ড. দেলোয়ার হোসেনঃ
রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি থেকে শুরু করে অন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পর্যায়সহ সর্বস্তরে আলোচনা চলছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে অবস্থান নতুন না হলেও ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের কারণে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা সেখান থেকে বিতাড়িত হয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছে। ১৯৭৮ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের অবস্থান বাংলাদেশে ছিল। তাদের কিছু অংশ মিয়ানমারে ফেরত গেলেও ৩ থেকে ৪ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছিল। ফলে বিভিন্ন হিসাব-নিকাশে ১১/১২ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজার ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছে।

তাদের বিষয়ে এই মানবিক বিপর্যয় অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। এই সংকট বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র, সংস্থা ও সাধারণ মানুষকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছে।
বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া গণহত্যা ও জাতিগত নিধন প্রক্রিয়া যা মানুষকে চরমভাবে ব্যথিত বিস্মিত করেছে। এই গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের বিষয়টি জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানরা অকপটে স্বীকার করেছেন। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক তৎপরতা ব্যাপকভাবে লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। এই তৎপরতার অগ্রভাগে রয়েছে বাংলাদেশের ভূমিকা। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকার অতীতে অবস্থান থেকে সরে এসে রোহিঙ্গাদের পাশে মানবিক সহায়তার হাত প্রসারিত করে। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক- এই বিষয়গুলো কিছুটা দূরে ঠেলে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে এবং এই সংকট সমাধানে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করেছে। এই অবস্থান অতীতে কখনও কোনো সরকার গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছিল, যে প্রস্তাব এখনও রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের এবং জনগণের মনোভাবের অন্যতম পরিচায়ক। এই পাঁচ দফা প্রস্তাবের ভেতরে একদিকে যেমন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মিয়ানমারে সম্মানজনকভাবে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি আছে, অন্যদিকে এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের পরিস্কার ইঙ্গিতও রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রস্তাবে মিয়ানমার রাষ্ট্রের ওপর আন্তর্জাতিজ চাপ সৃষ্টির সুস্পষ্ট আহ্বান রয়েছে। রাখাইনে ‘সেইফ জোন’ অর্থাৎ নিরাপদ এলাকা প্রতিষ্ঠা করে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাবটি দেওয়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সাহসী এবং কার্যকর প্রস্তাব। বাংলাদেশে এই অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সরকার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য বিভিন্ন কূটনৈতিক তৎপরতা পরিচালনা করছে। এই তৎপরতার দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতেও লক্ষণীয়। ইতিমধ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জম্যান্ট’ নামক একটি দলিলে স্বাক্ষর করে। ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর স্বাক্ষরিত এই দলিলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে দ্বিপক্ষীয় আলাদা আলোচনার একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে। এর ওপর ভিত্তি করে ওয়ার্কি গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করা হয় দু’দেশের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে। নীতিনির্ধারক পর্যায়ে যোগযোগ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করে তাদের প্রত্যাবসনের প্রক্রিয়ার জন্য কাজ শুরু হয়। একই সঙ্গে রাখাইনে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্য মিয়ানমারের ওপর একটি চাপ বজায় রাখা হয়। তা ছাড়া আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশ ভারত এবং চীনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ রক্ষা করে দেশ দুটিকে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থনের জন্য তৎপরতা অব্যাহত রাখা হয়। যার ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এই গুরুত্বপূর্ণ দুটি দেশ তাদের পূর্বের অবস্থান থেকে সরে এসে রোহিঙ্গাদের মানবিক দাবির প্রতি এক ধরনের সহানুভূতি প্রদর্শন করে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ওআইসি ও কানাডাসহ বিভিন্ন পক্ষগুলো রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের প্রশংসার পাশাপাশি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ বরাবরের মতোই রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সোচ্চার। রোহিঙ্গাদের আত্মপরিচয়ে, নাগরিকদের অধিকার, মানবাধিকার, সর্বোপরি মিয়ানমারে তাদের ফিরে যাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার এবং আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি বিভিন্নভাবে নানা মহল থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে। মিয়ানমার রাষ্ট্রের নৃশংসতা, মানববিরোধী অপরাধের ঘৃণ্য নজির অং সান সু চির চরম ব্যর্থতা- এসব বিষয়ে নাগরিক সমাজ প্রতিনিয়ত বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরছে। যে সমস্যাটি এক সময় সাধারণ মানুষের দৃষ্টির অনেকটা আড়ালেই ছিল সেটি এখন সবার মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের অবস্থান থেকে সরকার ও নাগরিক সমাজ এমনকি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অনেকটা একই মঞ্চে অবস্থান করছে। অর্থাৎ মিয়ানমার রাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা করার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। কিন্তু নতুন করে সৃষ্ট রোহিঙ্গা সংকটের প্রায় এক বছর অতিক্রান্ত হলেও এই সংকট সমাধানে বাস্তব পরিস্থিতি এখনও যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক নয়। বরং সমস্যাটি জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হয়েছে। এই সংকটটি একদিকে রোহিঙ্গাদের জন্য বাচা-মরার অস্তিত্বের বিষয়। মানবতার বিষয় তো বটেই। অন্য দিকে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বের অনেক ধনী এবং শক্তিশালী রাষ্ট্র যখন পাঁচ কিংবা দশ হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দিতে অনীহা প্রকাশ করে, সেখানে বাংলাদেশ ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে, নিজের সম্পদ তাদের জন্য বরাদ্দ করেছে এবং সমগ্র বিশ্বকে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এই সংকটটি বর্তমানে একটি বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করেছে। একদিকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন, অন্যদিকে ক্যাম্পগুলোতে তাদের জন্য নূ্যনতম সুস্থ জীবন নিশ্চিত করা, যা যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভেতরে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক ঝুঁকি তৈরি করছে। স্থানীয় জনসাধারণ, যারা এক সময় রোহিঙ্গাদের স্বাগত জানিয়েছে তাদের মধ্যে এখন ব্যাপক উৎকণ্ঠা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ১১ লাখ রোহিঙ্গার উপস্থিতিতে কক্সবাজার-টেকনাফ এলাকায় জনমিতিক ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়েছে। স্থানীয় সম্পদের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের সহায়তা করার জন্য সব ধরনের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এমনকি ভাসানচর এলাকায় রোহিঙ্গাদের একাংশকে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। শত শত স্থানীয়, জাতীয়, আন্তর্জাতিক সরকারি-বেসরকারি সংস্থাকে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সহায়তা করার, ত্রাণ তৎপরতাকে জোরদার করার কথাও বার বার বলা হচ্ছে। সরকারের প্রশাসনিক ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস করে ওই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে পরিস্কারভাবেই রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে একটি নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক তৎপরতার চ্যালেঞ্জও মোকাবেলা করতে হচ্ছে। বিষয়টি এমনিতেই চ্যালেঞ্জিং, যেখানে মিয়ানমার রাষ্ট্র একটি সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। তারা আন্তর্জাতিক চাপকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে চলছে। রোহিঙ্গাবিরোধী প্রচার-প্রোপাগান্ডা ব্যাপকভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা সংক্রান্ত ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রকে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য সরবরাহ করছে। রাষ্ট্রটির ভেতরে সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্ব এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় গোষ্ঠী রোহিঙ্গা ইস্যুতে একই অবস্থানে থেকে কাজ করছে।
জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণা তাদের আচরণের মূল বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত এবং কূটনৈতিক প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার সব ধরনের প্রচেষ্টাকে দীর্ঘায়িত করার অপতৎপরতা চালাচ্ছে। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, কিংবা উচিত তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই মতপার্থক্য ও উভয় সংকট কাজ করছে। কেউ কেউ যেমন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বলেছে। কেউ কেউ এও মনে করে, দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় কোনো ফল বয়ে আসবে না। আবার অনেকে এও মনের করেন, আইসিসির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারকে দোষী সাব্যস্ত করে দেশটিকে শায়েস্তা করতে হবে।
নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, ইতিপূর্বে এশিয়ার এই রাষ্ট্রটি ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাপক সুবিধা ভোগ করেছে। দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে এই রাষ্ট্রটির ওপর বৃহৎ শক্তির মুখাপেক্ষিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে চীন-ভারত-রাশিয়া-জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া-আসিয়ান দেশগুলো এই রাষ্ট্রের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিয়ানমারের ভেতরে তাদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করার সুযোগ খুঁজছে। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার এই নির্মম হিসাব-নিকাশ মিয়ানমারকে আরও আক্রমণাত্মক ও বেপরোয়া করে তুলেছে। ফলে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের বিষয়টি হয়তো আপাতত অধরা থেকে যাবে। তবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অবস্থান এবং তাদের সহায়তার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এগিয়ে আসতে হবে। যতদিন রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কিংবা রোহিঙ্গাদের কার্যকর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু না হবে (দৃশ্যত যা এখনও অনিশ্চিত) ততদিন রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার জন্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতেই হবে। মানবিক সহায়তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যে কোনো হীনরাজনীতি কিংবা কৌশলগত বিবেচনা কাম্য নয়।
সূত্রঃ সমকাল







