অনলাইন ডেস্কঃ
পুরান ঢাকার চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা কামাল হোসেন।

কাছাকাছি এলাকা নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক মানুষের প্রাণহানির নয় বছর পর সেখানে মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চেয়েছেন তিনি।
ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশে কামাল হোসেন বলেছেন, “এদেশ কারও পৈত্রিক সম্পত্তি নয়, দেশের মালিক জনগণ- এটা আমার কথা নয়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানে তিনিই লিখে দিয়ে গেছেন, স্বাক্ষর করে গেছেন।
“যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের দেশের মালিকদের মনে রাখতে হবে।”
চকবাজারের চুঁড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের স্মরণে মঙ্গলবার বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী কনফারেন্স কক্ষে গণফোরামের সভায় বক্তব্য দেন দলটির সভাপতি কামাল হোসেন।
তিনি বলেন, “২০১০ সালে নয় বছর আগে নিমতলীতে এ রকম অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জন মারা গিয়েছিল। নিমতলী থেকে এই জায়গা (চুড়িহাট্টা) খুব কাছেই। ওই সময়ে হাই কোর্ট থেকে পুরান ঢাকাকে নিরাপদ করার জন্য পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দিয়েছিল, যাতে নিমতলীর মতো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা না ঘটে। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে আমরা কোনো পদক্ষেপ দেখিনি, নীরবতা লক্ষ করেছি।
“হাই কোর্ট এ রকম আদেশের পরেও কেন তারা (সরকার) দায়িত্বহীন থাকবে? জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তো রাষ্ট্রের কর্তব্য, সরকারের দায়িত্ব-কর্তব্য।”
মঙ্গলবারও এ হাই কোর্ট এক আদেশে এ বিষয়ে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ জানতে চেয়েছে বলে জানান আইনজীবী কামাল হোসেন।
“আজকেও আদেশ দিয়েছেন- দ্রুত জানাও কী কী করা হয়েছে। এ রকম আদেশ নয় বছর আগেও আদালত দিয়েছিল।”
নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আসুন যারা মারা গেছেন তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলি যে, আপনাদের জীবনকে যেভাবে হারিয়েছেন, আপনাদের শোক সন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা জানাচ্ছি। এটা বলতে হয় যে, এত জীবন হারানোর পরে ২০১০ এ যারা ১২৪ জন জীবন হারিয়েছেন এসব প্রাণের বিনিময়ে আজকে আমরা যারা বেঁচে আছি শক্তভাবে অবস্থান নেব। দেশ এভাবে চলতে পারে না, দেশকে এভাবে চলতে দেওয়া যায় না।
“দেশে জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং এসব ব্যাপারে জবাবদিহি থাকতে হবে, যারা এসব করেছেন তারা দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।”
শোকসভায় নিহতদের স্মরণে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয়।
জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, “আমার পরিষ্কার বক্তব্য- চকবাজারের মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, এটা খুন হয়েছে। যাদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে এটা হয়েছে তাদের বলছি, আপনারা নির্বাচিত নন-আল্লাহর ওয়াস্তে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে চলে যান। আমি বলতে চাই, আগুন কিন্তু আপনাদের গায়েও লাগবে।
“এই দিন দিন নয়, এক মাঘে শীত যাবে না। মনে রাখবেন ১৬ কোটি মানুষের গায়ে আগুন দিয়েছেন ২৯ ডিসেম্বর রাতে, আপনাদের গায়েও আগুন লাগবে। জনগণের মনে ক্ষোভ জমা হচ্ছে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান বলেন, “চুড়িহাট্টায় কতজন মারা গেছে? নিউ ইয়র্ক টাইমসের হিসেবে ১১০ জন মারা গেছেন, আমাদের সরকারের হিসেবে ৬৯ জন, আমরা ঢাকার পত্র-পত্রিকায় দেখেছি ৮১ জন।
“আমি অংকের ছাত্র, দুর্বল ছাত্র, তাই হিসাব মেলাতে পারি না। তবে এখানে একটি গল্প মনে পড়ছে- হিসাব হয়ত মিলতেও পারে আজকে যদি এক-দুই সপ্তাহ পরে যদি দেখি সরকার টানেল খনন করে সেখান থেকে যদি সুবেশী-সুবেশা কিছু তরুণ-তরুণী বের করে নিয়ে আসে তাহলে হয়ত হিসাব মিলতেও পারে। আপনারা কি রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির কথা ভুলে গেছেন?”
