গোবিন্দগঞ্জে গত ৬ নভেম্বর সাঁওতাল ও বাঙালি পল্লিতে হামলার ঘটনায় তিনজনের নিহতের খবর পাওয়া গেলেও নতুন প্রকাশ পাওয়া আরেকটি ভিডিও অনুযায়ী, হামলাকারীরা দুটি নিথর দেহ নিয়ে গেছে। শুরু থেকেই এলাকাবাসী বলছেন, এখনও তাদের অনেকেই নিখোঁজ আছেন। মামলার ভয়ে পুরুষেরা পালিয়ে থাকার কারণে নিখোঁজ ব্যক্তিদের কে বেঁচে আছেন বা কে নেই, সেই বিষয়টি তারা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না। তবে এদের একজন পরের দিন ফেলে যাওয়া মঙ্গল মারডি কিনা, সেই সন্দেহ করছেন কেউ কেউ। নতুন এই ভিডিওতে দেখা নিথর দেহ দুটির কী পরিচয় এবং তারা কোথায় আছেন, নতুন করে সে প্রশ্নও দেখা দিয়েছে।রিপোর্ট বাংলা ট্রিবিউনের।
গত ৬ নভেম্বর সাঁওতালদের ওপর হামলার ঘটনায় তিনজন নিহতের খবর নিশ্চিত করে পুলিশ। তাদের নাম শ্যামল হেমব্রম, রমেশ টুডু ও মঙ্গল মারডি। পুলিশের দাবি, এদের মধ্যে রমেশের মৃত্যু স্বাভাবিক কারণে হয়েছে এবং শ্যামল মারা গেছেন হাসপাতালে। আর পুলিশ পরে মঙ্গল মারডির লাশ ফেলে রেখে যায়। স্থানীয় এক সাংবাদিকের ধারণ করা ভিডিও বুধবার প্রকাশ পাওয়ার পর দেখা যায়, হামলাকারীরা দুটি নিথর শরীর টেনে নিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো- তাহলে এই দুটি নিথর দেহ কার এবং তারা এখন কোথায়?
এক মিনিট ১১ সেকেন্ডের ভিডিওটি স্থানীয়ভাবে ধারণ করা হলেও এখনও তা প্রকাশ করা হয়নি। ভিডিওটিতে পুলিশের সঙ্গে সাঁওতালদের ফসল কাটা নিয়ে প্রথম দিনের যে তর্ক সেটি দেখা গেছে। এছাড়া, উচ্ছেদকারীদের পক্ষে একদল কর্মী ইটপাটকেল ছুঁড়ছে- এমন দৃশ্যও দেখা গেছে। একটি ট্রাক থেকে পুলিশ সদস্যদের নামতে দেখা যায়। ভিডিওতে ৪৩ সেকেন্ডের সময় শিল্প মন্ত্রণালয় লেখা আরেকটি ট্রাক থেকে হাতে নানারকম দেশীয় অস্ত্র ও লাঠি নিয়ে হামলাকারীদের নামতে দেখা যায়। যারা ভিন্ন এলাকা থেকে এসেছে বলে এলাকাবাসীর দাবি। এরপর হামলার আগ মুহূর্তে গ্রামে প্রবেশের মুখে কেউ যাতে হামলাকারীদের ভিডিও না করে, সেজন্য ভিডিও ধারণকারীকে নিষেধ করতেও দেখা যায়, যা এই ভিডিওতে ধরা পড়েছে।
ওইদিন তাদের কেউ নিহত হয়েছিলেন কিনা প্রশ্নে রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আব্দুল আওয়াল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘আমরা সকালে কয়েকজন কর্মকর্তা ও শ্রমিক নিয়ে যখন আখ কাটার জন্য সেখানে যাই, তখন সাঁওতালরা বাধা দেয়। আমিসহ অন্য কর্মকর্তারা তখন তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। একসময় শ্রমিকদের সঙ্গে সাঁওতালদের ধাক্কাধাক্কি হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে সেসময় গোবিন্দগঞ্জ থানার কয়েকজন পুলিশ থাকলেও তারা কোনও ভূমিকা না নেওয়ায়, আমি তাদের ওপর নাখোশ হই।’ ভিডিওতে দেখা গেছে পুলিশ আগুন দিচ্ছে জানানো হলে তিনি কোনও জবাব দেননি। তিনি বলেন,‘সাঁওতালদের বাধার মুখে আমি লোকজন নিয়ে ফিরে আসার সময় তাদের (সাঁওতালদের) আক্রমণের শিকার হই। ’

