নিউজ ডেস্ক:
আস্থার সঙ্কটের কারণে পার্বত্যাঞ্চলে ভূমি বিরোধসহ অন্যান্য সমস্যার সমাধানে দেরি হচ্ছে বলে এক অনুষ্ঠানে আলোচকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
তারা বলেছেন, শান্তিচুক্তি ও ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি আইন নিয়ে পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালি ও পাহাড়িদের মধ্যে বিরোধের কারণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগগুলো ঝুলে যাচ্ছে।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্যাটেজিক স্টাডিজ (বিস) আয়োজিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা নিষ্পত্তিকরণে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ও বাধাসমূহ নিরূপণে করণীয়’ শীর্ষক এই আলোচনা অনুষ্ঠান হয় ।
আলোচনায় সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মো. জাহাংগীর কবির তালুকদার বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি আইন-২০০১ এর অধীনে এ পর্যন্ত ৫টি কমিশন গঠন করা হয়েছে। দীর্ঘ সময়ে নানা প্রতিবন্ধকতায় কাজ করতে গিয়ে বাধা পেয়েছে এসব পরিষদ।
বাধার বিষয়ে তিনি বলেন, “ভূমির জন্য দলিল নেওয়ার বিষয়ে পাহাড়িদের অনেকেই অনাগ্রহী। তারা সনাতনী চিন্তার অনুসরণ করেন। আঞ্চলিক নেতারাও এই বিরোধ নিষ্পত্তিতে আন্তরিক নয়। অতীতে বার বার কোরাম সঙ্কটের কারণে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের সভা ব্যর্থ হয়েছে।”
এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, ভূমি বিরোধ আইন কার্যকর হলে হেডম্যান ও কারবারিদের ক্ষমতা খর্ব হবে বলে পাহাড়ি নেতারা মনে করেন।
পার্বত্য শান্তি চুক্তির আলোকে সেখানে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পগুলো সরিয়ে নেওয়ার দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)সহ পাহাড়ি নেতারা। তারা বলছেন, পার্বত্যাঞ্চলে তাদের কার্যত সেনাশাসনে থাকতে হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বকারী বিস-এর পরিচালক এ কে এম আব্দুর রহমান জানান, এই আলোচনায় পার্বত্য তিন জেলার সার্কেল চিফদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু তারা আসেননি।
অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার উল হক ও সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী আমন্ত্রিত হলেও তারাও ছিলেন না।
আলোচনায় মেজর জেনারেল তালুকদার বলেন, “সেখানে আস্থার সঙ্কট রয়েছে। কীভাবে সৃষ্টি হলো সেটা চিহ্নিত করা দরকার। সে অনুযায়ী কাজ করলেই সমস্যার সমাধান হবে।
“১৯৯৭ সালে পাবর্ত্যাঞ্চল নিয়ে শান্তিচুক্তি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হলেও ২০০১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এর বাস্তবায়ন থেমে ছিল। সে কারণেই আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। আবার আদিবাসীদের অতিমাত্রায় স্বাতন্ত্র্যের দাবিও আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি করছে।”
পার্বত্যাঞ্চলে ধর্মান্তকরণের বিষয়টি তুলে ধরে তার পেছনে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কোনো স্বার্থ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার সুপারিশ করেন তিনি।
“২০১৪ সাল পর্যন্ত ৫০ হাজার মানুষকে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। ২০১৪-১৫ সালে ৫০৬টি পরিবারকে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। ২০১৫-১৬ সালে দেড় হাজারের অধিক পরিবারের ৫ হাজারেও বেশি মানুষকে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। ২০১০ সালে সেখানে চার্চ ছিল ২০৯টি, এখন সেখানে ২৫৭টি।”
বাঙালিদের অভিবাসন নিয়ে বিভিন্ন এনজিওর প্রশ্ন তোলাও সমস্যা জটিল করে তুলছে বলে এই সেনা কর্মকর্তার দাবি।
আলোচনায় চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক নাগরিক কমিটির প্রতিনিধি উসাসাং এসা বলেন, “আস্থার সঙ্কটের মধ্যেই পাহাড়ের সব সমস্যা আটকে আছে। বেশি বেশি সংলাপের মাধ্যমে এসব সমস্যা দূর করতে হবে। পাহাড়ি নেতাদেরকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।”
পাহাড়িদের নিজেদের মধ্যে বিভক্তিও সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করেন তিনি।
উসাসাং বলেন, শান্তিচুক্তি অনুযায়ী ভূমি হস্তান্তরের দায়িত্ব জেলা পরিষদের কাছে দেওয়ার কথা ছিল। সেই কাজটি বাস্তবায়ন প্রয়োজন। যেসব আইন ও বিধিমালা নিয়ে মতোবিরোধ আছে সেগুলো সংস্কার করা প্রয়োজন।
পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ নেতা মাইনুদ্দিন বলেন, পাবর্ত্য শান্তিচুক্তি ও বিধিমালায় বাঙালিদের অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়নি। সেখানে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি।
বান্দরবান থেকে আসা জন্ডিয়া মাংলাই বলেন, “আমাদের মধ্যে যে আস্থার সঙ্কট আছে তা আজকের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়েছে।”
অনুষ্ঠানের মূল আলোচক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, আস্থার সঙ্কট নয়, বিষয়টি হচ্ছে ঐকান্তিকতার অভাব।
শান্তিচুক্তির সঙ্গে সংবিধানের বিরোধের বিষয়টিতেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এই অধ্যাপক।
“পিস একর্ডের বাংলা ‘শান্তি চুক্তি’ কথাটা সঠিক নয়, এটা হবে শান্তি সমঝোতা। চুক্তি হয় দুটি উচ্চ ক্ষমতার পক্ষের মধ্যে। এই সমঝোতা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ বাংলাদেশ এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র। তাহলে পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ হয় কী করে? এটা হবে হিল কাউন্সিল, নট রিজিউনাল কাউন্সিল। এখন হয় সংবিধান সংশোধন করতে হবে, অথবা প্রতিষ্ঠানের নামটি পরিবর্তন করতে হবে।”
সঙ্কট সমাধানে আরও বেশি সংলাপ প্রয়োজন বলে মনে করেন অধ্যাপক আনোয়ার।
অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক অচিরেই পার্বত্য সমস্যা সমাধানের আশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “সরকার জনগণকে আস্থায় নিয়ে আসার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি করার পর থেকে শেখ হাসিনার সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে তা বাস্তবায়নের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে, অনেক কাজ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। অচিরেই সঙ্কটের সমাধান হবে।”
সূত্র: বিডিনিউজ






