অনলাইন ডেস্কঃ
আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে খাগড়াছড়িতে প্রতিপক্ষের গুলিতে ইউপিডিএফ সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের জেলা সভাপতিসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও তিন জন।

শনিবার সকাল ৮টায় শহরের স্বনির্ভর এলাকায় এ হামলা হয়।
নিহতরা হলেন ইউপিডিএফ (প্রসীত বিকাশ খীসা নেতৃত্বাধীন) পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের খাগড়াছড়ি জেলা সভাপতি তপন চাকমা, সহ-সাধারণ সম্পাদক এল্টন চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের জেলা সহ-সভাপতি পলাশ চাকমা এবং তিন পথচারী উত্তর খবংপয্যা গ্রামের বাসিন্দা ও জেলার মহালছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য সহকারী জিতায়ন চাকমা (৫৩), একই গ্রামের কান্দারা চাকমার ছেলে রুপম চাকমা ও ধীরাজ চাকমা।
আহতরার হলেন সমর বিকাশ চাকমা (৪৮), সুকরিন চাকমা (৩৫) ও সোহলে চাকমা (২২)। এদের জেলা সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এছাড়া দুপুরে শহরের পেরাছড়ায় একটি মিছিলে হামলায় এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের খাগড়াছড়ি জেলা দপ্তর সম্পাদক সমর চাকমা স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, হামলার প্রতিবাদে আগামী সোমবার (২০ অগাস্ট) খাগড়াছড়িতে আধাবেলা সড়ক অবরোধ ঘোষণা করা হয়েছে।
পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন খাগড়াছড়ি জেলা শাখা এ অবরোধের ডাক দেয় বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
খাগড়াছড়ি সদর থানার ওসি সাহাদাত হোসেন টিটো জানান, সকালে স্বনির্ভর এলাকায় অর্তকতিভাবে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় একদল সন্ত্রাসী। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তারা পালিয়ে যায়।
ঘটনাস্থল থেকে ২৪ রাউন্ড গুলির খোসা উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
স্থানীয়দের বরাত দিয়ে ওসি জানান, সকাল পৌনে ৮টার দিকে স্বনির্ভর বাজারে পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনের বিবদমান দুগ্রুপের মধ্যে গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। এ সময় গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ভয়ে-আতঙ্কে সাধারণ লোকজন ও ব্যবসায়ীরা পালিয়ে যায়।
ওসি জানান, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে হতাহতদের উদ্ধার করে জেলা সদর হাসপাতালে পাঠালে কর্তব্যরত চিকিৎসক ছয় জনকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় আহত অপর তিনজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক নয়নময় ত্রিপুরা বলেন, গুলিবিদ্ধ নয় জনের মধ্যে ছয় জন ঘটনাস্থলে মারা গেছেন। বাকি তিন জনের অবস্থা গুরতর হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
খাগড়াছড়ির সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুল আউয়াল বলেন, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর উভয়পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার বিষয়ে পুলিশ বিস্তারিত খোঁজ খবর নিচ্ছে। জড়িতদের আটকে পুলিশি অভিযান অব্যাহত আছে।
এদিকে, এ ঘটনার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) দায়ী করেছে প্রসীত বিকাশ নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় সংগঠক মাইকেল চাকমা।
তবে জেএসএস এম এন লারমার পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করে প্রসীত নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এ ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়।
হামলার ঘটনার কয়েক ঘন্টা পর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ইউপিডিএফ (প্রসীত)।
সংগঠনটির প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগ থেকে নিরন চাকমা স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সংস্কারবাদী জেএসএস ও নব্য মুখোশ বাহিনীর সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র হামলায় পিসিপি-যুব ফোরাম নেতাসহ ছয় জনকে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
খাগড়াছড়ি শহরে বিক্ষোভ মিছিলে হামলা, নিহত ১
খাগড়াছড়ি শহরের পেরাছড়া এলাকায় ইউপিডিএফের একটি বিক্ষোভ মিছিলে হামলায় শন কুমার চাকমা (৫৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
শনিবার পানছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাট বন্ধ ও চাঁদাবাজির প্রতিবাদে স্থানীয় গ্রামবাসীদের নিয়ে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে ইউপিডিএফ।
স্থানীয়দের বরাত দিয়ে খাগড়াছড়ি সদর থানার ওসি সাহাদাৎ হোসেন টিটো বলেন, মিছিলটি খাগড়াছড়ি শহরের দিকে আসার পথে পেরাছড়া ব্রিজ এলাকায় অস্ত্রধারীরা ফাঁকা গুলি করে।
“এ সময় হুড়োহুড়ি করে পালাতে গিয়ে বেশ কয়েকজন আহত হয়। আহতদের মধ্যে শন কুমার চাকমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। পরে দুপুরে তিনি মারা যান।”
খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের চিকিৎসক নয়নময় ত্রিপুরা বলেন, “ওই ব্যক্তির মাথার পেছনে ডান দিকে আঘাত ছিল। রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।”
এদিকে, ইউপিডিএফ এক বিবৃতিতে এ ঘটনায় নারীসহ তিন জন আহত হয়েছে বলে দাবি করেছে।
এরা হলেন খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের ১ম বর্ষের ছাত্রী উর্মি চাকমা, গুলকানা গ্রামের বাসিন্দা মিনু চাকমা ও সোনা রঞ্জন চাকমা।
এ ঘটনার জন্য জনসংহতি সমিতি সংস্কারকে দায়ী করলেও তারা তা অস্বীকার করেছে।
৪ মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর
খাগড়াছড়ির স্বনির্ভর ও পেরাছড়া এলাকায় হামলায় নিহত সাত জনের মধ্যে চার জনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া পরিবারের কেউ না আসায় বাকি তিনটি লাশ খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

শন কুমার চাকমা ও ধীরাজ কুমার চাকমার মরদেহ পানছড়িতে এবং জিতায়ন চাকমা ও রুপম চাকমার মরদেহ স্বণির্ভরের নিজ বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
জিতায়ন চাকমার মরদেহ তার স্ত্রী প্রভাতি চাকমা এবং রুপম চাকমার মরদেহ তার চাচা নয়ন চাকমা বুঝে নেন।
ধীরাজ চাকমার মরদেহ প্রতিবেশী আপ্রুইং মারমা এবং শন কুমার চাকমার চাকমার মরদেহ তার বড় ভোন কল্প লতা চাকমা পুলিশের কাছ থেকে বুঝে নেন।
রোববার সকালে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে স্ব স্ব এলাকার চার মরদেহ স্থানীয় শ্মশানে দাহ করার কথা রয়েছে।
পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের তিন নেতা তপন চাকমা, পলাশ চাকমা ও এলটন চাকমার পরিবারের কেউ না আসায় তাদের মরদেহগুলো খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
খাগড়াছড়ি সদর থানার ওসি সাহাদাৎ হোসেন টিটো বলেন, পুলিশি নিরাপত্তায় চার জনের লাশ নিজ নিজ বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
পার্বত্য শান্তিচুক্তিবিরোধী প্রসিত বিকাশ খিসা নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফের প্রভাব বেশি খাগড়াছড়িতে। ভাঙনের পর দুটি দলের মধ্যে সংঘাত লেগে আছে।
এবছরের ৩ জানুয়ারি খাগড়াছড়িতে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা মিঠুন চাকমাকে। এই হত্যার জন্য ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিককে দায়ী করেছিল ইউপিডিএফ।
এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি শহরের হরিনাথপাড়া এলাকায় ইউপিডিএফকর্মী দীলিপ কুমার চাকমাকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। তার চার দিন পর খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় সুভাষ চাকমা নামের আরেক ইউপিডিএফকর্মী খুন হন।
গত ১৬ এপ্রিল খাগড়াছড়ি শহরের পেরাছড়া এলাকায় সন্ত্রাসী হামলায় সূর্য বিকাশ চাকমা নামে একজন নিহত হন। তিনিও ইউপিডিএফের দুই অংশের বিরোধের কারণে মারা গেছেন বলে ধারণা করা হয়।
এরপর গত ৪ মে খাগড়াছড়ি থেকে রাঙামাটি যাওয়ার পথে খুন হন ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের অন্যতম শীর্ষ নেতা তপন জ্যোতি চাকমা বর্মাসহ পাঁচজন।
সূত্রঃ বিডিনিউজ






