অনলাইন ডেস্কঃ
নির্বাচন সামনে রেখে অনেক দিন পর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করতে পেরে চাঙ্গাভাব দেখা দিয়েছে বিএনপিতে। এখন সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায়ে জনসভায় উত্থাপিত সাত দফা দাবি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ১২ দফা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সপক্ষে জনমত তৈরি করে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে মাঠে নামবে দলটি। এ লক্ষ্যে গতকাল সোমবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রোজলিন টেরিঙ্কের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল।

জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বুধ ও বৃহস্পতিবার দু’দিনের কর্মসূচি শেষে আবারও নতুন কর্মসূচি দেবে তারা।
এদিকে, জনসভায় বিএনপির কয়েকজন নেতার বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া গড়তে আগ্রহী ছোট ছোট রাজনৈতিক দল সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্যকে ঘিরে দলের ভেতরে ও বাইরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দলের উদারপন্থি নেতারা এ নেতিবাচক বক্তব্যের বিরোধিতা করছেন; অন্যদিকে কট্টরপন্থিরা সমর্থন করছেন। তবে ঐক্যের আগ্রহী নেতা এবং রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, বড় দল হিসেবে বিএনপি বাগাড়ম্বর করলে ঐক্য প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল সমকালকে বলেছেন, শত বাধাবিপত্তির পরও জনসভায় বিপুল লোকসমাগমের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, জনগণ বিএনপির সঙ্গেই আছে। এখন জনসভায় উত্থাপিত দাবিগুলো আদায়ে জনমত তৈরি এবং আন্দোলনে নামবেন তারা। এরই মধ্যে দু’দিনের কর্মসূচি দিয়েছেন। পর্যায়ক্রমে আরও কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাবেন। সরকারকে দাবি আদায়ে বাধ্য করা হবে বলে জানান তিনি। ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে জনসভায় দলের কয়েকজন নেতার নেতিবাচক বক্তব্য সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মির্জা ফখরুল বলেন, ওই নেতারাও আন্তরিকভাবে ঐক্য চান। এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কোনো অবকাশ নেই।
অবশ্য জনসভায় লোকসমাগম বেশি হয়নি বলে রবি ও সোমবার দু’দফায় একই দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, তাদের সমাবেশের উপস্থিতি হতাশাজনক। এ উপস্থিতি দেখে মনে হয়েছে, জনগণ বিএনপির সঙ্গে নেই। দল চাঙ্গা করতে বিএনপি আবোল-তাবোল দাবি তুলছে। ১৪ দলের প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, অনুমতি নিয়ে তাদের মিটিং করতে হয়। আমরা অনুমতি ছাড়াই মিটিং করেছি। এই হলো বিএনপির আন্দোলনের শক্তি।
জবাবে গতকাল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, বিএনপির জনসভায় বিপুল জনসমাবেশে হতাশ হয়েছেন ওবায়দুল কাদের। মাত্র ২৪ ঘণ্টার নোটিশে বিএনপির এত লোকজনের উপস্থিতি তাদের অবাক করেছে। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ বলেছেন, জনসভায় লোকসমাগম নিয়ে ওবায়দুল কাদের ‘প্রলাপ’ বকছেন। পথে পথে সরকারি আক্রমণ ও বাধার মুখে পড়েও এত বিপুল মানুষের জনসভা দেখে তিনি হতাশ হয়ে মনের বিকারে প্রলাপ বকছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুপস্থিতি এবং মামলা-মোকদ্দমা মোকাবেলায় ক্লান্ত ও হতাশ নেতাকর্মীরা কিছুটা উজ্জীবিত হয়ে উঠেছেন। রোববারের জনসভার পর কেন্দ্র থেকে সারাদেশের মাঠ পর্যায়ে নেতাকর্মীরা বেশ সক্রিয় হয়ে উঠছেন। নিজ নিজ এলাকার কর্মী-সমর্থকরা সাক্ষাৎ করছেন সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে। কেউ আনুষ্ঠানিক, আবার কেউ অনানুষ্ঠানিক বৈঠকেও মিলিত হচ্ছেন। চলমান আন্দোলন ও আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে স্থানীয়ভাবে কর্মকৌশল নিয়ে মতবিনিময় করছেন। জনসভা থেকে দেওয়া দাবি আদায়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সিনিয়র নেতারা। মূল দল এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের যেসব নেতা এত দিন নিষ্ফ্ক্রিয় ছিলেন, নড়েচড়ে উঠছেন তারাও। এরই মধ্যে কেন্দ্র্র থেকে মাঠ ও তৃণমূল নেতাদের মাঠে নামতে বিশেষ বার্তাও পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে সম্ভাব্য সংসদ সদস্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মাধ্যমে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় সংগঠনকে শক্তিশালী করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, অন্যান্য দিনের তুলনায় গতকাল দলের নেতাকর্মীর উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। অনেক দিন ধরে পুলিশের গ্রেফতার আতঙ্কে নয়াপল্টন কার্যালয় এড়িয়ে চলতেন নেতাকর্মীরা। তবে গতকালের চিত্র ছিল ভিন্ন। বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে মুখর ছিল কার্যালয়টি। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে জনসভায় আসা নেতাকর্মীদের অনেকে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের অফিস ও বাসভবনে গিয়ে সাক্ষাৎও করছেন।
