সুনীল বড়ুয়া:
কক্সবাজারের রামুর বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলার পাঁচ বছর আজ। ঘটনার পরে এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে যে আস্থার সংকট তৈরী হয়েছিল তা অনেকটা কেটে গেছে। তবে আইনী কার্যক্রম নিয়ে এখনো অসন্তোষ আছে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ে।
বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় যেসব মামলাগুলো হয়েছে,এ বিষয়ে কিছুই জানেনা বৌদ্ধ সম্প্রদায়। কাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, কাকে বাদ দেওয়া হয়েছে- পুরো বিষয়টি নিয়ে তারা অন্ধকারে রয়েছেন। যে কারণে এসব মামলায় স্বাক্ষ্য দিতেও অনীহা তাদের।
প্রসঙ্গত: উত্তম বড়ুয়া নামের এক বৌদ্ধ যুবকের ফেসবুকে পবিত্র কোরান শরীফ অবমাননার অভিযোগ এনে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে রামুর ১২টি বৌদ্ধ বিহার, ২৬টি বসতঘরে অগ্নিসংযোগ ও হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এ সময় আরো ছয়টি বৌদ্ধ বিহার এবং শতাধিক বসতঘরে হামলা,লুটপাট ও ভাঙচুর চালানো হয়। পরদিন (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উখিয়ায় আরো চারটি বৌদ্ধ বিহারে হামলা চালানো হয়েছে।

জেলা পুলিশ সুত্রে জানা গেছে,রামু উখিয়া ও টেকনাফে সহিংসতার ঘটনায় ১৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রামু থানায় ৮টি, উখিয়ায় ৭টি, টেকনাফে দুইটি ও কক্সবাজার সদর থানায় দুইটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে ১৫ হাজার ১৮২ জনকে। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত আসামী করা হয় ৩৭৫ জন। পরবর্তীতে এসব মামলায় ৯৪৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। এর মধ্যে রামুর ৮টি মামলায় ৪৫৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয় ।
সংশ্লিষ্টদের কাছেও মামলার সঠিক তথ্য নেই
কক্সবাজার কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক কাজী মো.দিদারুল আলম জানান, ১৯টি মামলার মধ্যে জনৈক সুধাংশু বড়–য়ার দায়ের করা মামলাটি আপোষ-মিমাংসামূলে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বাকি মামলার মধ্যে দুটি মামলা অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশন পিবিআইকে দেওয়া হয়েছে। বাকি ১৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
তবে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশন (পিবিআই) কক্সবাজার এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান বলেছেন,এপর্যন্ত চারটি মামলা অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআই-এর কাছে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মামলার তদন্তকাজ শেষ করে অভিযোগ পত্রও পুনরায় আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। আইনী জটিলতার কারণে একটি মামলার অভিযোগপত্র এখনো জমা দেওয়া যায়নি।

অন্যদিকে কক্সবাজার জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মমতাজ উদ্দিন জানান, মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রম অনেকটা শেষ পর্যায়ে। তবে এসব মামলার স্বাক্ষী পাওয়া যাচ্ছেনা। স্বাক্ষী যারা তারা বেশিরভাগই বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের। তারা ভয়ে কেউ স্বাক্ষ্য দিতে রাজি হচ্ছেননা। একটি মামলায় ১২ কি ১৩ জন আদালতে স্বাক্ষ্য দিলেও এদের মধ্যে ৯জন স্বাক্ষীকে বৈরী ঘোষনা করেছেন আদালত। তিনি জানান, তিনটি মামলা পিবিআই-এর কাছে তদন্তাধীন রয়েছে। পিবিআই তিনটির অভিযোগপত্র জমা দিলেও এ বিষয়ে তার কাছে তথ্ যনেই বলে জানান তিনি।
রামু উপজেলা কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ ঐক্য ও কল্যাণ পরিষদ ও রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের সাধারণ সম্পাদক তরুন বড়ুয়া বলেন, ১৯টি মামলার বাদি পুলিশ। পুলিশ ইচ্ছেমত আসামি করেছে। ইচ্ছেমত বাদ দিয়েছে। ফলে আইনগত পুরো বিষয়টি নিয়ে অন্ধকারে আছে বৌদ্ধ সম্প্রদায়। এ অবস্থায় বর্তমানে ভয়ে স্বাক্ষীরাও স্বাক্ষ্য দিতে রাজি হচ্ছেন না।
তিনি বলেন,ঘটনার পর থেকে সরকার এবং সেনাবাহিনীর কাছ থেকে অনেক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। নতুন নতুন বৌদ্ধ বিহার ও বাড়ি ঘর নির্মানসহ পুণর্বাসনের বিষয় নিয়ে সরকারের প্রতি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। বর্তমানেও সরকারের পক্ষ থেকে নানা সহযোগিতা অব্যাহত আছে।
রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের সহকারী পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, এই চার বছরে আমরা ভাঙ্গা-গড়া,উত্থান পতন অনেক কিছুর মুখোমুখি হয়েছি। এ ঘটনায় রামুর হাজার বছরের গর্বের ধন ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে’ যে আস্থার সংকট তৈরী হয়েছিল পাঁচ বছরে তা অনেকটা কেটে ওঠেছে। তবে এ অবস্থায় সুষ্ঠু বিচারের পাশাপাশি সম্প্রীতির জায়গাটাকে আরো বেশি সমৃদ্ধ করতে হবে। সেটি হতে পারে সামাজিক ভাবে, রাষ্ট্রীয় ভাবে বা আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।
বিচার বিভাগীয় তদন্তের শুনানীর কোনো অগ্রগতি নেই
ঘটনার পর পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের তদন্ত কমিটি এবং চট্রগ্রামের দায়রা জজ আবদুল কুদ্দুস মিয়ার নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের প্রতিবেদনে ২০৫ জন অভিযুক্ত করে একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়। বিচার বিভাগীয় তদন্তেও ২৯৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয় প্রায় চার বছর আগে। কিন্তু চার বছর আগে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হলেও মূল মামলার চুড়ান্ত শুনানীর কোনো অগ্রগতি নেই।
রামু সহিংসতা স্মরণে সংঘদানও ধর্মসভা
এদিকে বিভীষিকাময় রামু সহিংসতার চার বছর অতিক্রান্তে রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদ শ্রীকুল লাল চিং-মৈত্রী কমপ্লেক্স চত্ত্বরে দিনব্যাপী কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে সকাল ৮টায় জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ১০টায় সংঘদান ও অষ্ট উপকরণ দানসভা, বেলা বারটায় অতিথি ভোজন, বিকাল পাঁচটায় দেশ ও বিশ্বশান্তি কামনায় হাজার প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও সমবেত প্রার্থনা।
স্মরণানুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার প্রাক্তন সভাপতি ও রামু সীমা বিহারের অধ্যক্ষ, উপসংঘরাজ পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের।








