নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন ইস্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে বৈঠকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংবিধানের ১১৮ ও ৪৮ অনুচ্ছেদের বাইরে কোনও প্রস্তাব দেবে না। এর মধ্য থেকেই রাষ্ট্রপতিকে সমাধান বের করার অনুরোধ জানাবে ক্ষমতাসীন দলটি। নির্বাচন কমিশন গঠন ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে চলমান বৈঠকে এখনও আওয়ামী লীগকে ডাকেননি রাষ্ট্রপতি। তবে ক্ষমতাসীন দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের ধারণা, ১০ জানুয়ারির পর যেকোনও সময়ে তাদের সঙ্গে সংলাপে বসতে পারেন রাষ্ট্রপতি।রিপোর্ট বাংলা ট্রিবিউনের।
আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন, দলটি সংবিধানের ৪৮ ও ১১৮ অনুচ্ছেদের অনুচ্ছেদের বাইরে কোনও কথা বলবে না। তারা বলেন, সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত যুগোপযোগী হবে না। সমস্যারও স্থায়ী সমাধান আসবে না। তাই সংবিধানের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে আপস করবে না আওয়ামী লীগ।
সংবিধানের ৪৮ ও ১১৮ অনুচ্ছেদে যা বর্ণিত আছে তা হলো
৪৮। (৩) এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্টপতি তাহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন:
তবে শর্ত থাকে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনও পরামর্শদান করিয়াছেন কিনা এবং করিয়া থাকিলে কী পরামর্শ দান করিয়াছেন, কোনও আদালত সেই সম্পর্কে কোনও প্রশ্নের তদন্ত করিতে পারিবেন না।
১১৮। (১) [প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চার জন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া] বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনও আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।
(২) একাধিক নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া নির্বাচন কমিশন গঠিত হইলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাহার সভাপতিরূপে কার্য করিবেন।
(৩) এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে কোন নির্বাচন কমিশনারের পদের মেয়াদ তাহার কার্যভার গ্রহণের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসরকাল হইবে এবং
(ক) প্রধান নির্বাচন কমিশনার-পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, এমন কোনও ব্যক্তি প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগলাভের যোগ্য হইবেন না;
(খ) অন্য কোনও নির্বাচন কমিশনার অনুরূপ পদে কর্মাবসানের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার রূপে নিয়োগলাভের যোগ্য হইবেন, তবে অন্য কোনোভাবে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগলাভের যোগ্য হইবেন না।
(৪) নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন এবং কেবল এই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবেন।
(৫) সংসদ কর্তৃক প্রণীত যে কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশনারদের কর্মের শর্তাবলী রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা যেরূপ নির্ধারণ করিবেন, সেইরূপ হইবে:
তবে শর্ত থাকে যে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হইতে পারেন, সেইরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত কোন নির্বাচন কমিশনার অপসারিত হইবেন না।
(৬) কোন নির্বাচন কমিশনার রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করিয়া স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদ ত্যাগ করিতে পারিবেন।
আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলেন, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন ইস্যুতে সংবিধানই হবে আলোচনার ভিত্তি। সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনও প্রস্তাবই ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্যে সুফল বয়ে আনবে না বলেও রাষ্ট্রপতিকে জানাবে আওয়ামী লীগ। তারা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথা বাংলাদেশে এসেছে কিন্তু সেটা স্থায়ী হয়নি। বরং রাজনীতিতে চড়াই-উৎরাই গেছে। সংবিধানের আলোকে যেকোনও সিদ্ধান্ত নিলে তা ভবিষ্যৎ রাজনীতির ভালো করবে। না হয় সংঘাত-সংর্ঘের রাজনীতি অব্যাহত থাকবে।
কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, রাষ্ট্রপতি সংলাপের আহ্বান জানালে আমরা যাব। সেখানে আমরা সংবিধানের বাইরে কোনও প্রস্তাব রাষ্ট্রপতিকে দেব না। পাশাপাশি সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত যেন না নেওয়া হয়, সে ব্যাপারে রাষ্ট্রপতিকে নিরুৎসাহিত করা হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সব বিষয়ে আমার কমেন্টস চান কেন? আমাদের দলের চার জন মুখপাত্র ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা বলুন। তারা বক্তব্য দেবেন। প্লিজ আমাকে সব বিষয়ে নক না করলে ভালো হয়।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য প্রবীণ রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপের মূলেই থাকবে ১১৮ ও ৪৮ অনুচ্ছেদ। এর আলোকে যা করণীয়, তাই করতে রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানাবে আওয়ামী লীগ। সংবিধানের আলোকে যে সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতি নেবেন, তার সঙ্গে একমত পোষণ করবে ক্ষমতাসীন দলটি।
জানতে চাইলে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন গঠন ইস্যু নিয়ে সংবিধানের বাইরে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। আমরা রাষ্টপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নিলে সংবিধানের আলোকে তিনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সে সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগের কোনও ভিন্নমত থাকবে না।’ তিনি বলেন, ‘সংলাপে আমাদের স্ট্যান্ডই থাকবে সংবিধান। ১১৮ ও ৪৮ অনুচ্ছেদ। সেখানে যা বলা আছে, সে অনুযায়ীই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতি ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তাতে আমাদের আস্থা আছে।’
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি আওয়ামী লীগকে এখনও সংলাপের আমন্ত্রণ জানাননি। আমাদের আমন্ত্রণ জানালে আমরা যাব। সংবিধানের আলোকে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নিতে আমরা অনুরোধ করব।’ তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ৪৮ ও ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি যেন সিদ্ধান্ত নেন, সেই প্রস্তাবই দেবে আওয়ামী লীগ।’
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর বিএনপিসহ ৫টি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন কমিশন গঠন ইস্যুতে আলোচনার জন্য বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এরপর ২১ ডিসেম্বর ওয়ার্কার্স পাটিসহ ছয়টি দলকে আমন্ত্রণ জানান তিনি।
বিএনপির সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে এই সংলাপ শুরু হয় ১৮ ডিসেম্বর। ২০ ডিসেম্বর জাতীয় পার্টি, ২১ ডিসেম্বর এলডিপি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ এবং ২৬ ডিসেম্বর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) (ইনু) সঙ্গে আলোচনায় সঙ্গে সংলাপ করেছেন রাষ্ট্রপতি। এরপর ২৭ ডিসেম্বর বিকালে ওয়ার্কার্স পার্টি, ২৯ ডিসেম্বর বিএনএফ ও ইসলামী ঐক্যজোট, ২ জানুয়ারি জেপি (মঞ্জু) এবং ৩ জানুয়ারি তরিকত ফেডারেশন ও বিজেপিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বঙ্গভবন থেকে।






