সেলিনা হোসেন :
অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তাঁকে নিয়ে অল্প কথায় লেখা বা বলা কঠিন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব তিনি। একাধারে একজন সমাজসংস্কারক, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক। আবার ষাটের দশকের একজন প্রতিশ্রুতিময় সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও পরিচিত তিনি। এসব ক্ষেত্রেও তিনি অনবদ্য অবদান রেখেছেন। আবার আমরা মনে করতে পারি, সেই সত্তরের দশকে টিভি উপস্থাপক হিসেবেও বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন তিনি। তবে আমার মতে, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো আলোকিত মানুষ তৈরির কাজে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’।

একজন শিক্ষক হিসেবে জনপ্রিয়তার সর্বোচ্চ শিখর স্পর্শ করেছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অধ্যাপক হিসেবে তাঁর খ্যাতি কিংবদন্তিতুল্য। সেকালে তাঁর যাঁরা ছাত্রছাত্রী ছিলেন, তাঁদের মুখ থেকে শোনা কথা দিয়েও শিক্ষক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা বোঝা যায়। তিনি শিক্ষকতা জীবন শুরু করেছিলেন ১৯৬১ সালে মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে। পরে তিনি কিছুকাল সিলেট মহিলা কলেজেও শিক্ষকতা করেন। ১৯৬২ সালে তিনি রাজশাহী কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবন শুরু করেন। সেখানে পাঁচ মাস শিক্ষকতা করার পর তিনি ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজে যোগ দেন (বর্তমানে ঢাকা বিজ্ঞান কলেজ)। এর পর তিনি বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কলেজ ঢাকা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ জালালউদ্দিন আহমেদের আমন্ত্রণে সেখানে যোগদান করেন। ঢাকা কলেজেই তিনি তাঁর শিক্ষকতা জীবনের স্বর্ণযুগ অতিবাহিত করেন। সে সময় ঢাকা কলেজ ছিল দেশসেরা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মিলনস্থল।
অধ্যাপক আবু সায়ীদ যখন ঢাকা কলেজে যোগ দেন, তখন কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান। পরে তাঁর সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা থেকে শুরু করে সংগঠক হিসেবে সফল হওয়ার বীজটা এখান থেকেই শুরু হয়েছিল বলে আমার মনে হয়। তাঁর লেখা পত্র থেকে আমরা জানতে পারি, ঢাকা কলেজের শিক্ষকতা জীবন তিনি অত্যন্ত উপভোগ করতেন। আবার সেই সময়ের শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতেও তাঁর শিক্ষকতার কথা জানা যায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সুযোগ পেয়েছিলেন; শেষ পর্যন্ত আর সেখানে যাননি।
ঢাকা কলেজে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের শিক্ষকতা নিয়ে নানা গল্প ছড়িয়ে আছে। অনেকটা মিথের মতো। শোনা যায়, তিনি কখনোই ক্লাসে রোল কল করতেন না। রোল কলকে তাঁর কাছে মনে হতো সময়ের অপব্যয়। আবার তাঁর ক্লাসে অন্য ক্লাস থেকেও শিক্ষার্থীরা এসে বসে পড়তেন। তিনি স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘অনিচ্ছুক হৃদয়কে ক্লাসে জোর করে বসিয়ে রেখে কী করব? আমার চ্যালেঞ্জ ছিল এক ধাপ বেশি; কেবল শিক্ষক হওয়া নয়, সব ছাত্রের হৃদয়ের কাছে পৌঁছানো, সব ছাত্রের হৃদয়কে আপ্লুত করা।’ ক্লাসের সেরা ছাত্রকে পড়ানোর চেষ্টা করার চেয়ে তিনি পড়াতে চেষ্টা করতেন ক্লাসের সবচেয়ে বোকা ছাত্রকে। সারাক্ষণ তাঁকেই বোঝানোর চেষ্টা করতেন। কেননা, তাঁর বোঝানো মানে ক্লাসের বাকি সবাইকে বোঝানো।
আবু সায়ীদের যে গুণটি আমাকে আকৃষ্ট করে, তা হলো, তিনি একজন সুবক্তা। যে কোনো বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে উপস্থিত লোকজনকে মুগ্ধ করার একটি গুণ তাঁর রয়েছে। আমরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনালগ্ন থেকে মনস্বী, রুচিমান ও বিনোদন-সক্ষম ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে দেখে এসেছি। আমার ধারণা, টেলিভিশনের বিনোদন ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে তিনি পথিকৃৎ ও অন্যতম সফল ব্যক্তিত্ব।
