দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, অসামান্য প্রজ্ঞার অধিকারী, অতুলনীয় বেগম ফজিলাতুন নেছা ছিলেন মানবিক, বিচক্ষণ এবং স্বীয় অর্জিত গুণে গুণান্বিত একজন পরিপূর্ণ মানবী। মাত্র ৫ বছর বয়সে তিনি বাবা-মাকে হারিয়ে জগৎ-সংসার, বাস্তবতা বুঝতে শিখেছেন। বয়স যখন ১১ বছর তখন তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী হন। আজীবন স্বীয় আরাম-আয়েশ ও চাওয়া-পাওয়া উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুর প্রেরণাদাতা এবং রাজনৈতিক ত্যাগ-তিতিক্ষার অংশীদার ছিলেন।

বঙ্গমাতা প্রচলিত অর্থে রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তবে রাজনৈতিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন। সমসাময়িক রাজনীতি ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে বঙ্গমাতার বিশ্নেষণধর্মী উপলব্ধি ছিল প্রখর। বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে শর্তহীন মুক্ত করার পক্ষে বঙ্গমাতার অবদান ছিল সর্বাধিক। তৎকালীন পাকিস্তানি স্বৈরশাসক প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার শর্তে গোলটেবিল বৈঠকে বঙ্গবন্ধুকে আলোচনায় অংশগ্রহণের প্রস্তাব দিলে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করার উপায় হিসেবে ওই প্যারোল প্রস্তাব গ্রহণের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু বঙ্গমাতা ওই শর্তযুক্ত প্রস্তাবে সম্মতি দেননি। বঙ্গমাতার দৃঢ়তার কারণেই শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে নিঃশর্ত মুক্তি পেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলে বঙ্গমাতা পরিপূর্ণভাবে সমর্থন করেন। তিনি আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পর্দার অন্তরালে সক্রিয় ছিলেন; নিজের সন্তান শেখ হাসিনা এবং শেখ কামালকে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেন, উৎসাহ দেন। বঙ্গমাতাই প্রথম বাঙালি, যিনি বিশ্বাস করতেন- বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্ম ও নেতৃত্বে বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি রয়ে গেলেন। এ অবস্থায় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সমগ্র জাতি যখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন বঙ্গমাতা একটুও ভেঙে না পড়ে দেশের জনগণের পাশে দাঁড়ান। জনগণকে দুঃখ ভুলে, উদ্বেগ পরিহার করে বিজয়ের আনন্দ অনুভব করতে শেখান। তিনি যেন নিশ্চিত ছিলেন এবং সময়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে মনোযোগী হন। সহযোগী হিসেবে বঙ্গমাতা মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত দুস্থ নারী ও বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেন। তাঁদের স্বাবলম্বী করে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজ করে যান। দুস্থ নারীদের ভবিষ্যৎ জীবনেও যাতে কোনো সমস্যায় না পড়তে হয় সে বিষয়ে তিনি পরিপূর্ণ সজাগ ছিলেন এবং ব্যবস্থা নিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু জীবনের বেশিরভাগ সময় জেলে কাটিয়েছেন। বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে জেলে বসে আত্মজীবনী লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন- এ কথা বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে পরিস্কারভাবে উল্লেখ করেছেন। বঙ্গমাতা হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, পরবর্তী প্রজন্মের এক সময় বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের জন্মের ইতিহাস জানার প্রয়োজন হবে। মুক্তির মহানায়ক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধু বঙ্গমাতার অনুপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন। এই মহীয়সী নারী অনন্য। তিনি নিজেই নিজের তুলনা।
জাতির পিতা, বঙ্গমাতা কেউ আজ আমাদের মাঝে নেই। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে, স্বাধীনতাবিরোধীদের নির্মম আঘাতে বাঙালি জাতি তাঁদের হারিয়েছে এবং বাঙালি জাতি বঞ্চিত হয়েছে বঙ্গমাতার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, ত্যাগ ও মানবিক গুণাবলি সংবলিত উপদেশ, পরামর্শ এবং ভালোবাসা থেকে।
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে বাঙালি জাতি লজ্জিত। আমাদের সৌভাগ্য, পরম করুণাময়ের কৃপায় বঙ্গমাতার আদর্শে অনুপ্রাণিত তাঁর দুই সন্তান শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেঁচে আছেন। বঙ্গমাতার গুণে গুণান্বিত শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কলঙ্কজনক ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সামরিক শাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়; গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটে। পরনির্ভরশীলতা, দুর্নীতি, অপশাসন, বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে দেশ ছেয়ে যায়। স্বাধীনতাবিরোধীদের উল্লাস ও আস্ম্ফালন জাতিকে সহ্য করতে হয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করে দীর্ঘ ২১ বছর সংগ্রাম শেষে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন এবং জনগণের সমর্থনে সরকার গঠন করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে মনোযোগী হন; বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে মর্যাদার আসনে নিয়ে যান। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে স্থিতিশীল রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক ও মানবিক উন্নয়নের রোল মডেল। যে জাতির স্বাধীনতার জন্য, ভালোর জন্য বঙ্গমাতা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে জীবন উৎসর্গ করে গেছেন; সেই জাতির সামনে সুযোগ এসেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখে বঙ্গমাতার ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করার।
অধ্যাপক ড. নাসিম বানু: উপ-উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র : সমকাল







