শহিদ রাসেল:
রাজনীতি ছাড়া জীবন পূর্ণতা পায় না। হোক তা সমাজের উচ্চপদস্থ বা নিম্নবিত্তের কিংবা খেটে খাওয়া শ্রমিকজীবন। প্রত্যেকের জীবনেই রাজনীতির প্রভাব কম-বেশি থাকেই। তাই নিজেকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার প্রচেষ্টা অনেকটাই অর্থহীন হয়ে পড়ে। আমরা সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক অংশবিশেষে ভূমিকা পালন করি। আমাদের দেশের জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ‘রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট’ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ। তাই রাজনীতির মাঠ সকল জনগণের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত রাখতে হবে। আর রাজনৈতিক মাঠে পক্ষ/বিপক্ষ দলগুলোর সক্রিয়তা ও সত্য-ন্যায়ের পথে আপসহীন মনোভাব নিয়ে রাজপথে স্লোগানমূখর থাকার বিকল্প নেই। কিন্তু যখনই একদলীয় বা নীতিহীন বহুদলের নিয়ন্ত্রণ রাজনীতির মাঠকে দখল করে রাখে তখনই ঘটে বিচ্ছিন্ন সব ঘটনাপ্রবাহ। আর এসব ঘটনার নির্মম মূল্য দিতে হয় দেশের সাধারণ মানুষকে।
বর্তমান রাজনীতিতে চরম মাত্রায় নীতিহীনতার ছায়া বিরাজমান। ছাত্রসংগঠনের নামে অছাত্র ও সন্ত্রাসীদের এসব মনগড়া সংগঠন ও সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তরা বিভিন্ন নেতাদের নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হয়।
আর শিকড়হীন এসব ভাড়াটে ও তথাকথিত পেটিনেতারা টাকা ও লোভনীয় প্রস্তাবে যে কোনো বিধ্বস্ত ও মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডে অংশ নেয় আর চলমান জীবনকে অস্থির করে তুলে। তাদেরকে মগজধোলাই করে সহজেই বিপথে ঠেলে দিয়ে ফায়দা হাসিলে ব্যস্ত থাকে জ্ঞানপাপী রূপ হায়েনার দল। আর এভাবেই জঙ্গিবাদদের মতো বিশ্ব সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সুযোগ নিতে উৎপেতে থাকে। তাই কেবল দলভারি করা কিংবা তদবির-তোষামুদে কর্মী দিয়ে রাজনৈতিক দল নয়, আদর্শের সংগ্রাম ও উদ্যোমী ছাত্রদের নিয়েই রাজনীতি চর্চা করতে হবে। রাজনীতিকে সংখ্যাগরিষ্টের তথা গণতান্ত্রিক পন্থায় এগিয়ে নিতে হবে।
রাজনৈতিক ধারাপাতের দীর্ঘ পথে যেসব রাজনৈতিক কর্মী বৃন্দ সাম্যের জন্য, অধিকার আদায়ের শপথে নিরন্তর ছুটে যায় তাদের মধ্য থেকেই উঠে আসে পরিচ্ছন্ন ও ব্যক্তিত্ববান রাজনৈতিক নেতা। আর এই ধরনের নেতার হাত ধরেই মানুষ ফিরে পায় তাদের কাঙ্খিত স্বাধীনতা ও বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় অধিকারসমূহ। আদর্শের ধারক-বাহক হিসেবে একজন রাজনৈতিক নেতার মতো পুজোনীয় ব্যক্তি সমাজে বিরল। তাদের হৃদয় হয় আকাশ-সমান। আর তাদের দূরদৃষ্টিতে জাতি দেখতে পায় নির্মল ভবিষ্যত। অথচ বর্তমান পারিপার্শ্বিক ধারায় রাজনীতির মাঠে সবাই নেতা হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। কর্মী পাওয়াটা হয়ে যায় দুস্কর। আর এমন অবস্থায় কেউ কাউকে মানতে নারাজ হয়। দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ও মৈত্রের অভাব দেখা দেয়।