সূত্র জানায়, বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল গতকাল সোমবার বিকেলে গুলশান দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রোজলিন টেরিঙ্কের সঙ্গে বৈঠক করেছে। ওই বৈঠকে জনসভায় দেওয়া বিএনপির সাত দফা দাবি ও বারো দফা লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন বিএনপি নেতারা। বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, দলের আন্তর্জাতিক উইংয়ের নেতা ও সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, কেন্দ্রীয় সদস্য তাবিথ আউয়াল উপস্থিত ছিলেন। সূত্র জানায়, পর্যায়ক্রমে বিএনপি বিশ্বের প্রভাবশালী ও প্রতিবেশী দেশের রাষ্ট্রদূত এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছেও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে উত্থাপিত দাবি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় লক্ষ্যগুলো তুলে ধরবে।
ঐক্য নিয়ে নেতিবাচক বক্তব্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া : আলোচিত জনসভায় বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ার ব্যাপারে দলীয় অবস্থান তুলে ধরার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বাসভবনে বৈঠকে দলের পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হাসান মাহমুদের মাধ্যমে এ বার্তা দিয়েছিল তারা। একইসঙ্গে ঐক্য প্রক্রিয়া গড়তে নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করতে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে অভিযুক্ত ২০ দলীয় জোটের শরিক দল জামায়াতে ইসলামীকেও আমন্ত্রণ জানায়নি বিএনপি।
তবে জনসভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন প্রমুখ নেতারা জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় আগ্রহী ছোট দলগুলোকে নিয়ে নেতিবাচক বক্তব্য দেওয়ায় দলের ভেতর ও বাইরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করে বিএনপির সিনিয়র উদারপন্থি নেতারাও বলছেন, জাতীয় ঐক্য গড়তে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার আগেই নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। এখন তারা সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে ঐক্য গড়তে যাচ্ছেন। কিন্তু দলের নীতিনির্ধারণী স্থায়ী কমিটির নেতারা যদি প্রকাশ্যে নেতিবাচক বক্তব্য দেন, তা দুঃখজনক। এতে ঐক্য বাধাগ্রস্ত হলে দায় তাদের নিতে হবে।
আবার বিএনপির কট্টরপন্থি অংশের কিছু নেতা মনে করেন, ছোট দলগুলোর নিজেদের বড় দলের সঙ্গে হিসেব করেই কথা বলা উচিত। তাদের সতর্ক করে দিতে এমন বক্তব্য প্রয়োজন ছিল। ঐক্য হলে দেড়শ’ আসন এবং দুই বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দেওয়ার মতো শর্ত ছোট দলগুলোর অবস্থান থেকে অনানুষ্ঠানিক দাবি তোলার জবাবে এই বার্তা দেওয়া জরুরি ছিল মনে করেন তারা।
এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না গতকাল বলেছেন, আগামীতে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে বেশ কিছু মৌলিক বিষয়ে বিএনপি তাদের সঙ্গে ঐক্য গড়তে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। ঐক্য প্রক্রিয়ার উদ্যোগের মধ্যে নেতিবাচক বক্তব্য দুঃখজনক। বিএনপি দম্ভ দেখালে ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারবে না। তবে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে দোষের কিছু দেখছেন না গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী। গতকাল একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের কাছে এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন তারা।
অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা মনে করেন, দলগুলোকে অবমূল্যায়ন করলে বিএনপিরই ক্ষতি। ছোট দলগুলোকে অসম্মান করে বিএনপির কোনো লাভ হবে না। এতে সুফল পাবে আওয়ামী লীগ। বিএনপি নেতারা ছোট দলগুলোকে উদ্দেশ করে বলেছেন, জনসভায় লোক নেই, জন নেই তারা বড় বড় কথা বলে। নিজেদের তাল গাছ দাবি করে, জাতীয় ঐক্যে আগ্রহী ছোট দলগুলোকে কলাগাছের সঙ্গে তুলনা করেছেন বক্তারা। একইসঙ্গে বেশি শর্ত দিলে এসব দলের দরকার নেই এবং তারা একাই সফল আন্দোলন করতে পারবেন বলে দাবি করেছেন দু’একজন নেতা।
সূত্রঃ সমকাল






