হাসিবা আলী বর্ণা :
প্রভাবশালী ভিক্ষু থিচ নাত হান পরিচিত ছিলেন মাইন্ডফুলনেস বা মননশীলতার জনক হিসেবে। তিনি ছিলেন একজন ভিয়েতনামী থিয়েন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, শান্তিকর্মী। ছিলেন বিশিষ্ট লেখক ও কবি এবং বৌদ্ধ শিক্ষাগুরু। তিনি বৌদ্ধ আন্দোলন ‘এনগেইজড বুদ্ধিজম’ এর প্লাম ভিলেজ ট্র্যাডিশনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
ঐতিহাসিকভাবে জড়িত বৌদ্ধ ধর্ম তার প্রধান অনুপ্রেরণা। নাত হানের ধর্মপ্রচারের পদ্ধতিতে প্রারম্ভিক বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন শিক্ষা, যোগাচার ও জেনের মহাযান বৌদ্ধ ঐতিহ্য এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি মননশীলতা রয়েছে। তিনি মননশীলতার চারটি ভিত্তি শেখানোর জন্য পশ্চিমা মনোবিজ্ঞানের ধারণাগুলিকে একত্রিত করেন, যা ধ্যান অনুশীলনে আধুনিকতা আনে। বৌদ্ধ ধর্মের পশ্চিমা অনুশীলনের উপর হানের বড় ধরনের প্রভাব ছিল।
যুদ্ধের বিরোধিতা করায় ১৯৬০ দশকে নিজ দেশ থেকে নির্বাসিত হন থিচ নাত হান। দ্য মিরাকল অব মাইন্ডফুলনেস, পিস ইন এভ্রি স্টেপ, ওল্ড পাথ হোয়াইট ক্লাউডস ও হাউ ট্যু লাভ— তার বিখ্যাত বই।
১৯২৬ সালে জন্মেছিলেন। মারা যান ৯৫ বছর বয়সে ২০২২ সালে ভিয়েতনামে।
পূর্ণিমা উৎসব
কী ঘটে যখন শূন্যতার ভেতরে সংঘর্ষ হয়
এবং যখন চেতনা অচৈতন্যে হারায়?
সাথে এসো, বন্ধু
এসো, একসাথে দেখতে থাকি।
দেখতে কী পাচ্ছ দুই ভাঁড়, জন্ম ও মৃত্যু
মঞ্চ মাতাচ্ছে?
এখানে হেমন্ত আসে।
পাতারা হলুদ হয়।
পাতাদের উড়তে দাও
রঙের উৎসবে, হলুদ, লাল।
বসন্ত ও গ্রীষ্মে
পাতাদের ধরে রাখে যে শাখাগুলো,
এই সকালে তারা পাতাদের যেতে দিয়েছে
পতাকা ও লন্ঠনগুলো দৃশ্যমান করে।
এই পূর্ণিমা উৎসবে হাজির সবাই।
বন্ধু, কীসের জন্য আর অপেক্ষা?
উজ্জ্বল চাঁদ আমাদের ওপর আলো ছড়াচ্ছে।
রাতের রান্না নিয়ে ব্যতিব্যস্ত কেন?
কে খুঁজছে আর কেই বা পাচ্ছে?
এসো, এই চাঁদ উপভোগ করি, সারারাত।
চলাচল
স্রোতে রাখি আমার মাথা
ভেসে যাই ঢেউয়ের সাথে
প্রশ্বস্ত নদী,
গভীর আকাশ।
তারা ভেসে যায়, তারা ডুবে যায়
বুদবুদের মতো,
ডানার মতো।
ধ্যানময় হাঁটা
হাত ধরো।
আমরা হাঁটব।
আমরা শুধুই হাঁটব।
উপভোগ করব আমাদের হাঁটা
কোথাও পৌঁছানোর ভাবনা ছাড়াই।
শান্তিময় ভাবে হাঁটো।
হাঁটো আনন্দের সাথে।
আমাদের হাঁটা শান্তির হাঁটা।
আমাদের হাঁটা আনন্দের।
তাহলেই আমরা শিখব
শান্তিময় কোনো হাঁটা নেই
হাঁটাই শান্তিময়।
আমরা জানব, আনন্দময় কোনো হাঁটা নেই।
হাঁটাই আনন্দময়।
আমরা নিজেদের জন্য হাঁটি।
আমরা সবার জন্য হাঁটি
হাতে হাত রেখে।
হাঁটো এবং প্রতিমুহূর্তে স্পর্শ করো শান্তি
হাঁটো এবং প্রতি মুহূর্তে স্পর্শ করো আনন্দ।
প্রতি পদক্ষেপ বয়ে আনে সতেজ বাতাস।
প্রতি পদক্ষেপ প্রস্ফূটিত করে পুষ্প পায়ের তলে।
তোমার পা দিয়ে চুমু দাও ভূমিকে
মাটিতে এঁকে দাও ভালোবাসা ও আনন্দ।
পৃথিবী নিরাপদ হবে
যখন আমরা অনুভব করব নিজের ভেতরে যথেষ্ট নিরাপত্তা।
আন্তঃসম্পর্ক
তুমি আমিই, এবং আমি তুমি।
এটি সংশয়াতীত নয় কি যে আমরা আন্তঃসম্পর্কিত?
