অনলাইন ডেস্কঃ
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ না থাকায় খাগড়াছড়িতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ২০১৯ শিক্ষাবর্ষে এ কার্যক্রম প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত হলেও কার্যত কোনও সুফল মিলছে না। মূলত মাতৃভাষায় লেখা বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত নয় শিক্ষার্থীরা। এ বর্ণমালা শেখানোর জন্য শিক্ষকরাও প্রশিক্ষিত নন। যে কারণে শিশুদের কাছে পাঠদান আনন্দদায়ক হচ্ছে না। সেজন্য প্রথমে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। সমস্যা সমাধানে সম্প্রদায়ভিত্তিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগেরও পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর পাহাড়ে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তৈরি হয় পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন। ওই আইনের প্রথম তফসিলে পরিষদের কার্যাবলি অংশে ৩ (ঠ) ধারায় উপজাতীয় শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতের দাবি করে আসছিলেন পাহাড়ি নেতারা। সেই হিসেবে পাহাড়ি নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা একাধিক বৈঠক করে তৈরি করেছেন নীতিমালা। নির্ধারণ করা হয়েছে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষার বর্ণমালাও।
দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যক্রম বোর্ড (এনসিটিবি) প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাত্রী জাতিগোষ্ঠীর জন্য মাতৃভাষায় পাঠ্যক্রম চালু করে। পর্যায়ক্রমে যা ২০১৭-২০১৮ শিক্ষাবর্ষে প্রথম শ্রেণি এবং ২০১৮-২০১৯ শিক্ষাবর্ষে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়।
চলতি শিক্ষাবর্ষে খাগড়াছড়িতে প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় রয়েছে ৩০ হাজার ১ শ ২৯ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু সবকিছু হয়েছে কাগজে-কলমে।
খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক ছাপানো ও সরবরাহ করা হলেও শিক্ষক শিক্ষার্থীসহ অনেকে নতুন এ পাঠ্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত নয়। এ কারণে আলোর মুখ দেখছে না এ কার্যক্রম। সমস্যা সমাধানে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও সম্প্রদায়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের দাবি করেছেন শিক্ষকরা।
খাগড়াছড়ি জেলা সদরের খাগড়াপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশা প্রিয় ত্রিপুরা বলেন, ‘সরকার প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বই ছাপানো ও সরবরাহ করলেও তা কাজে লাগেনি। কারণ প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায় বইগুলো পড়ানো যাচ্ছে না। কিছু শিক্ষক বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত হলেও পাঠদান আনন্দদায়ক হচ্ছে না।’ তিনি প্রথমে শিক্ষকদের প্রশিক্ষিত করার পরামর্শ দেন।
খাগড়াছড়ি শহরের ঠাকুরছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সোয়েভাই অং চৌধুরী বলেন, পাহাড়িদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা। দাবি পূরণ করেছে সরকার কিন্তু প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায় তা যথাযথ আলোর মুখ দেখছে না।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য মাতৃভাষায় লেখক প্যানেল মেম্বার (এনসিটিবি) মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, ‘শিশুরা যাতে নিজ মাতৃভাষা শিখতে পারে, নিজের কৃষ্টি-সংস্কৃতি বজায় রাখতে পারে, ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর ভাষাগুলো যেন হারিয়ে না যায়, শিশুদের কাছে শিক্ষা যেন আকর্ষণীয় হয়, ঝরেপড়া রোধসহ নানা বিষয় মাথায় রেখে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার বই ও উপকরণ বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। তবে তা এখনও আলোর মুখ দেখেনি কারণ পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল নেই। আশা করি সরকার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে উদ্যোগী হবে।’ তিনি মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমকে গতিশীল করতে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের শিক্ষাক্রমে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শও দেন।
খাগড়াছড়ি কলেজিয়েট হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক আর্য মিত্র চাকমা বলেন, ‘দুই একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকেরা মাতৃভাষায় বর্ণমালা শেখাচ্ছেন, তবে তা খুব ফলপ্রসূ হচ্ছে না। সফলভাবে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ঝরেপড়ার হার কমবে, উৎসাহ বাড়বে এবং গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
তবে খাগড়াছড়ি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফাতেমা মেহের ইয়াছমিন শোনান আশার কথা। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন স্কুলে মাতৃভাষায় বর্ণমালা শেখানো হচ্ছে। কিন্তু তার সুফল এখনও ভালোভাবে পাচ্ছে না শিক্ষার্থী। বিষয়টি মাথায় রেখে তিন সম্প্রদায়ের (চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা) শিক্ষকদের মাতৃভাষায় প্রশিক্ষণ দিতে ইতোমধ্যে প্রশিক্ষক প্যানেল নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদফতর থেকে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা পেলে প্রশিক্ষণ শুরু হবে’
সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন





