যখন মায়ের পেটে আমাদের অস্তিত্বের সূচনা হয়েছিল, তখন মা সব বুঝত। যখন ধীরে ধীরে সেখানে আমরা বড় হতে লাগলাম, তখনও মা সব বুঝত। মায়ের পেটে আমাদের নড়াচড়ায় যখন তিনি তীব্র যন্ত্রণায় কাতর হতেন, তখনও তিনি সব বুঝতেন।
পৃথিবীতে পদার্পণের পর থেকে মায়ের পাশাপাশি বাবাও সব বুঝতে শুরু করলেন। আমরা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিলাম, আর তাঁরা আমাদের প্রতিটি প্রয়োজন, প্রতিটি অভ্যাস, প্রতিটি পরিবর্তন বুঝে নিচ্ছিলেন।
ছোটবেলায় আমরা কোনো একটি বিষয় নিয়ে বাবাকে একই প্রশ্ন বারবার করতাম। বাবা বিরক্ত না হয়ে প্রতিবারই উত্তর দিতেন। কারণ তখন তাঁরা সব বুঝতেন।
কোনো কারণে মান-অভিমান করে কিংবা সাময়িক কষ্টে মুখ গোমড়া করে বসে থাকলে, মা পাশে এসে বসতেন। কিছু না বলেও বুঝে যেতেন আমাদের কী হয়েছে। সহযোগিতা করার চেষ্টা করতেন। কারণ মা তখনও সব বুঝতেন।
মাধ্যমিক কিংবা উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় বাবা নির্দিষ্ট বাসভাড়া ও নাস্তার টাকা দিতেন। মা অনেক সময় বাবার অজান্তে আরও কিছু টাকা হাতে তুলে দিতেন—এই ভেবে যে, তাঁর ছেলে বা মেয়েটি যেন অন্তত মাঝে মাঝে সহপাঠীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। কারণ মা তখনও সব বুঝতেন।
অনার্স কিংবা ডিগ্রির সময় ফরম ফিলাপ, সেমিস্টার ফি, বইপত্র কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পোশাকের প্রয়োজন—হাজারো সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মা-বাবা টাকা জোগাড় করে দিতেন। তাঁরা সব বুঝতেন।
কিন্তু আমরা—অপদার্থ শ্রেণির মানুষগুলো—যখন পড়াশোনা শেষ করে কোনো একটি কাজে ব্যস্ত হয়ে যাই, সংসার শুরু করি, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হঠাৎ করে মা-বাবা যেন আর কিছুই বোঝেন না! সব বুঝি শুধু আমরা।
অদ্ভুত বিষয় হলো, যাঁরা এতদিন আমাদের সব বুঝতেন, কালের পরিক্রমায় তাঁরাই একদিন আমাদের কাছে হয়ে যান ‘কিছু না বুঝা’ মানুষ।
তাঁদের সঙ্গে আমাদের পরিবেশের মিল নেই। তাঁরা আমাদের মতো করে কথা বলতে পারেন না, আমাদের মতো চলাফেরা করতে পারেন না, আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারেন না। তাই অনেক সময় আমরা তাঁদের পরিচয় দিতেও সংকোচ বোধ করি।
এখন তাঁরা কিছু বোঝেন না—সব বুঝি শুধু আমরা!
বাবা কোনো বিষয়ে আমাদের কাছে জানতে চাইলে আমরা উত্তর দিই। আবার তিনি একই বিষয়টি জিজ্ঞাসা করলে বিরক্ত হয়ে কটাক্ষ করি—‘এতবার বলার পরও বুঝতে পারছেন না?’
অথচ ছোটবেলায় আমরা যখন একই প্রশ্ন হাজারবার করতাম, তখন বাবা বিরক্ত না হয়ে হাজারবার উত্তর দিয়েছিলেন। কারণ তখন তিনি সব বুঝতেন।
আমরা যখন কোনো সমস্যায় পড়ে চিন্তায় বসে থাকি, মা এসে কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলি—‘বেশি কথা বলো না, খুব চিন্তায় আছি। এখান থেকে যাও। এসব তুমি বুঝবে না।’
অথচ ছোটবেলায় আমাদের সামান্য একটি সমস্যাও মা বুঝে ফেলতেন।
একসময় যাঁরা সব বুঝতেন, কালের পরিক্রমায় তাঁরাই আজ আমাদের কাছে কিছু বোঝেন না, কিছু জানেন না। আর আমরা তাঁদের মূর্খ, সেকেলে কিংবা বিবেকহীন উপাধিতে ভূষিত করি। কী অদ্ভুত!
তাঁরা কিন্তু সবই বোঝেন—ঠিক আগের মতোই।
অভিজ্ঞতা বলে একটা কথা আছে। আমরা যখন থেকে বুঝতে শুরু করেছি, তার অনেক আগেই থেকে তাঁরা বুঝতে শুরু করেছিলেন। আমরা যতই বুঝি না কেন, তাঁদের অভিজ্ঞতার কাছে আমাদের বোঝাপড়া খুবই সামান্য।
হ্যাঁ, আমরা হয়তো তাঁদের চেয়ে বেশি বুঝি—এমনটাই ভাবি। আর সেই ‘বেশি বুঝার’ অহংকারেই কখনো কখনো তাঁদের প্রতি এমন নিষ্ঠুর হয়ে উঠি যে, তাঁদের ওপর অকথ্য নির্যাতন করতেও দ্বিধা করি না। তবুও এত কিছুর পরেও তাঁদের হৃদয়ের গভীরে আমাদের জন্য একটি অনুভূতি থেকে যায়।
আমরা যতই দূরে চলে যাই, যতই তাঁদের ভুলে যাই, তাঁদের চিত্তের একটি জায়গা জুড়ে আমরা ঠিকই থেকে যাই। আমরা সেটা স্বীকার করি কিংবা না করি—এটাই নির্মম অথচ চরম সত্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের মনে হয়তো তাঁদের জন্য সেই অনুভূতিটুকুও থাকে না। কারণ আমরা এখন বেশি বুঝি! ভালো থাকুক ধরিত্রীর বুকে বসবাসরত আমাদের ক্ষৌণীরা।
লেখক: মোহাম্মদ ওমর শওকত, প্রধান শিক্ষক, পানির ছড়া এসএইচডি মডেল হাই স্কুল, রামু।






