নিউজ ডেস্ক:
পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস কী কী উপায়ে হতে পারে, এক আলোচনা সভায় এসে সেই ফাঁকগুলো তুলে ধরেছেন পুলিশ কর্মকর্তা শেখ নাজমুল আলম।
প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে সাম্প্রতিক শোরগোলের মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগে বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘প্রশ্ন ফাঁস রোধে করণীয়’ শীর্ষক এই গোলটেবিল আলোচনায় আসেন তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার নাজমুল পাবলিক পরীক্ষা সংক্রান্ত জাতীয় মনিটরিং কমিটিরও সদস্য।
২০১৪ সাল থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে কাজ করে অনেককে গ্রেপ্তারের অভিজ্ঞতা নিয়ে এই বিষয়ে নিজের পর্যবেক্ষণগুলো তুলে ধরেন তিনি।
বিজি প্রেসে গলদ
পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নগুলো যেখানে ছাপা হয়, সেই বিজি (বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট) প্রেস থেকে প্রশ্ন ফাঁসের বড় সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন পুলিশ কর্মকর্তা নাজমুল।
বিজি প্রেসের এক কর্মচারীকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ গ্রেপ্তারের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, “প্রতিটি প্রশ্ন ম্যানুয়ালি গুণে গুণে প্যাকেট করা হয়।
“সেই কর্মচারী বলেছে, এভাবে প্রশ্নপত্র গুণে গুণে প্যাকেট করার সময় তারা প্রশ্ন ভাগ করে মুখস্থ করত এবং প্রেস থেকে বেরিয়ে তা লিখে রাখত এবং এভাবে অন্যদের মুখস্থ মিলিয়ে কোচিং সেন্টারগুলোতে প্রশ্ন বিক্রি করত।”
“ম্যানুয়ালি গুণে যদি প্যাকেট করতে হয় এবং ১৫/২০ দিন একটি কাজ করলে অনায়াসেই সেই প্রশ্নের সবকিছু আয়ত্তে এসে যায়,” বলেন তিনি।
বিজি প্রেসে ১০৮টি সিসি ক্যামেরা থাকলেও তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না বলে এই পুলিশ কর্মকর্তার পর্যবেক্ষণ।
“বিজি প্রেস সরেজমিন পরিদর্শন করে আমি দেখলাম, যে রুমে প্রশ্নপত্র ছাপা হয় সেই রুমের সিসি ক্যামেরা পুরো রুম কভার করে না।”
তিনি বলেন, “দেশ ডিজিটাল হলেও বিজি প্রেস এখনও ডিজিটাল হয়নি। আধুনিকায়নের আগে সেখানে কোনো প্রশ্ন ছাপানো উচিৎ নয়।”
‘কেন্দ্র কমাতে হবে’
পরীক্ষা কেন্দ্র কমানোর পরামর্শও দেন পাবলিক পরীক্ষা সংক্রান্ত জাতীয় মনিটরিং কমিটির সদস্য নাজমুল।
তিনি বলেন, “মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়াও বাংলাদেশের অনেক জায়গায় এখনও রাজনৈতিক বিবেচনায় পরীক্ষার কেন্দ্র নির্ধারণ হয়। এটা বন্ধ করতে হবে।
“মহানগরগুলোতে মনিটরিং করার মতো যথেষ্ট লোকবল থাকলেও মহানগরের বাইরে কেন্দ্রগুলো অনেক দূবে এবং এক কেন্দ্র থেকে আরেক কেন্দ্রে যেতে সময়ও বেশি লাগে এবং মনিটর করার লোকবলও যথেষ্ট থাকে না।”
পরীক্ষার কেন্দ্র কাছে হলে ট্রেজারি থেকে কেন দুই ঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র পাঠনো হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
“দূরত্ব অনুয়ায়ী সময় নির্ধারণ করা হবে। অর্থাৎ টেজারির কাছের কেন্দ্র হলে সেখানে পাঁচ মিনিট আগে প্রশ্নপত্র পাঠানো হবে।”
আগামী ২ এপ্রিল শুরু হতে যাওয়া এইচএসসি পরীক্ষায় অন্যান্য পরীক্ষার মতো কেন্দ্র বেশি থাকবে না এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
‘রেজাল্টের দিকে দৌড়ালে হবে না’
প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে অভিভাবকসহ সবার মানসিকতার পরিবর্তনের উপর জোর দেন পুলিশ কর্মকর্তা নাজমুল।
প্রশ্নপত্র কিনতে গিয়ে শিক্ষার্থীর সঙ্গে সঙ্গে চারজন নারী অভিভাবককে আটকের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম- আপনারা (অভিভাবক) কেন শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রশ্নপত্র কিনতে আসলেন?
তখন তারা বললেন, ‘আমার সন্তান জিপিএ গোল্ডেন বা জিপিএ ফাইভ না পেলে তো কোথাও পরীক্ষা দেওয়ারই সুযোগ পাবে না’।
“বুঝলেন প্রশ্ন ফাঁস রোধে কোথায় হাত দিতে হবে”- সবার উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে নাজমুল বলেন, “শুধু রেজাল্টের দিকে দৌড়ালে হবে না।”
‘দরকার আইন সংস্কার’
প্রশ্ন ফাঁসকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পরীক্ষার আইন সংস্কারের সুপারিশ জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা নাজমুল।
তিনি বলেন, “১৯৮১ সালের পাবলিক এক্সামিনেশন অ্যাক্টে আসামিকে ২-১ দিনের বেশি রিমান্ডেও নেওয়া যায় না।
এজন্য প্রশ্নফাঁসকারী এক চক্রের পাঁচ স্তরকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছি, বাকি স্তর পর্যন্ত পৌঁছা যায়নি।”
গোলটেবিলে শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞ মমতাজ লতিফ বলেন, “শিক্ষা আইনে পরিবর্তন করতে হবে। পাঠ্যপুস্তক অনেক সংশোধন করা হয়েছে, তবে আরও করতে হবে।”
প্রশ্ন ফাঁস রোধে পাবলিক পরীক্ষার পাশাপাশি ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা তদারকিতেও সরকারি কমিটি থাকা উচিৎ বলে মনে করেন পুলিশ কর্মকর্তা নাজমুল।
গোলটেবিলে অভিভাবক সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নীপা সুলতানা পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তনের উপর জোর দিয়ে বলেন, “প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে অবজেকটিভ বাদ দিতে হবে।”
বৈঠকে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু, কেমব্রিয়ান এডুকেশন গ্রুপের চেয়ারম্যান এম কে বাশার, ক্র্যাবের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিজান মালিক বক্তব্য দেন।
ক্র্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক এম এম বাদশাহর সঞ্চালনায় গোলটেবিলে ধারণাপত্র পড়ে শোনান ক্র্যবের দপ্তর সম্পাদক রুদ্র রাসেল।
সূত্র: বিডিনিউজ।






