, রেস্ট হাউস, কটেজ ও আবাসিক হোটেলে উঠেছেন। কোথাও এখন ঠাঁই নেই। বিজয় দিবসের ছুটিতে সব গ্লানি মুছে বেড়ানোর পাশাপাশি একে অপরের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে এসব দেশিবিদেশি পর্যটক এখন কক্সবাজারে ভিড় জমিয়েছে। নারী পুরুষ, শিশু, আবাল বৃদ্ধ বণিতা কেউ বাদ যায়নি।
তারকা মানের হোটেল কক্স-টুডের জেনারেল ম্যানেজার শাখাওয়াত হোসাইন পিৃষ্ঠা ৩ কলাম ৫ পর্যটকের আগমণ জানান, মহান বিজয় দিবস ও পর্যটন মৌসুমের শুরুতেই হোটেলের সব রুম বুকিং হয়ে যায়। প্রতিনিয়তই অসংখ্য পর্যটক হোটেল রুম বুকিং দেওয়ার জন্য কল করছেন। কিন্তু, নতুন করে কাউকে হোটেল রুম বুকিং দেওয়া সম্ভবপর হচ্ছে না। সবাই এখানকার নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য ছুটে আসছে।
বলছেন, সপরিবারে, বন্ধু–বান্ধবসহ দলবদ্ধ পর্যটকদের পাশাপাশি নব দম্পত্তি, স্কুল–কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র–ছাত্রী, দেশের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারীসহ বিভিন্ন স্তরের দেশীয় পর্যটকদের আনাগোনা আগের তুলনায় অনেকাংশে বেড়েছে। যে হারে পর্যটকের আগমন বেড়েছে, সে অনুপাতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সেবার মান বাড়াতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। এ অভিযোগ আগত পর্যটকদের অধিকাংশরই। এক্সক্লোসিভ ট্যুরিস্ট জোন না থাকায় বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকেরা নিজেদেরকে কখনোই নিরাপদ ভাবতে পারছেন না। পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট মাথায় রেখে বিদেশি পর্যটকদের অনেক সময় সতর্কতার সঙ্গে ভ্রমণ করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে অনেকে নানা প্রতিকূল অবস্থা মোকাবেলা করে নিজ দায়িত্বে ভ্রমণ করছেন।
শুধু কক্সবাজার নয়, পর্যটকদের ভ্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন, পাথুরে বীচ ইনানী, পাহাড়ী ঝর্ণাসমৃদ্ধ হিমছড়ি, পাহাড়ঘেরা দরিয়া নগর, ইতিহাসমৃদ্ধ আদিনাথ মন্দির, রামুর রামকোর্ট, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক ও কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতসহ সাগর পাড়ে গড়ে উঠা বিভিন্ন হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউজ ও কটেজে। তবে পর্যটকদের বিশাল অংশ প্রতিনিয়ত চরম হয়রানির শিকার হচ্ছে খাবার হোটেল, রিক্সাচালক, টমটম চালক, ক্যামরা ওয়ালা, পর্যটন স্পট, হিমছড়ি পিকনিক স্পট, হিমছড়ি যাদুঘর।
সেসব জায়গায় নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হলেও প্রশাসন তা প্রতিরোধে কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এ নিয়ে পর্যটকদের সঙ্গে ইজারাদারের লোকজনের অনেক সময় অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে। এছাড়া আবাসিক হোটেলগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। রিক্সা আর টমটম ছাড়াও বাস, মাইক্রোবাস, জীপ, সি ট্রাকসহ বিভিন্ন পরিবহনে পর্যটকদের কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
শহরের ৩টি প্রবেশ পথ ও বীচের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ক্লোজ সার্কিট ক্যামরা বসানো হয়েছে। র্যাব, পুলিশ ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সদস্যরা বিভিন্ন যানবাহন, অটোরিক্সা, কার, মাইক্রো, বিভিন্নস্থাপনা ও সন্দেহজনক ব্যক্তিবর্গকে তল্লাশিও করছে। কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার হোসাইন মো: রায়হান কাজেমী বলেন, মহান বিজয় দিবস, সরকারী ছুটি ও পর্যটন মৌসুমের শুরুতেই বেড়াতে আসা প্রায় দেড় লাখেরও বেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা দিতে নিরাপত্তা বেস্টনী গড়ে তোলা হয়েছে। যাতে দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটকরা স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়াতে পারে। বিভিন্ন স্পটে ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোষাকধারি বিভিন্ন সোর্স ও মহিলা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সাদা পোশাকের পুলিশও তৎপর রয়েছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তা দেওয়া পুলিশের কর্তব্য জানিয়ে তিনি আরো বলেন, পুরো সমুদ্র সৈকত এলাকায় ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে মোট ১৬ টি ইউনিট পর্যায়ক্রমে রাত-দিন ২৪ ঘন্টা দায়িত্ব পালন করছে। আর মোড়ে মোড়ে মোবাইল টিম বসানো হয়েছে যা কন্ট্রোল রুম থেকে তদারকি করা হচ্ছে। গতকাল সমুদ্র সৈকতে হারিয়ে যাওয়া এক শিশুকে উদ্ধার করে প্রায় ৫ ঘন্টা পর তার মা-বাবার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসক মো. আলী হোসেন আমাদের রামু কে বলেন, পর্যটক হয়রানি বন্ধে হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁয় মূল্য তালিকা টানানোর নির্দেশনা দেয়া আছে।
২০১৬ সাল সরকার ঘোষিত পর্যটন বর্ষ। তাই পূর্বের সময়ের চেয়ে এবারে পর্যটক সেবার প্রতি সবার বাড়তি নজর দেয়া প্রয়োজন। বাড়তি টাকা আদায় করা হোটেল-রেস্তোরার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।






