সুনীল বড়ুয়া:
মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে কক্সবাজারের রামু উপজেলায় আবার বন্যা দেখা দিয়েছে। কয়েকদিনের টানা বর্ষন এবং পাহাড়ী ঢলে উপজেলার অন্তত ১১টি ইউনিয়নের দুইলাখ মানুষ আবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে ভারী বর্ষনের কারণে পাহাড় ধসে উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের চেইন্দা হাইম্যার ঘোনা এলাকায় পাহাড় ধ্বসে দুই ভাই বোনের মৃত্যু হয়েছে।
সোমবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকেকে এঘটনা ঘটে। এরা হলো মো. রায়হান (৫) ও সায়মা আকতার (৩)। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন নিহত শিশুদের বাবা জিয়াউর রহমান (৩৮) ও মা আনারকলী (৩০)।
পাহাড় ধ্বসে জিয়াউর রহমানের বসতঘরসহ একই ইউনিয়নের চান্দের পাড়া এলাকার মৃত নুরুল আলমের ছেলে মো. শাহ ও মৃত শফিকুর রহমানের ছেলে আহমদের বসতঘর মাটি চাপা পড়েছে।
স্থানীয় দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. ইউনুস ভুট্টো বলেন, রাত দেড়টার দিকে বিকট শব্দে সৌদি প্রবাসী জিয়াউর রহমানের টিনশেড বাড়িতে পাহাড় ধসে পড়ে। এ সময় জিয়াউর রহমানের পরিবার ঘুমিয়ে ছিল। পরে দমকল বাহিনী ও স্থানীয় লোকজন মাটি সরিয়ে দুই শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করেন। তাদের মা-বাবাকে কক্সবাজারের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শাজাহান আলী ও জেলা প্রশাসনের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) তাহমিনুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এবং মাটিচাপাতেই জিয়াউর রহমানের দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানান।
কক্সবাজার দমকল বাহিনীর সহকারী উপপরিচালক আবদুল মালেক বলেন, পাহাড়ধসের খবর পেয়ে তাঁরা গভীর রাতে চেইন্দা এলাকায় পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা চালান। এ সময় মাটি সরিয়ে দুই শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টানা তিন দিনের বর্ষন এবং পাহাড়ী ঢলের কারণে উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের ফকিরা বাজার, হাইটুপি, পশ্চিম মেরংলোয়া, পূর্বমেরংলোয়া, শ্রীকুল, অফিসেরচর, মন্ডলপাড়া, সিকদারপাড়া, লামারপাড়া, খোন্দকারপাড়া, লম্বরীপাড়া, উত্তর ফতেখাঁরকুল, চালন্যাপাড়া, দোয়ানাপাড়া, পূর্বদ্বীপ শ্রীকুল, পূর্বদ্বীপ ফতেখাঁরকুল, তেমুহনী, হাজারীকুল, রাজারকুল ইউনিয়নের সিকদারপাড়া, হালদারকুল, পালপাড়া, মৌলবীপাড়া, নয়াপাড়া, পূর্ব রাজারকুল, দরগামুরা, দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের উমখালী, চরপাড়া, চেইন্দা, চাইল্যাতলী, পানেরছড়া, কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের মনিরঝিল, পূর্ব মনিরঝিল, লামার পাড়া, চরপাড়া, পূর্বপাড়া, জারুল্যাছড়ি, কাউয়ারখোপ ফরেষ্ট অফিস, বৈলতলী, জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের উত্তর মিঠাছড়ি, নন্দাখালী, নোনাছড়ি, আশকরখিল, পূর্বপাড়া, মালাপাড়া, রশিদনগর ইউনিয়নের উল্টাখালী, চাকমারকুল ইউনিয়নের মোহাম্মদপুরা, মিন্ত্রীপাড়া, শ্রীমুরা ও শাহমদ পাড়া, গর্জনীয়া ইউনিয়নের ক্যাজরবিল, বোমাংখিল, জুমছড়ি, কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের তিতারপাড়া, চাকমারকাটা, ফাক্রিকাটা, মুরারকাছা, শোকমনিয়া, দোছড়ি, জামছড়ি ও গর্জনয়িা বাজারসহ উপজেলার শতাধিক গ্রাম আবার প্লাবিত হয়েছে।
এতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে এসব এলাকার অন্তত দুইলাখ মানুষ। বাঁকখালী নদীর বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান,বাঁকখালী,সোনাইছড়ি,গর্জইখালসহ কয়েকটি নদনদীতে পানি আবারো বিপদ সীমার উপরদিয়ে প্রবাহিত এবং বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি প্রবেশ করছে। নতুন করে ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে বহু রাস্তাঘাট ও গ্রামরক্ষা বাঁধ। বন্যা প্লাবিত হয়ে ঈদগড়, গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, রাজারকুল, দক্ষিন মিঠাছড়ি, খুনিয়াপালং, ও কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের সাথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে উপজেলা সদরের সাথে। পাহাড় ধ্বসের আশংকায় আতংকিত হয়ে পড়েছে ওইসব ইউনিয়নে বাসিন্দারা। প্লাবিত অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়,বন্যায় মঙ্গলবার সকালে ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের হাইটুপি ভুত পাড়া এলাকার রামু ফকিরা বাজার-জাদিমুরা সড়ক বাঁকখালী নদীতে, ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কের ব্যাপক এলাকা ঈদগাঁও খালে বিলীন হয়ে গেছে।
এছাড়া রামু-মরিচ্যা সড়ক, রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়ক, কচ্ছপিয়া-গর্জনিয়া সড়ক, লামারপাড়া-তেচ্ছিপুল সড়ক, রশিদনগর-ধলিরছড়া সড়ক বাঁকখালী নদী ও সোনাইছড়ি খালের বন্যায় প্লাবিত হয়ে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এছাড়া কচ্ছপিয়া-গর্জনিয়ার বাকখাঁলী সেতুর সংযোগ সড়ক বিলীন হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে।
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে গর্জনিয়ার গর্জই খাল, খুনিয়াপালং এর রেজু খাল, রশিদনগর ইউনিয়নের কালিরছড়া খালের পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আতংকিত হয়ে পড়েছে নদী তীরবর্তী ও বানভাসী মানুষরা।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম আমাদের রামু ডটকমকে জানান, উপজেলার এগার ইউনিয়নই প্লাবিত হয়েছে। প্রবল বর্ষণ ও পাহাড় ধ্বসে দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নে দু’শিশু মারা গেছে। তিনি বলেন, উপজেলা পরিষদের সকল জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তার বন্যা কবলিত মানুষের পাশে রয়েছেন। বানভাসী মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে প্লাবিত অঞ্চলের মানুষ ও গবাদি পশুকে।









