মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনাকেই প্রধান লক্ষ্য ঠিক করলেও এ বছরে অর্জিত হয়নি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়ন ও সুরক্ষায় নানা উদ্যোগ নিলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আন্তরিকভাবে তৃণমূল পর্যন্ত সেবা পৌঁছে দিতে পারলে মাতৃমৃত্যুর হার রোধে বাংলাদেশ হবে অনুকরণীয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু কমিয়ে আনতে সরকার স্বাস্থ্যখাতে বিশেষ নজর দিয়েছে। এ কারণেই মাতৃমৃত্যুর হার কমছে। আবার গত কয়েক দশকে মাতৃমৃত্যুর হার কমার সঙ্গে সঙ্গে মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নেও নানা অগ্রগতি হয়েছে।রিপোর্ট বাংলা ট্রিবিউনের।
গত ২৫ বছরে (১৯৯০-২০১৫) বৈশ্বিকভাবে মাতৃমৃত্যুর হার ৪৪ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশে তা কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। আর বিবিএসের (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো) তথ্য অনুযায়ী, মাতৃমৃত্যুর পাশাপাশি কমেছে শিশুমৃত্যুর হারও। ২০১১ সালে শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ৩৫, গত বছরে তা ছিল ২৯। মাত্যৃমৃত্যুর হারও গত পাঁচ বছরে একই হারে কমে এসেছে। ২০১১ সালে প্রতি হাজারে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ২ দশমিক ৫৯, যা ২০১৫ সালে নেমে এসেছে ১ দশমিক ৮১তে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সরকার মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের মৃত্যু রোধ করতে নানা কর্মপরিকল্পনা পরিচালনা করছে। পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য সেন্টারগুলোতে নারীর গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে। এছাড়াও গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবায় অভূতপূর্ব সাফল্য এসেছে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে। আবার গ্রাম পর্যায়ে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু রোধে ২০১৮ সালের মধ্যে ৪২১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে প্রায় ৩ হাজার ধাত্রী নিয়োগ দেওয়া হবে।
অন্যদিকে, মাতৃমৃত্যু নিয়ে আমাদের দেশে কোনও ইনডিকেটর সেট করা নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রলালয়ের অতিরিক্ত সচিব রোকসানা কাদের। তিনি এ সর্ম্পকে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গ্লোবাল টার্গেট অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এক লাখে এক-তৃতীয়াংশ মাতৃমৃত্যু কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ এই গ্লোবাল টার্গেটকে নৈতিকভাবে সমর্থন দিয়েছে। আর এ বৈশ্বিক টার্গেটের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাংলাদেশ যেন এগিয়ে যেতে পারে তা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা কাজ করে যাচ্ছেন। আশা করছি, আমরা আমাদের টার্গেট পূরণের সক্ষমতা অর্জন করব।’
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) এবং মুগদা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. সামিউল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এসডিজি (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল- টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য) নিয়ে বাংলাদেশের টার্গেট প্ল্যান রয়েছে। এমডিজি (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল- সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য) অর্জনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে আমাদের সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে এবং সেভাবে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে।’ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে বলে মন্তব্য করেন ডা. সামিউল ইসলাম।
অন্যদিকে, সেভ দ্য চিলড্রেনের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. ইশতিয়াক মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগামী বছর থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য জনসংখ্যা পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রাম’ শুরু হবে পাঁচ বছরের জন্য। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য এটিই প্রথম সেক্টর প্রোগ্রাম। আর এই প্রোগ্রামগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সূচনা হবে।’
তবে স্বাস্থ্য সেবার কাভারেজ বাড়ানো, বৈষম্য কমানো এবং সেবার মান বাড়ানোর মতো বিষয়গুলোর দিকে নজর দেওয়া দরকার বলে মনে করেন ডা. ইশতিয়াক। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমানোর জন্য ফ্যাসিলিটিগুলোতে আরও জোর দিতে হবে। অর্থাৎ, দ্রুততম সময়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসব করানোর হারকে বাড়াতে হবে। আবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের হার বাড়ানোর জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকেও প্রস্তুত করতে হবে। ২৪ ঘণ্টা স্বাভাবিক প্রসবের ব্যবস্থা রাখতে হবে, কমপ্রিহেনসিভ নিউবর্ণ কেয়ার অর্থাৎ নবজাতকের সেবার ব্যবস্থা করতে হবে। এগুলোকে যেন দ্রুততার সঙ্গে নিশ্চিত করতে পারি, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’
মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসের ক্ষেত্রে যে অর্জন আমাদের রয়েছে, তার মধ্যে কিছু বৈষম্য রয়েছে উল্লেখ করে ইশতিয়াক মান্নান বলেন, ‘ধনী-গরিব বৈষম্য ও এলাকাভিত্তিক বৈষম্যকে কমিয়ে আনতে হবে। আরেকটি বিষয় হলো- মা, নবজাতক ও শিশুর জন্য দেওয়া সেবাগুলোর মান যেন উন্নত হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। কারণ, এই মানটা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ।’ উন্নত সেবা দেওয়া না গেলে এই অর্জন ধরে রাখা সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।