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান বলেন, ‘ভিডিওতে যদি এমনটা দেখা যায় তাহলে সেটি আহত সাঁওতালও হতে পারে। আবার যাদের ফেলে গেছে তাদেরও কেউ হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটিতো নিশ্চিত যে এখনও পর্যন্ত হামলাকারীদের মধ্যে কেউ মারা গেছে বলে তারা দাবি করেনি। তাহলে স্পষ্টতই শরীরদুটো (নতুন ভিডিওতে দেখা) হামলার শিকার আহত সাঁওতালদেরই।’
ফ্যাক্ট ফাইণ্ডিং টিম এর সদস্য ও গোবিন্দগঞ্জের ঘটনা নিয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদনকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘তিনজন মানুষ হত্যা হলেও এটা নিয়ে কোনও মামলা হয়নি। নতুন যে ভিডিওটির কথা বলছেন সেটিতে দুটি শরীর যেভাবে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সেই বডি কার এই জবাব দিতে হবে। ’ তিনি বলেন, ‘আমরা গিয়ে জানতে পেরেছি, পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। কিন্তু তাদের এখনও কোনও জবাবদিহি করতে হয়নি। পুলিশের সদস্যদেরকে নিজ হাতে সাঁওতালদের বাসাবাড়িতে আগুন দেওয়ার যে ভিডিওটি এর আগে দেখা গেছে, তারপর আবার পুলিশকেই সেই ঘটনা তদন্ত করতে দেওয়ার কোনও নৈতিক ভিত্তি নেই।’
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘সাঁওতাল ও বাঙালি পল্লিতে যে হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে, তার সঙ্গে জড়িতদের বিচার না হলে অপরাধীরা উৎসাহ পাবে। এটি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথেও অন্তরায়।’ এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত পুনর্বাসন ও তাদের জমি ফিরিয়ে দিয়ে চলমান বঞ্চনার অবসান হওয়াও জরুরি। গোবিন্দগঞ্জে যা ঘটেছে, তা সবার জ্ঞাতসারে হয়েছে। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে এই অন্যায়ের অবসান ঘটানোর।’
গাইবান্ধায় সাঁওতাল উচ্ছেদের নতুন ভিডিও
উল্লেখ্য,গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের রংপুর চিনিকলের সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারে গত ৬ নভেম্বর আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষ হয়। এতে তিন সাঁওতাল মারা যান। গুলিবিদ্ধ হন আরও চারজন। কিন্তু এলাকাবাসীর অভিযোগ, তাদের অনেক পুরুষ সদস্য এখনও গ্রামের বাইরে থাকায়, তারা আদৌ বেঁচে আছেন কিনা, তা তারা বলতে পারছেন না। এরই মধ্যে দ্বিতীয় একটি ভিডিও বুধবার প্রকাশিত হয়। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, দুইজন সাঁওতালের নিথর শরীর হামলাকারীরা নিয়ে যাচ্ছে ।
এর আগে পুলিশ সদস্যরাই যে সাঁওতালদের বসতিতে আগুন দিয়েছিল, বাংলা ট্রিবিউনের হাতে তার একটি ভিডিও এসেছিল। এতে পুলিশ সদস্যদের এসব বাড়িঘরে আগুন লাগাতে দেখা গেছে। তবে পুলিশ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।






