সুনীল বড়য়া:
‘ছোট ছোট অন্যায় থেকে জন্ম নেয় ক্ষোভ। আর এ ক্ষোভ থেকে জন্ম হয় প্রতিশোধ স্পৃহার। এরই বাস্তব প্রতিফলন হয়েছে ‘কোর্ট মার্শাল’নাটকে।
মূলত মুক্তিযুদ্ধের নিধন এবং মূল্যবোধের সব অর্জনকে ধ্বংস করার পরিকল্পিত চক্রান্ত এ নাটকে উপস্থাপিত হয়েছে। সত্য-মিথ্যার দ্বন্ধ থেকেই সত্যের স্ফুলিঙ্গ নির্মান করেছে সভ্যতা। সেই অবিনাশী সত্য এত লঘু নয়,যা সহজেই চোখ দিয়ে দেখে বোঝা যায়। বাইরের চোখে দেখা সত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে মিথ্যার গুটিপোকা। এই সত্য কখনো হয়ে ওঠে মানুষের প্রাণের চেয়েও মূল্যবান বস্তু এমনকি আত্মার মুক্তির জন্যও অনির্বায প্রয়োজন’।
কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র মিলনায়তনে জেলার অন্যতম নাট্য সংগঠন কক্সবাজার থিয়েটার আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী নাট্যেৎসবের শেষ দিনের ‘কোর্ট মার্শাল’ নাটকটির মূল উপজীব্যকে এভাবেই ফুটিয়ে তোলেন আয়োজকেরা। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে এস এম সোলায়মানের রচনায় এ নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন বিশিষ্ট নাট্যজন অলক ঘোষ। উৎসবের শেষ দিনে হল ভর্তি দর্শক আর দর্শকদের পিনপতন নিরবতা জানান দিয়েছে কতটা জনপ্রিয়তা পেয়েছে নাটকটি।
সংগঠনটির ৩৩ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ‘যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে,মুক্ত করো হে বন্ধ’ শিরোনামে কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র মিলনায়তনে আয়োজিত সাতদিনের উৎসবে ঢাকা নাট্যতীর্থের দ্বীপ, শব্দ নাট্যচর্চ্চা কেন্দ্রের ‘রাইফেল’ ও ‘বীরাঙ্গনার বয়ান’ মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়ের ‘নীলাখ্যান’ ও ‘শিবানী সুন্দরী’,কক্সবাজার থিয়েটারের ‘টুইডিয়টস’,চট্টগ্রাম অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়ের ‘দুতিয়ার চাঁন’ নাটকের সফল মঞ্চায়ন করা হয়। সপ্তাহব্যাপী এ উৎসব উৎসর্গ করা হয় প্রয়াত নাট্যকর্মী বদরুল আলম লিটনের নামে।
সমাপনী দিনে অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম মজুমদার,অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আব্দুর রহমান। ২০ জুলাই উৎসবের উদ্বোধন করেন দেশের নাট্যতাত্ত্বিক গবেষক ও জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য্য অধ্যাপক ড. আফসার আহম্মদ। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তাপস রক্ষিতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ গ্রুফ থিয়েটার ফেডারেশনের সেক্রেটারী জেনারেল আকতারুজ্জামান,কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক পিন্টু আরেং,কামরুন নূর চৌধুরী,কক্সবাজার সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি সত্যপ্রিয় চৌধুরী দোলন,সহ অন্যান্যরা বক্তব্য দেন। এবারের উৎসবে কক্সবাজারের নাট্যাঙ্গনের সাত অগ্রজ নাট্যজন শব্দায়ন জসীম উদ্দিন বকুল,খোরশেদ আলম, পরিতোষ চৌধুরী,নজরুল ইসলাম বকসী,সাহানা রেজা, আক্তার শাহনেওয়াজ করিম (শাহীন) ও আবুল কালাম আজাদকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়।
উৎসব প্রসঙ্গে বিশিষ্ট কবি ও সাংবাদিক বিশ্বজিৎ সেন বাঞ্চু বলেন, প্রায় প্রতিদিনই নাটক দেখেছি,সবকটি নাটকের সফল মঞ্চায়ন হয়েছে। বৃষ্টি-বাদল উপেক্ষা করে দর্শক নাটক দেখতে এসেছে। এক কথায় বলা যায়,সফল নাট্যোৎসব। বিশেষ করে অগ্রজ সাত নাট্যজনকে যে সম্মাননা দেওয়া হলো,এটি অবশ্যই কক্সবাজার থিয়েটারের প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
নাট্যজন জসীম উদ্দিন বকুল বলেন, ১৯৭১ সালে আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হলাম, দেশ স্বাধীন হলো এর পর পর একযোগে শুরু হলো ,নাট্যচর্চ্চা,সংস্কৃতি চর্চ্চা,সাহিত্য চর্চ্চা,শিল্পকলা চর্চ্চা একটা বিশাল আন্দোলনে পরিণত হলো যেনো। এটি হলো সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এটি ক্রমাগত চলতে চলতে আজ এই পর্যন্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয়,আকাশ সংস্কৃতির কারণে বা করপোরেট সংস্কৃতির কারণে আজ দেখা যাচ্ছে একটা আকাল তৈরী হয়েছে সংস্কৃতি চর্চ্চায়। এমন পরিস্থিতিতে এ ধরনের উৎসব আয়োজন আমাদের আশার আলো দেখায়। সামনের দিকে এগিয়ে যেতে দিক নির্দেশনা দেয়। বলা যায়,কক্সবাজার সংস্কৃতি চর্চ্চাকে অনেক বেগবান করবে এ উৎসব। পাশাপাশি অন্যান্য দলগুলোও যদি এভাবে এগিয়ে আসে,তবেই আমরা ৭১ এর চেতনাকে ধারন করে সংস্কৃতি চর্চ্চার মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নিতে পারবো।
কক্সবাজার থিয়েটারের প্রাণ,নাট্য নির্দেশক স্বপন ভট্টাচার্য্য বলেন, মূলত এ ধরনের উৎসবরে মধ্যদিয়ে সারা দেশের নাট্য ও সংস্কৃতিকর্মীদের মাঝে মেলবন্ধনের সুযোগ তৈরী হয়। ঝিমিেিয় পড়া সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রাণের সঞ্চার হয়। সংস্কৃতিকর্মীদের মাঝে একটা জেগে ওঠার তাগিদ তৈরী হয়। এছাড়াও উৎসবে ভিন্নধারার ভিন্ন ভিন্ন নাটক মঞ্চায়নের কারণে দর্শকেরাও সারা দেশের নাট্য ”র্চ্চার চালচিত্র সম্পর্কে সম্যক ধারনা লাভ করে। দেশকে এগিয়ে নিতে,সমাজকে এগিয়ে নিতে এর ইতিবাচক একটা প্রভাব তো আছেই। আমরা আশাবাদি অন্ধকার দূর হলে একদিন আলো আসবেই।
কক্সবাজার থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তাপস রক্ষিত বলেন, কক্সবাজার থিয়েটার বিশ্বাস করে,শিল্পের জন্য শিল্প নয়,মানুষের জন্য শিল্প,জীবনের জন্য শিল্প। নাটকের মাধ্যমেই এই সমাজ থেকে জঙ্গীবাদ দূর হবে,সাম্প্রদায়িকতা দূর হবে। তাতেই করে এগিয়ে যাবে দেশ এগিয়ে যাবে সমাজ। আগামীতে এ উৎসব আরো বড় পরিসরে করার ভাবনার কথাও জানান তিনি।







