নতুন পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান পুলিশ ভেরিফিকেশন পদ্ধতির কারণে সেবাগ্রহিতাদের হয়রানি ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা ওই ব্যবস্থা বাতিলের সুপারিশ করেছে দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ (টিআইবি)।
টিআইবি বলছে, নতুন পাসপোর্টের আবেদনকারীদের তিন চতুর্থাংশকেই পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় অনিয়ম ও হয়ারনির শিকার হয়ে ‘ঘুষ বা নিয়ম বহির্ভূত টাকা’ দিতে হয়।
সোমবার ধানমণ্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত ‘পাসপোর্ট সেবায় সুশাসন: চ্যালেঞ্জ ও করনীয়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জমান বলেন, “গবেষণা প্রতিবেদনে আমরা দেখিয়েছি, পুলিশ ভেরিফিকেশনে হয়রানি হচ্ছে; এটার কোনো দরকারই নেই।”
এর বদলে সকল নাগরিকের জন্য ‘বায়োমেট্রিক ডাটা ব্যাংক’ এবং ‘অপরাধী তথ্য ভাণ্ডার’ তৈরি করে তার সঙ্গে পাসপোর্ট অফিস ও ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের সংযোগ স্থাপন করার সুপারিশ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন টিআইবির রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহনূর রহমান।
তিনি বলেন, পাসপোর্ট করাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হতে হয় পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি), তাদের ছাড়পত্রের (ভেরিফিকেশন) জন্য।
টিআইবির জরিপে অংশগ্রহণকরীরা বলেছেন, পুলিশের ওই দপ্তর ‘অযথা’ আবেদনপত্রে ত্রুটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। জঙ্গি কার্যক্রম বা অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহের কথা বলে ভয় দেখায়। বাড়িতে না গিয়ে চায়ের দোকান বা থানায় ডেকে পাঠায়। ঘুষ দাবি করে এবং ক্ষেত্রবিশেষে তা বিকাশের মাধ্যমে পাঠাতে বলে।
# দেশের ৬৭টি পাসপোর্ট অফিসের মধ্যে বিভাগ অনুপাতে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ২৬টি পাসপোর্ট অফিস নির্বাচন করে প্রতি অফিসে পাঁচ কর্মদিবস করে জরিপ চালিয়েছে টিআইবি।
# দৈবচয়ন ভিত্তিতে নির্বাচিত মোট এক হাজার ৪৫৩ জন সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে নির্ধারিত প্রশ্নের ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এ গবেষণার কাজে।
# এ গবেষণা চলেছে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছর মে মাস পর্যন্ত।
>> জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ পাসপোর্ট সংশ্লিষ্ট কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার হওয়ার কথা বলেছেন।
>> এর মধ্যে ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশ ঘুষ বা নিয়ম বহির্ভূত অর্থ দিতে বাধ্য হওয়ার কথা জানিয়েছেন। আর ২৭ শতাংশ শতাংশ উত্তারদাতা অযথা সময়ক্ষেপণের শিকার হওয়ার এবং ২ দশমিক ২ শতাংশ পাসপোর্টগ্রহীতা সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালনে অবহেলার কথা বলেছেন।
>> জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি ও অনিয়ম হয় পুলিশ ভেরিফিকশনের ক্ষেত্রে। ৭৬ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা এ কাজের জন্য অনিয়ম ও হয়ারনির শিকার হওয়ার কথা বলেছেন।
>> ৭৫ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তাদের গড়ে ৭৯৭ টাকা ঘুষ বা নিয়ম বহির্ভূত টাকা পুলিশকে দিতে হয়েছে ভেরিফিকেশনের জন্য।
>> তবে টিআইবির তথ্য অনুযায়ী পারপোর্ট অফিসে দুর্নীতি আগের তুলনায় কমেছে। ২০১৫ সালে টিআইবির জাতীয় খানা জরিপে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা পাসপোর্ট করাতে গিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার হওয়ার কথা বলেছিলেন। ঘুষ বা নিয়ম বহির্ভূত অর্থ দেওয়ার কথা বলেছিলেন ৭৬ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা।
টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকে এই ভেরিফিকেশনের বিষয়টি চলে আসছে। আগে কোনো কিছু করতে হলেই বলা হত- পুলিশের কাছে থেকে ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট লাগবে। সেখানে লেখা থাকত- ‘ওই ব্যক্তি কোনো রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িত নয়’। এখন এই গণতান্ত্রিক সময়েও জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের যে অবিশ্বাস সেটা রয়ে গেছে।”
তিনি বলেন, “জনগণের প্রতিনিধি বলে যারা নিজেদের দাবি করেন, তারা জনগণকে বিশ্বাস করেন না। অপরাধী কে সেটা পুলিশ জানে। যখন ধরা পড়ে তখন দেখা যায় সে দশ বছর ধরে অপরাধী। তার মানে পুলিশ জানত, কিন্তু দেখত না। যখনই সাধারণ মানুষের বিষয় আসে, তখন দেখা যায় পুলিশ খুব তৎপর।”
সূত্র: বিডিনিউজ।






