তাজ উদ্দিন সিকদার :
বাবা, তুমি আছো অস্তিত্বজুড়ে। কেমন আছো তুমি? কোথায় আছো তুমি? শুনেছি মানুষ মারা গেলে, তারা হয়ে যায় কিন্তু তুমি-তো তারা হওনি। যদি তারা হতে তবুও তোমায় দেখতে পেতাম। কিন্তু তোমাকে-তো আমি দেখতে পাইনা। বলতে পারিনা তোমার জন্য আমার বুকের গহীনে কেমন পুড়ে দিবারাত্রি। তুমি কি আমায় দেখতে পাও?
এই মাসে তুমি শুধু আমাদেরকেই নয়, সমন্ত পৃথিবীকেই বিদায় জানিয়েছো। সকল মায়াজাল ছিন্ন করেছো। আচ্ছা সত্যিই কি তুমি আমাদের ছেড়ে যেতে চেয়েছিলে? মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও কি আমাদের চেহারা ভেসে উঠেছিলো? তুমি মারা যাবার আগে কি যেন বলতে চেয়েছিলে বাবা? তা বুঝতে পারিনি। তখনও কি তুমি আমার নাম ধরে ডাকছিলে শেষ দেখা দেখার জন্য? মৃত্যু যন্ত্রনা কি খুব বেশি? খুব জানতে ইচ্ছা করে।
তুমি সেদিন গভীরভাবে আল্লাহর ইবাদতে আচ্ছন্ন ছিলে। তাই অনেক কিছুই দেখতে পাওনি। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর দিবগত রাত-১২টায়, ৫৭ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেলেন আমার বাবা। দেখতে দেখতে ২ বছর পূরণ হলো। সেদিনেই বুঝেছি বাবাকে হারানোর শোকটা কতটা কষ্টের। বিশ্বাস হচ্ছিল না আমার। সেই সময়টা মনে পড়লে দমবন্ধ হয়ে আসে। বাবাকে হারিয়ে আমি পাথর হয়ে গেছিলাম।
আমার বাবা আমৃত্যু সততার মধ্যে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন। কোন দিন অসৎ কোন কাজে জড়িত ছিলেন না। মিশুক প্রকৃতির সদা হাস্যমুখের একজন মানুষ ছিলেন আমার বাবা। এলাকার প্রতিটি মানুষ বাবাকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করতেন। মাথার উপর বট বৃক্ষের ছায়ার মতো, আগলে রেখেছিলেন। একটা সময় সবার জীবনেই আসে, যখন মানুষ সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, তখন কারো পরামর্শ খুব জরুরী হয়ে পড়ে। সে সময়ে পাশে দাঁড়ানোর মতো আদর্শ একজন মানুষ হলো বাবা।
স্বভাবগত গাম্ভীর্যের জন্য বাবার সাথে সবার ঘনিষ্ঠতা একটু কম থাকে। কিন্তু বাবা নামক মানুষের ভালোবাসা কোন সময়ে ঘাটতি থাকে না। একেকটা দিন বড় একা লাগে বাবার স্পর্শটুকু, বাবার সেই মায়াভরা ডাক, মাথায় হাত ভুলিয়ে দেয়া।
বাবা নেই আজ দুই বছর, বাবাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো কখনো কল্পনা করিনি। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন। কেটে যাচ্ছে একেকটা দিন, মাস আর বছর। বাবা নেই, আছে বাবার অনেকগুলো স্মৃতি, অনেকগুলো কথা, যা ভুলতে পারিনা, ভোলা যায়না।
বাবা, আজ তোমায় অনেক বেশি মনে পড়ছে। মনে পড়ছে পড়ালেখা না করে, খেলার জন্য মার দিতো বাবা। আদর করে যখন বাবা বলে ডাকতো, গোসল করিয়ে দিতো। কোথাও গেলে আমাকে নিয়ে যেতো সাথে। বাবা তোমার হাতে অনেকদিন মার খাইনা, খুব ইচ্ছে হচ্ছে মার খেতে। খুব ইচ্ছে হচ্ছে বাবার আদর পেতে।
স্কুলে পড়ার সময়ে বেতন দেয়ার শেষদিনে, বাবা নিজে গিয়ে স্কুলের বেতন দেবেন বলে স্কুলে পাঠাতেন আমাকে। কিন্তু বলতে না নিজের কাছে টাকা নেই। আমি ভয়ে থাকতাম যদি টাকা না জোগাড় করতে না পারেন। আমি বুঝতাম তোমার হাতে টাকা নেই বলেই স্কুলে এসে বেতন দেয়ার কথা বলতেন। পরে বাবা ঠিকই বেতন দিতে যেতেন স্কুলে।
জানি বাবা তুমি আর ফিরে আসবে না। অকারণে তবু কেন তোমাকে কাছে ডাকি। তুমি নেই আমাদের মাঝে অনুভব করতেই খুবই কষ্ট লাগে। বলা যায়, লিখতে পারছিনা। লিখতে বসলেই অজস্র স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছি আমি। মাথার মধ্যে তোলপাড় করছে ঘটনা প্রবাহ। কোনটা ছেড়ে কোনটা লিখব ভেবে পাচ্ছিনা। তাই বোধহয় এই লেখাটিতে তোমায় কোন সম্ভাষণ জানাতে পারলাম না। কারণ, তোমাকে কোন সম্ভাষণে সম্ভাষিত করবো বুঝতে পারছিনা।