সভায় নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “এখানে কতগুলো দলের নেতা আছেন আমরা বলছি, আমরা জানি, তোমরা মিথ্যুক, তোমরা প্রতারক, তোমরা ডাকাত। জনগণের অধিকার হরণ করার চেষ্টা করছ। মানুষকে কথা বলতে দিতে চাও না। আমরা যেটা মানি না।
“কথায় বলে অতি চালাকির গলায় দড়ি। এই যে চট্টগ্রামে বিমানবন্দরে বিমান হাইজ্যাকের কথা শুনলেন- এটা কোনো হাইজ্যাকের প্রচেষ্টা? একটা লোক একা একা বিমান হাইজ্যাক করতে গেছে? রব ভাইসহ আমরা কালকে এক জায়গায় ছিলাম উনি বললেন, আরে চোর যখন চুরি করতে যায় তখনও দুইজন চ্যালা নিয়ে যায়, যাতে ঠিকমতো চুরি করার পর বেরিয়ে যেতে পারে। আর এই লোক এত বড় দুর্ধর্ষ ক্রিমিনাল তার জন্য কমান্ডো নামাতে হল। তার সাথে কেউ নেই। পিস্তল নাকি একটা নিয়ে গিয়েছিল সেটাও আবার পরে বলছে, খেলনা তা আবার পাওয়া যাচ্ছে না। মামলা যেটা করা হয়েছে সেই মামলায় কোনো পিস্তল, কোনো অস্ত্রের উল্লেখ নাই। সরকারটা কী? সরকারের এজেন্সিগুলো কী? ঘটনা কী?”
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধু আমাদের জন্যে, জাতির জন্যে একটা অহঙ্কার। অনেক বড় নেতা তিনি, বিশ্বমানের নেতা। উনি বাকশাল করেছিলেন মানুষ পছন্দ করেনি। আজকে তার কন্যা যদি মনে করে এ রকম ভোট ডাকাতি করে দেশে এক দলের, এক ব্যক্তির, একার শাসন কায়েম করবেন তাহলে তিনিও ভুল করছেন।
“এই উন্নয়নের নামে যতই ফুলঝুড়ি ঝরান, আমরা তো দেখছি যে, ঢাকা কি তিলোত্তমা না কি ঢাকা একটা আগ্নেয়গিরি, ঢাকা কি সুন্দর না ভয়ঙ্কর, ঢাকা কি জীবনের জন্য সুন্দর, জীবনের জন্য উপভোগ্য না কি জীবনের জন্য বিপদজনক- সেটা তো পুরান ঢাকা দেখলেই বোঝা যায়। সারা বাংলাদেশ মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন মানুষ মারা যায়। এটা কি দেশ? এই দেশের জন্য আমরা লড়াই করেছি, এদেশের জন্য আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, এদেশের মুক্তির জন্য লাখো মানুষ জীবন দিয়েছিল?”
সরকারের উদ্দেশে মান্না বলেন, “এক মাঘে শীত যায় না, দুই মাঘেও শীত যায় না। মাঘ বারে বারে আসে এবং ঠাণ্ডা লাগে। এই ঠাণ্ডা আপনাকেও ধরবে, অপেক্ষা করুন।
“মনে করেছেন বেশি বুদ্ধি করছেন, বেশি জুলুম করছেন আমরা কেউ কিছু করব না। মনে করছেন গুম করছেন, খুন করছেন, জেলে নিচ্ছেন, নির্যাতন করছেন, লাখো বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের জেলে রেখেছেন, বিরোধী দলের একছত্র নেত্রী সারা দেশের একছত্র নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে এই বয়সে এত অসুস্থতার পরেও একটা ভুতূড়ে বাড়ির মতো জেলখানায় বন্দি করে রেখেছেন বলে মানুষ কথা বলবে না। আপনি যদি অন্যায় করেন, অন্যায়ভাবে কাউকে শাস্তি দেন, অন্যায়ভাবে নির্যাতন করেন, মানুষ প্রতিবাদ করবেই।”
গণফোরাম সভাপতি কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে এবং দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মোশতাক হোসেনের পরিচালনায় সভায় গণস্বাস্থ্য সংস্থার ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, প্রেসিডিয়াম সদস্য আবু সাইয়িদ, আমসা আমিন বক্তব্য রাখেন।
সূত্রঃ বিডিনিউজ





