সুনীল বড়ুয়া,ঘুমধুম সীমান্ত থেকে ফিরে:
মিয়ানমারের অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশকে কেন্দ্র করে বান্দরবানের নাইক্ষংছড়ির ঘুমধুমের তুমব্রু সীমান্তে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিপি ও সেনাদের হুমকী-ধমকী এখনো অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন নো-ম্যান’স ল্যান্ডে আটকেপড়া রোহিঙ্গা।
ফলে এখানকার প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার রোহিঙ্গার মাঝে আতংক কাটছেনা। রোহিঙ্গারা বলছেন,দিনের বেলা কাটা তারের বেড়ার পাশে আগের তুলনায় কম দেখা যায় ঠিক, কিন্তু পাহাড়ের উপর বাংকার তৈরী করে সেই বাংকারে এবং পাহাড়ের ওপারে অবস্থান নিয়ে থাকে মিয়ানমারের সেনা ও বিজিপি সদস্যরা। রাতে কাটা তারে বেড়ার পাশে এসে রোহিঙ্গাদের বাড়ি-ঘরে ঢিল ছুঁড়ে মারে এবং নো-ম্যান’স ছেড়ে যাওয়ার জন্য নানাভাবে হঙমকী দেন তারা।
অন্যদিকে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে সীমান্ত এলাকায় নো-ম্যান’স ল্যান্ডের পাশ ঘেষে বিস্তৃর্ণ জমিতে ক্ষেত-খামার ও চাষাবাদ করতে না পারায় এলাকায় কৃষি ক্ষেত্রে বিরুপ প্রভাব পড়েছে।
জানা গেছে ,আন্তজার্তিক সীমান্ত আইন লঙ্গন করে বেশ কিছুদিন ধরে বান্দরবানের ঘুমধুম সীমান্তের তুমব্রু নো-ম্যানস ল্যান্ডের আশে পাশে সেনা সমাবেশ ও নানাভাবে মহড়া চালিয়ে দুদেশের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে মিয়ানমার। এমন পরিস্থিতিতে গত ২ মার্চ দুদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় পতাকা বৈঠক। তবে বৈঠকে যদিও সৈন্য সমাবেশের কথা অস্বীকার করে মিয়ানমার। তবে বৈঠকে সীমান্তে অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশের বিষয়টি অস্বীকার করে মিয়ানমার। তারা জানিয়েছে,অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য যতটুকু দরকার ততটুকুই করছে মিয়ানমার।
রোহিঙ্গারা জানায়,গত ৯ ফেব্রুয়ারি আকস্মিক রাখাইন রাজ্য এবং তুমব্রু নো’ম্যান্সল্যান্ড পরিদর্শন করেন মিয়ানমারে উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল অং সো। এসময় তিনি নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথাও বলেন এবং সেখান থেকে তাদের সরে যেতে বলেন। এর পর থেকে সেখানে আতংক সৃষ্টির জন্য মিয়ানমার সেনা ও বিজিপি সদস্যরা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে আসছে।
নাইক্ষ্যংছড়ির ঢ়ুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর আজিজ জানান,দুদেশের মধ্যে পতাকা বৈঠকের পরে তাদের পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত,তাদের আনাগোনো একটু কমেছে,আগের মতো বেশি ঘুরাঘুরি তারা করছেনা। তবে পাহাড়ের উপরে বাংকার করে তারা সেখানে আছে,পাহাড়ের ওপারেও তাদের অবস্থানের কথা আমরা শুনেছি। যে কারণে নো-ম্যান’স ল্যান্ডে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গা এবং সীমান্ত বাসীর মাঝে আতংক দূর হচ্ছেনা। তবে বিজিবিও নিয়মিত টহল চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন,মূলত আমরা যেটা বুঝতে পেরেছি,নো-ম্যান’স ল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সেখান থেকে তাড়ানোর জন্য মিয়ানমার ছলে বলে কৌশলে এসব অপচেষ্ঠা চালাচ্ছে। কারণ এসব রোহিঙ্গাদের কারণে মিয়ানমার খুব চাপে আছে,তাদের টেনশন বেড়ে গেছে। ওখান থেকে তাড়াতে পারলে তাদের মিশন সাকসেস এবং তারা চাপমুক্ত হবে।
জানা গেছে,গত বছরের ২৫ আগস্টের পর থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসা শুরু করে। এ পর্যন্ত সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সেই থেকে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নেয় বান্দরবানের ঘুমধুম সীমান্তের তুমব্রু নো’ম্যানস ল্যান্ডে। সেখান থেকে ভয়ভীতির কারণে প্রায় এক হাজার রোহিঙ্গা অন্যত্র পালিয়ে যায়। সীমান্ত আইন অনুযায়ী নো-ম্যানস লান্ডে সাধারণের চলাচলও নিষিদ্ধ হলেও গত প্রায় পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে এসব রোহিঙ্গারা সেখানেই অস্থায়ী ঘরে বসবাস করছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষনে গত বুধবার সরেজমিনে তুমব্রু নো-ম্যান’স ল্যান্ড এলাকায় যান এ প্রতিবেদক। সেখানে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ভুক্তভোগী অনেক রোহিঙ্গার। রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, গত কয়েকদিনে তুমব্রæ সীমান্তের পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও ভীতি কাটছেনা তাদের।
