অনলাইন ডেস্কঃ
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’র প্রভাবে অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে জোয়ারের পানি। ডুবে যাচ্ছে দেশের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শাহপরীর দ্বীপ। দ্বীপের পশ্চিমপাড়ায় বেড়িবাঁধ না থাকায় গত দু’দিনে তলিয়ে গেছে মসজিদসহ শতাধিক ঘরবাড়ি।

এর মধ্যে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ডুবে গেছে অর্ধশতাধিক ঘর। এসব ঘরের লোকজন টেকনাফসহ অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। এইভাবে চলতে থাকলে দ্বীপের মাঝারপাড়া ও দক্ষিণপাড়ার আরও দুই শতাধিক ঘর তলিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সেখানকার বাসিন্দারা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নং ওয়ার্ড সদস্য নুরুল আমিন বলেন, সাগরের জোয়ারের পানিতে দ্বীপের মাঝারপাড়া ও দক্ষিণপাড়ার শতাধিক ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। পাঁচ বছর আগে দ্বীপের পশ্চিম দিক থেকে তিন কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে যায়। তার পর থেকে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন দ্বীপের বাসিন্দারা। এ দ্বীপে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসতি। পাঁচ হাজারেরও বেশি পরিবার অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে জনশূন্য হয়ে পড়বে দ্বীপ। এ ছাড়া খোলা বাঁধ যদি স্থায়ী কিংবা অস্থায়ীভাবে মেরামত না করা হয়, তাহলে আগামী কয়েক দিনের ভেতর সাগরে বিলীন হয়ে যেতে পারে আরও শতাধিক ঘর।
প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, দ্বীপের বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য ১০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন, যা দিয়ে ইতিমধ্যে আংশিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুত গতিতে খোলা থাকা বাঁধগুলো নির্মাণ করা না গেলে পুরো দ্বীপ সাগরে তলিয়ে যাবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সমস্যা-সংকটে এভাবে প্রায় বিচ্ছিন্ন জনপদে পরিণত হতে যাচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর শাহপরীর দ্বীপ। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপটি পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এখানকার সংকট সমাধানে যথাযথ নজর নেই কর্তৃপক্ষের।
বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা যায়, দ্বীপের পশ্চিমাংশে মাঝারপাড়া, দক্ষিণপাড়া ও পশ্চিমপাড়ার ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে পানিতে। ফলে এসব এলাকার হাজারো মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন দ্বীপের পূর্ব অংশের মানুষের ঘরবাড়িতে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গত বুধ ও বৃহস্পতিবার দু’দিনেই প্রায় অর্ধশত ঘরবাড়ি হারিয়েছেন মানুষ। কথা হয় মাঝারপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউনুছের (৬৫) সঙ্গে। তিনি বলেন, নাম লিখে কী করবেন! বাড়িঘর তো আর ফিরে পাব না। গত পাঁচ বছর জোয়ারের পানিতে ভাসলাম। এবার সবকিছু গিলে নিয়েছে সাগর। এখন বড় ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি।
নুর বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জোয়ারের পানিতে ঘর ভেঙে যাওয়ায় অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছি। গতকাল থেকে এক মুঠো খাবার দিতে পারিনি মুখে। পাঁচ বছর ধরে ক্ষয়ে ক্ষয়ে মরছি। কেউ আমাদের কষ্টের খবর নিতে আসে না!
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো, শহিদুল ইসলাম বলেন, বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’র প্রভাব কক্সবাজারের কিছু জায়গায় পড়েছে। তবে ৪ নং সতর্ক সংকেত নামিয়ে ৩ নং সংকেত দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ৪০ মিলিমিটার। এ বৃষ্টিপাত ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
জানতে চাইলে পাউবো কক্সবাজারের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ১০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে শাহপরীর দ্বীপের প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে ১ কিলোমিটারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে যে খোলা বাঁধ থেকে সাগরের পানি ঢুকছে; জিও ব্যাগ বসানো হয়েছিল সেখানে।
তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ-উত্তরের দুই কিলোমিটার ভেতরে যেসব ঘরবাড়ি রয়েছে, জোয়ারের পানি প্রবেশ করেছে সেখানে। যে স্থান দিয়ে পানি ঢুকছে সেখানে আবারও বালির জিও ব্যাগ বসানো হবে। পুরো তিন কিলোমিটারের কাজের মেয়াদ ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। তবে আবহাওয়া ভালো থাকলে নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করা হবে।
এ বিষয়ে সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের (স্থানীয় ইউপি) চেয়ারম্যান নুর হোসেন জানান, খোঁজখবর নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সহায়তা চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তালিকা পাঠানো হবে।
শাহপরীর দ্বীপের ভেঙে যাওয়া ঘরবাড়ি পরিদর্শনে যাচ্ছেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিউল হাসান। তিনি বলেন, সাগরে জোয়ারের পানিতে মসজিদসহ ঘরবাড়ি বিলীন হওয়ার খবর পেয়েছি। কতগুলো ঘর ভেঙেছে, তার হিসাব এখনও পাইনি। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সহায়তা চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে তালিকা পাঠানো হবে এবং আর কোনো ঘরবাড়ি যেন সাগরে বিলীন হয়ে না যায়, সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