আবার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে দেখি নতুন ধারা তৈরি করতে। ষাটের দশকে বাংলাদেশে যে নতুন ধারার সাহিত্য আন্দোলন হয়, তিনি ছিলেন তার নেতৃত্বে। সাহিত্য পত্রিকা ‘কণ্ঠস্বর’ সম্পাদনার মাধ্যমে সেকালের নবীন সাহিত্যিকদের তিনি একত্রিত করেছিলেন।
তবে শুরুতেই যেটি বলেছিলাম, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ব্যক্তিত্বের সবদিক সমন্বিত হয়েছে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’র সংগঠক সত্তায়। তিনি অনুভব করেছেন, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমাদের প্রয়োজন অসংখ্য আলোকিত মানুষ। বইপড়ূয়া মানুষ। তাই দেশের আদর্শগত অবক্ষয় দেখে তা থেকে উত্তরণে তিনি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গড়ে তোলেন। ‘আলোকিত মানুষ চাই’ স্লোগান ধরে সারাদেশে এই আন্দোলনের অগ্রযাত্রী হিসেবে তিনি এখনও সংগ্রামশীল। একজন মানুষ যাতে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা অধ্যয়ন, মূল্যবোধের চর্চা এবং মানব সভ্যতার যা কিছু শ্রেয় ও মহান, তার ভেতর দিয়ে পরিপূর্ণ মনুষ্যত্বসম্পন্ন হয়ে বেড়ে উঠতে পারে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে তাঁর তত্ত্বাবধানে মাত্র ২৫ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী বিশ্বসেরা সাহিত্যকর্ম পড়তে ও সেগুলোর ওপর আলোচনা করতে শুরু করেন। সেই থেকে ধীরে ধীরে এই পাঠচক্রে স্কুল-কলেজ ও সাধারণ মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই পাঠচক্রগুলোতে বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ বইগুলোর পঠন এবং সেগুলোর ওপর প্রাণবন্ত আলোচনা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার সেরা সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্যও জানার সুযোগ হয়।
বর্তমানে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র দেশের অধিকাংশ জেলায় তাদের কর্মকাণ্ড বিস্তৃত করেছে। এখন দেখতে পাই, এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বহু স্বেচ্ছাসেবী, যাঁরা বই নিয়ে মানুষের ঘরে ঘরে যাচ্ছেন। এই যে বই পড়ানোর মাধ্যমে আলোকিত মানুষ গড়ার যাত্রা, এর তো কোনো তুলনা চলে না! আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশে পাঠাগারের স্বল্পতার জন্য বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কার্যক্রম চালু করেছে। এই ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির মাধ্যমে বই পেতে আর কারও কষ্ট হচ্ছে না। রাজধানী ঢাকা শহরই শুধু নয়, সারাদেশের বিভিন্ন জেলা শহর ও উপজেলা পর্যায়েও এই ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে বই পড়ার এই সুযোগ সৃষ্টি করা তাঁর দূরদৃষ্টির একটি ফসল বলেই মনে করি।
জীবনের শুরুতে শিক্ষকতা দিয়ে যে আদর্শ মানুষ গড়ার ব্রত আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ শুরু করেছিলেন; এখন জীবনের এই অভিজ্ঞতাবহুল ধাপে এসেও সেটি অব্যাহত রেখেছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’ থেকে আলোকিত মানুষ হয়ে বেরিয়ে আসবে। আলোকিত মানুষ হওয়ার মধ্য দিয়ে আলোকিত দেশ ও বিশ্ব গড়ার প্রতিশ্রুতি আসবে- এটাই চাওয়া।
আজ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জন্মদিন। তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাই। স্বপ্ন দেখা ও স্বপ্ন দেখানো মানুষটি শতায়ু হোন- এই প্রত্যাশা।
সেলিনা হোসেন: কথাসাহিত্যিক; সভাপতি, বাংলা একাডেমি
সূত্র : সমকাল