বৃদ্ধ আলী আহমম্দ নো-ম্যান’স ল্যান্ডে বসবাস করছেন প্রায় পাঁচ মাস। তিনি বলেন, আগের চেয়ে তাদের আনাগোনা একটু কমেছে, এখন কাটা তারের বেড়া পাশে তারা কম আসে কিন্তু জঙ্গলের ওখানে বসে থাকে। রাত হলে গাড়ি নিয়ে দৌড়া দৌড়ি করে,টর্স লাইট মারে,পাথর ছুঁড়ে মারে,ঢিল মারে ঘরের উপর। যে কারণে আমরা খুব ভয়ের মধ্যে আছি।
নুরুল আমিন বলেন,আগে তারা কাটা তারের বেড়ার সাথে পিলারে পিলারে এসে বসে থাকতো। আমাদের ঢিল মারতো,চলে যেতে বলতো। এখন তারা কাটা তারের বেড়ার পাশে নেই কিন্তু তারা একেবারে চলে যায়নি। দূরে গিয়ে পাহাড়ের ওপাশে অবস্থান নিয়েছে।
রোহিঙ্গা নেতা নুর আলম বলেন, সকাল ৮টা-৯টার দিকে একবার আসে,এসময় মিডিয়ার লোকজন দেখলে তারা লুকিয়ে যায়। আবার ২টা-৩টার দিকে আবার বের হয়। একেবারে চলে যায়না,পাহাড়ের উপরে বড় বড় বাংকার করেছে,ওখানে ঢুকে থাকে,পাহাড়ের ওপাশে লুকিয়ে থাকে। রাতে এসে আবার টহল দেয়।
সৈয়দ নুর বললেন,এখন দিনে কম দেখা যায়। রাত হলে ঘেরার কাছে চলে আসে। এসে ঢিল মারে,বন্দুক দিয়ে ভয় দেখায়,যে কারণে আমরা খুব আতংকের মধ্যে আছি।
সীমান্তের শূণ্য রেখায় বসবাসকারি রোহিঙ্গা আনোয়ার মিয়া জানান, সে দেশের উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তুমব্রু সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার পাশে এসে নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ডেকে কথা বলেন। এসময় নো-ম্যানস ল্যান্ডের এই ভূমি মিয়ানমারের দাবি করে সেখান থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশনা দেন। সেখান থেকে চলে না গেলে পরিণতি ভাল হবেনা বলেও তিনি হুশিয়ারী দেন। এর পর থেকে তারা আমাদের আতংকের মধ্যে রেখেছে।
মাঝি খালেদ হোসেন বলেন, মিয়ানমারের অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আমরা এখানে পালিয়ে আসি। কোথাও জায়গা না পেয়ে নিরুপায় হয়ে নো-ম্যানস ল্রান্ডে আশ্রয় নিই কিন্তু এখন এখানেও শান্তি নেই।
তুমব্রু নো-ম্যান’স ল্যান্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রধান মাঝি দিল মোহাম্মদ বলেন, মিয়ানমার চাইছে আরাকান রাজ্যের উত্তর অংশ সম্পূর্ণ রোহিঙ্গা শূণ্য করবে তারা। আমরা যেহেতু এখনো মিয়ানমারের সীমানায় আছি, তাই তারা আমাদের প্রতিদিন ঢিল মারছে,ফাঁকা গুলি বর্ষন করছে, নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। সবকিছু করছে আমরা যাতে এখান থেকে চলে যাই। আমরা চলে গেলে তাদের মাথা ব্যাথা কমে যাবে,তারা শান্তিতে থাকবে। তারা এমনটাই মনে করে।
অন্যদিকে সীমান্তে এমন পরিস্থিতির কারণে ঘুমধুম এলাকার প্রায় ৫০ একর জমিতে ক্ষেত খামার ও চাষাবাদ বন্ধ রয়েছে বলে বলে জানান স্থানীয় চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর আজিজ। তিনি বলেন,ঘুমধুমের মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস কৃষি কাজ। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে দূর্ঘটনা বা অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিশেষ করে নো-ম্যান’স ল্যান্ডের আশেপাশের এলাকায় ক্ষেত-খামার এবং চাষাবাদ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। বিজিবি এবং সিভিল প্রশাসনের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে এ কথা বলা হয়েছে। এতে এলাকার দরিদ্র কৃষকেরা দারুণ বিপাকে পড়েছে। এটা দীর্ঘস্থায়ী হলে এলাকায় খাদ্য সংকট দেখা দিবে।
রোহিঙ্গারা জানায়,গত ৯ ফেব্রুয়ারি আকস্মিক রাখাইন রাজ্য এবং তুমব্রু নো’ম্যান্সল্যান্ড পরিদর্শন করেন মিয়ানমারে উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল অং সো। এসময় তিনি-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথাও বলেন এবং সেখান থেকে তাদের সরে যেতে বলেন। এর পর থেকে সেখানে আতংক বিরাজ করছে। রোহিঙ্গাদের অভিযোগ,আতংক সৃষ্টি করতে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীরা রাতে ফাঁকা গুলি বর্ষন এবং তাদের ঘরে ঢিল ছুড়ে মারছে।
তবে কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লে.কর্ণেল মনজুরুল আহসান খান জানান, বর্তমানে জিরো লাইনে কোনো আতংক নেই। আর এসব রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য জাতীয় পর্যায়ে কথা হচ্ছে,আশাকরি কোন সুরাহা হয়ে যাবে। তিনি আরো বলেন,আমাদের কাজ সীমান্ত সুরক্ষা করা,আমরা তা করছি,আমাদের নিয়মিত টহল অব্যাহত আছে। আমরা সর্তক আছি। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিজিবি প্রস্তুত আছে।