জানো বাবা, তুমি বেঁচে থাকতে তোমাকে নিয়ে, এভাবে তো লিখিনি। তাই হাতটা কাঁপছে। ঠিকমত লিখতে পারছিনা।
এতদিন তোমাকে নিয়ে লিখিনি। কারণ আমি মনে করি আমার ভিতরেই তো বাবা আছে। আমিইতো বাবা। তাই বাবার কথা আলাদা করে লিখার কিংবা বলা হয়নি। তবে জানো আজ তোমাকে নিয়ে খুব লিখতে ইচ্ছে করছে। প্রত্যেকটা সন্তানই বোধ হয় জীবনের একটা পর্যায়ে বাবাকে খুব মিস করে।
বাবার কথা খুব ভাবি। বাবা নামক মানুষটা যদি এই মুহূর্তে মাথায় তাঁর অকৃত্রিম স্নেহের হাতটা বুলিয়ে দিতো, যে সব সমস্যা দূর হয়ে যেতো নিমিষে। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি বাবা। নিজের স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার অনেক অমিল, তা এখন বুঝতে পারছি। চারদিকে অজস্র মিথ্যার ভীড়। একটা সত্যের পিছনে ছুটছি নিরন্তর। পৃথিবীতে এত মানুষ কিন্তু একজন মানুষও মিলেনা যিনি অকৃত্রিম ভালবাসা দেবেন। ঠিক তখন মনে হয় তোমার কথা বাবা। অনেক আনন্দের মুহূর্তেও যে মানুষটা অবিচল থেকে, স্মরণ করে দিবে ভবিষ্যতের কথা। মাঝেমধ্যে তুমি যখন আমার উপর রেগে যেতে, তখন বুঝতে পারতাম না। তোমা কঠিন অন্তরে যে পরিমাণ ভালবাসা লুকায়িত ছিলো, পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসা জড়ো করলেও তার সমতুল্য হতে পারেনা।

আজ বাবার সাথে পথ চলার সময় গুলোকে অনুভব করছি। চলার জীবনে বাবার ছায়াতেই বড় হয়েছি। বাবার ভালোবাসা, বাবার স্নেহ, আদর আজও আমার স্মৃতিতে জ্বল জ্বল করে ভাসে। আমার বাবা ছিলেন আমার আর্দশ। আজ বাবাকে আমার খুব প্রয়োজন ছিলো। বাবার সাথে অনেক কথা বলার ছিলো। বলতে পারিনি তাই মনের লুকানো কথাগুলো আজও কারো সাথে ভাগাভাগি করতে পারিনি। বাবার আর্দশ, বাবার সততা, বাবার নৈতিকতা আমার কাছে অতুলনীয়। যাদের বাবা আছে তাদের অনেকে জানেন না, বাবার ছায়া সন্তানের জন্যে কতো গুরুত্বপূর্ণ। বাবাহীন পৃথিবীটা অদ্ভুত এক জীবন। যাদের বাবা নেই, তারা কেবল জানেন বাবার অনুপুস্থিতিটা কেমন। এক সময় বাবার বুদ্ধিছাড়া কোন কাজেই সফল হওয়া যেতো না, আজ বাবাকে ছাড়া চলতে হচ্ছে প্রতিটা মুহূর্ত। এ যেন বুদ্ধিহীন পথচলা এই অচেনা শহরে।
বাবার স্মৃতি, উপদেশমূলক কথাগুলো আজও আমার অন্তরকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। বাবার আদর্শ আমাকে মানুষ হতে সাহায্য করছে। বাবার কথা মনে পরলে এখনো চোখে পানি চলে আসে।
‘বাবা কত দিন, কত দিন- দেখিনা তোমায়’ এ তো রক্তের সাথে রক্তের টান। স্বার্থের অনেক উর্ধ্বে হঠাৎ অজানা ঝড়। তোমায় হারালাম মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো বাবা। কতদিন কতদিন দেখিনা তোমায় কেউ বলে না তোমার মত কোথায় খোকা ওরে বুকে আয়।
আমার বাবা জাহাঙ্গীর আলম সিকদার ছিলেন, প্রাচীন জনগোষ্ঠী আবদুল আলী সিকদার বংশের দ্বাদশ প্রজন্ম পুরুষ। দুই বছর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নের পূর্ব ধেচুয়াপালং দারিয়ারদীঘি বড় ঢেফা এলাকাস্থ নিজ বাড়িতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আজ বাবার দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকী।
আমার বাবা মরহুম জাহাঙ্গীর আলম সিকদার রামুর পূর্ব ধেচুয়াপালং দারিয়ারদীঘি বড় ঢেফা নিবাসী, আবদুল আলী সিকদার বংশের হায়দার আলী সিকদার প্রজন্ম পুরুষ মরহুম মালেকুজ্জামান সিকদারের বড় ছেলে। মরহুম আবদুল বারী সিকদারের নাতি। আল্লাহপাক বাবাকে জান্নাত নসিব করুন।
লেখক: শিক্ষার্থী, রামু সরকারি কলেজ।






