দৈনিক কালের কণ্ঠ অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়ায় গত ২৩ জুলাই প্রকাশিত হয় পরপর ভারি বৃষ্টি ও বন্যায় বসতঘর ধসে পড়ে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী রোকেয়া বেগমের পরিবারের মানবেতর জীবনযাপনের সংবাদ। সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসন ও গণ্যমাণ্য ব্যক্তিদের পাশে পেয়ে আশার আলো দেখছে কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম জাউচপাড়া এলাকার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী রোকেয়ার পরিবার।
পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছে উপজেলা প্রশাসন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অগ্রযাত্রা, বাংলাদেশ বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার (৩১ জুলাই) আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অগ্রযাত্রার প্রধান নির্বাহী নীলিমা আক্তার চৌধুরী, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও এলাকাবাসী। অগ্রযাত্রার উদ্যোগে পরিবারটির জন্য নিরাপদ বসতঘর নির্মাণ করা হচ্ছে।
একইদিন মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ থের পরিবারটির তিন শিশুর আজীবন লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেন। সংগঠনের পক্ষ থেকে শিশুদের বই-খাতা, স্কুলব্যাগ, চেয়ার-টেবিল, শিক্ষা উপকরণ,ছাতা সহ প্রয়োজনীয় সামগ্রীও প্রদান করা হয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিল্লুর রহমান অসহায় পরিবারটির বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেন। তিনি পরিবারটিকে তাৎক্ষণিক নগদ অর্থসহায়তা প্রদান করেন।
পাশাপাশি ঢেউটিন, একটি টিউবওয়েল, উন্নতমানের টয়লেট নির্মাণ এবং রোকেয়া বেগমের জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া পরিবারটির জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ক্যাচাই মং, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা দেবেশ চন্দ্র দাশ, উপজেলা প্রকৌশলী কফিল উদ্দিন কবির এবং গর্জনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মনিরুল আলমসহ স্থানীয় গণ্যমাণ্য ব্যক্তিরা।
স্থানীয়রা জানান, একটি মানবিক সংবাদ কীভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, রোকেয়া বেগমের পরিবারের এই পরিবর্তন তারই অনন্য উদাহরণ। একসময় যেখানে বৃষ্টির পানিতে ভেসে যেত তাদের স্বপ্ন, সেখানে এখন নতুন ঘর, শিক্ষার নিশ্চয়তা এবং মানুষের ভালোবাসায় ভবিষ্যতের নতুন আশা দেখছে পরিবারটি।
দিল মোহাম্মদ ও তার স্ত্রী রোকেয়া বেগম সহায়তাকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, কালের কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশের পর তাদের দুর্দশার কথা দেশজুড়ে মানুষের নজরে আসে। অনেকেই বিকাশের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা পাঠিয়েছেন। নতুন ঘর নির্মাণ এবং সন্তানদের শিক্ষার দায়িত্ব নেওয়ার উদ্যোগ তাদের নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।’
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী রোকেয়া বেগম বলেন, ‘মনে হয় আল্লাহ কালের কণ্ঠের রামু প্রতিনিধিকে আমার ভাঙা ঘরে ফেরেশতা হিসেবে পাঠিয়েছেন। আমার জীবনে এমন সুখের মুহূর্ত খুব কমই এসেছে। এতদিন দুঃখে কেঁদেছি, আজ আনন্দে কাঁদতে ইচ্ছা করছে।’

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা বলে, ‘ভাঙা ঘরে খুব কষ্টে দিন কাটছিল। বৃষ্টি হলেই ঘরে পানি পরতো ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারতাম না। এখন নতুন ঘর হচ্ছে, বই-খাতা, চেয়ার-টেবিল পেয়েছি। আমাদের পড়ালেখার দায়িত্বও নেওয়া হয়েছে। আমরা খুব খুশি।’
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী উম্মে সালমা বলে, ‘আমরা ভাবিনি কেউ আমাদের কথা শুনবে। এখন নতুন ঘর পাব, পড়াশোনার সব উপকরণও পেয়েছি। আমাদের স্বপ্ন, লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হওয়া। কালের কণ্ঠকে ধন্যবাদ আমাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।’
স্থানীয় বিএনপি নেতা জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘অসহায় পরিবারটির দুর্দশার সংবাদ কালের কণ্ঠ প্রকাশের পর সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে। এটি গণমাধ্যমের ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল ভূমিকার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মানবিক সাংবাদিকতার কারণেই আজ পরিবারটি নতুন ঘর পাচ্ছে এবং শিশুদের ভবিষ্যৎও নিরাপদ হচ্ছে।’