তুমি চাষ করো ফুলের
তাই আমি হয়ে উঠি সুন্দর।
আবর্জনাকে রূপান্তর করি আমি আমাতে
তাই দুর্ভোগহীন থাকো তুমি।
আমি তোমাকে সমর্থন দেই
তুমি হও আমার সহায়।
আমি এই পৃথিবীতে এসেছি তোমাকে শান্তি দিতে
আর তুমি এই পৃথিবীতে এসেছ আনন্দ বয়ে আনতে।
আমার আসল নামে ডাকো আমাকে
কাল আমি চলে যাব, বলো না।
এমনকি আজও আমি আসছি।
ভালোভাবে দেখ, প্রতি মুহূর্তে আমি আসছি
বসন্তের শাখায় নতুন কুঁড়ি হতে।
একটা ছোট্ট পাখি হতে, যার এখনো ডানা শক্ত হয়নি
কেবল পাখির বাসায় বসে শিখছে গান গাওয়া।
একটা ফুলের হৃদপিন্ডে শুঁয়োপোকা হতে,
পাথরের মধ্যে লুকিয়ে থাকা রত্ন হতে।
আমি এখনো আসছি, হাসতে এবং কাঁদতে
ভয় ও আশা পেতে।
আমার হৃদয়ের জন্ম ও মৃত্যুর স্পন্দন এখনো জেগে আছে।
আমি সেই রূপান্তরকামী মাছি
নদীর ওপরে যে ভাসছে।
এবং আমি সেই পাখি
যে ধেয়ে আসছে মাছিটিকে গিলে ফেলতে।
আমি সেই ব্যাঙ যে স্বচ্ছ পুকুরের জলে
আনন্দে সাঁতরাচ্ছে
এবং আমি সেই ঘাস-সাপ
যে নীরবে ব্যাঙটিকে খাচ্ছে।
আমি উগান্ডার হাড্ডিসার সেই শিশু
আমার পা এমন সরু যেন বাঁশের কাঠি
আমি সেই অস্ত্র ব্যবসায়ী
যে মারণাস্ত্র বিক্রি করছে সেখানে।
আমি ছোট্ট রিফিউজি নৌকার
সেই ১২ বছরের মেয়েটি
যে জলদস্যুর হাতে ধর্ষিত হয়ে
ঝাঁপ দিয়েছে সমুদ্রে।
এবং আমি সেই দস্যু,
যার হৃদয় দেখার ও ভালোবাসার
সক্ষমতা পায়নি এখনো।
আমি সেই পলিটব্যুরোর সদস্য
যার হাতে অসীম ক্ষমতা,
এবং আমি সেই লোক যাকে
জনগণের প্রতি তার ‘রক্তের ঋণ’ শোধ করতে
জোরপূর্বক শ্রমশিবিরে ধীরে মরে যেতে হচ্ছে।
আমার আনন্দ বসন্তের মতো উষ্ণ
এ সারা পৃথিবীতে ফুল ফোটায়।
আমার যন্ত্রণা অশ্রুর নদীর মতো
এতই বিশাল যে চার সমুদ্র ভরে যায়।
দয়া করে আমাকে আমার আসল নামে ডাকো
যেন আমি শুনতে পাই আমার সমস্ত ক্রন্দন এবং হাসি এক সাথে,
যেন আমি দেখতে পাই আমার আনন্দ ও যন্ত্রণা আসলে একই।
দয়া করে আমাকে আমার আসল নামে ডাকো
যেন আমি জেগে উঠতে পারি
এবং যেন আমার হৃদয়ের দরজা খুলে যেতে পারে
যে দরজা সহানুভূতির।
বিডিনিউজ






