উৎপল বড়ুয়া:
বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ তম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (৪ মার্চ) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত সমাবর্তনে প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. আবদুল হামিদ সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করেন। সমাবর্তন বক্তা ছিলেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিও এর প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক অমিত চাকমা ।
শনিবার বক্তৃতার শুরুতে তিনি বলেন, ‘আমার জন্ম বাংলাদেশের রাঙামাটির পাহাড়ে। চাকমা আমার মাতৃভাষা। ছোটকাল থেকে বাংলা ভাষা শিখেছি। দীর্ঘ ৪৮ বছর দেশের বাইরে থাকার কারণে বাংলার দক্ষতা হ্রাস পেয়েছে। মাতৃভাষা ও স্বাধিকার আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বাংলায় বক্তব্য রাখার আবেগ ধরে রাখতে পারছি না। বক্তব্য আমি যথাসম্ভব বাংলায় রাখার চেষ্টা করব।’
ড. অমিত চাকমা বলেন, ‘জ্ঞান একটি মোমবাতির আলোর মতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই জ্ঞানের মোমবাতির সমতুল্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমন্ডলী যুগ যুগ ধরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন।’
নিজের সফলতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের মতো মেধাবী ছিলাম না। তবে মনোযোগ সহকারে পড়াশোনা করেছি। সবাই পড়াশুনা করে, কিন্তু কর্মজীবনে একইভাবে সফল হয়নি। সফল হতে হলে তিন ধরনের বৈশিষ্ট্য দরকার। যোগ্যতা, কর্মনিষ্ঠা এবং চরিত্র। প্রথম দুটি যোগ্যতা কম বেশি সবার থাকবে, কিন্তু চরিত্রই ব্যক্তি হিসেবে অনেক ব্যবধান তৈরি করে।’
সমাবর্তনে ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা মেধাবী বলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি দিয়েছে। এই মেধাকে ভালো কাজে লাগাতে হবে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বেও আপনাদের চাহিদা রয়েছে। এই মেধা দিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমাধান খুঁজতে হবে। জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কেউ কখনো দুনীতিকে প্রশ্রয় দেবেন না, সাধারণ মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘন করবেন না। নীতিভিত্তিক নেতৃত্ব প্রদান করলে দেশের ভবিষ্যৎ অবশ্যই উজ্জ্বল হবে। আপনারাই বাংলাদেশের আশা ও জাতির ভবিষ্যৎ। আপনাদের মেধা ও চরিত্রের মাধ্যমে মানবজাতির জন্য মঙ্গল বয়ে নিয়ে আসবে।’
তিনি গ্র্যাজুয়েটদের সাফল্যের পেছনে ভূমিকার জন্য তাদের মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার আহবান জানান।
ড. অমিত চাকমা বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি লাভ করতে আপনাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। যদিও আমাকে পরিশ্রম ছাড়াই সম্মানসূচক ডিগ্রি দেওয়ার মাধ্যমে আপনাদের সহপাঠী করে নেওয়ায় আমি গর্বিত।
আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয়নি, কিন্তু আমার কাছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার পারিবারিক ও একাডেমিক সম্পর্ক রয়েছে। রয়েছে আবেগের সম্পর্ক। এটি আমার জন্মভূমির শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান। আমি অনুষ্ঠানে আসতে পেরে আবেগাপ্লুত।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম সমাবর্তন বক্তা ও কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি অব অন্টারিও’র প্রেসিডেন্ট প্রফেসর অমিত চাকমাকে ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি প্রদান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।
শনিবার যাকে এই সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত করা হলো, কাপ্তাই বাঁধের কারণে ঘরহারা হয়েছিল সেই অমিত চাকমার পরিবার।
তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের আমলে ১৯৫৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ণে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ কার্য শুরু হয় ও ১৯৬২ সালে এর নির্মাণ সমাপ্ত হয়। পানি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে কৃত্রিমভাবে বাঁধ নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহনের ফলে কাপ্তাই এলাকার স্থায়ী অধিবাসীরা তাদের বাড়ী-ঘর এবং চাষাবাদযোগ্য জমি হারিয়েছেন। এর মধ্যে অমিত চাকমার পরিবারও ছিল। তখন চল্লিশ হাজারেরও অধিক চাকমা আদিবাসী সম্প্রদায় প্রতিবেশী দেশ ভারতে স্থানান্তরিত হয়েছেন।
অমিত চাকমা বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করার পর আলজেরীয় সরকারের বৃত্তি নিয়ে ‘রাসায়নিক প্রকৌশল’ বিভাগে আলজেরিয়ার বিখ্যাত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। ১৯৭৭ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
এরপর কানাডায় চলে যান মাস্টার্স ও পিএইচডি অধ্যয়নের জন্য। কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলাম্বিয়া থেকে রাসায়নিক প্রকৌশল বিষয়ে এমএএসসি এবং পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৮৮ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালগারির রাসায়নিক প্রকৌশল বিভাগে অধ্যাপনা করার পর ১৯৯৬ সালেই ইউনিভার্সিটি অফ রেগিনা-তে চলে যান। সেখানে রাসায়নিক প্রকৌশল বিভাগের প্রধান নিযুক্ত হন। ১৯৯৯ থেকে ২০০১ পর্যন্ত রেগিনার ভাইস-প্রেসিডেন্ট রিসার্চ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এখানে থাকার সময়ই অমিতকে কানাডার ‘টপ ৪০ আন্ডার ৪০’ তে স্থান করে নেন।
এরপর ২০০১ সালে ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াটারলু-র অ্যাকাডেমিক ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং প্রভোস্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০০৯ সালের ১লা জুলাই অমিত চাকমা ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন ওন্টারিওর প্রেসিডেন্ট ও উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে অমিতের লক্ষ্য ওয়েস্টার্ন ওন্টারিওকে বিশ্বের শীর্ষ ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের সারিতে পৌঁছে দেয়া।