যুব সমাজ রাজনীতিতে পরিচ্ছন্নতা ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা চর্চা দেখতে পেলে তারা কখনো বিপথগামী হতো না। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, টাকার বিনিময়ে নেতা হওয়ার ঘৃণ্য দৃষ্টান্তগুলো তরুণ সমাজকে ভুল বার্তা দিচ্ছে। টাকার বিনিময়ে চাকরি পাওয়ার রীতি সমাজে অনেক আগে থেকেই প্রচলিত, কিন্তু ঘুষ-তোষামুদে নেতা হওয়া তথা লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে রাজনীতি পদ-পদবী সহজলভ্য হওয়ার মতো লজ্জাকর ব্যাপারগুলো সত্যিই করুণার।
এমন পরিবেশে গণতন্ত্রের চর্চা, রাজনীতির চাষাবাদ ও ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও সাম্যতা দারুণভাবে প্রভাবিত হয়। এছাড়া নেতার মুখের কথা এখন আর বক্তৃতার মতো শুনায় না। মনে হয় যেনো মুখস্থ করা বা অনুকরণ করা বুলি আউড়াচ্ছে। দেশ ভাগ, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, শিক্ষা কমিশন গঠন, গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ’সহ শোকাহত ১৫ আগস্ট সম্পর্কে সঠিক ধারণা না নিয়ে, ন্যুনতম মৌলিক জ্ঞান অর্জন ব্যতিত যেসব ছাত্রনেতা(!) রাজনৈতিক সভা-সেমিনারে বক্তব্য রাখেন, তাদেরকে উচিত বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষার হার ও বৈশ্বিক যোগাযোগ মাধ্যম সম্পর্কে সজাগ হওয়া, দর্শক সারিতে যারা থাকেন কিংবা টেলিভিশন-বেতারের শ্রোতাবৃন্দ আগের মতো মূর্খতার যুগে বাস করে না, তারা বরং মুখ টিপে হাসে, অনেকে গণমাধ্যম’সহ ফেসবুকে বিস্তারিত ঘটনাটি রসাত্মক আঙ্গিকে প্রকাশ করে।
জঙ্গিবাদের সাম্প্রতিক আগ্রাসন আমাদেরকে দারুণভাবে নাড়া দিচ্ছে, আমাদের নাকের ডগায় ঘাপটি মেরে থাকা এসব জঙ্গিগোষ্ঠীর নির্মূলে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। স্বার্থান্বেষী মহলকে চিহ্নিত করতে হবে।
বিশেষ করে, ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি বিশেষ অনুরোধ সর্বক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ও দক্ষ জনবলের ‘মনিটরিং সেল’ নিশ্চিত করতে হবে। বিরোধীদলের প্রতি অন্যায্য তথা সহিংস আচরণ বন্ধ করতে হবে। রাজনীতি চর্চার ক্ষেত্রটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে দলীয়করণ, কোটাপদ্ধতি, ঘুষবাণিজ্য ও লৌকিকতা (কেবল আনুষ্ঠানিকতার জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা) পরিহার করতে হবে। জনগণকে সাথে নিয়েই, জনগণের জন্যই গণতান্ত্রিক আন্দোলন অব্যাহত রাখা ও সবার অংশগ্রহণে বিশ্বের বুকে সুনামের সাথে এগিয়ে চলার পথ সুগম করতে হবে।
প্রয়োজনে জীবনে চলার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়ে একটি সাম্য ও সম্প্রীতির দেশ গঠন করতে আসুন হাতে হাত রেখে দীপ্ত শপথ নিই, দেশকে ভালোবাসি আর জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসকে ‘না’ বলি।
সূর্যের আলো যেমন সবার অধিকার, তেমনি বেঁচে থাকার অমৃত স্বাদ সকলের তরে নিশ্চিত করি। মনে রাখতে হবে, মৃত্যু অনিবার্য আর জীবনপ্রবাহকে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী’ করার মতো মানুষ সমাজের অলংকার।






