‘গাইবান্ধায় বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের শাসন নাই। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার শাসনও নাই। গোবিন্দগঞ্জে মোশতাকের শিষ্যদের শাসন চলছে।’ সাঁওতালদের ওপর হামলায় আওয়ামী লীগের এক এমপি ও ইউপি চেয়ারম্যানের জড়িত থাকার অভিযোগের প্রসঙ্গে ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য এই কথা বলেন। রবিবার দুপুরে ঢাকার বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে মাদারপুর সাঁওতাল পল্লীতে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এই কথা বলেন। তিনি আওয়ামী লীগে শুদ্ধি অভিযানের দাবি জানান প্রধানমন্ত্রীর প্রতি।খবর বাংলা ট্রিবিউনের।
এদিকে রবিবার আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দলও মাদারপুর পরিদর্শনে যান। সকালের দিকে কেন্দ্রীয় পূজা উদযাপন কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ড. নিম চন্দ্র ভৌমিকের নেতৃত্বে অপর একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সবগুলো দলই ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সাহায্যের আশ্বাস দেন।
ঢাকার বিশিষ্ট নাগরিকদের প্রতিনিধি দলটি বেলা ২টার দিকে মাদারপুরে যান। ওই প্রতিনিধি দলে ছিলেন- ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা কাজল দেবনাথ, মানবাধিকার কর্মী খুশী কবীর, শারমিন মুরশিদ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবদুল্লাহ আল কাফি রতন, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, জনসংহতি সমিতির দীপায়ন খীসা প্রমুখ।
অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত চারজন সাঁওতাল হত্যায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় মামলা না নেওয়ার কথা উল্লেখ করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘এই ইক্ষু খামারের সাড়ে ৫ হাজার বিঘা জমির মধ্যে সাড়ে চার হাজার বিঘা জমি সাঁওতালদের পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে অধিগ্রহণ করা। কিন্তু আজ মিল কর্তৃপক্ষ সেই অধিগ্রহণের চুক্তি ভঙ্গ করেছে। তাই সাঁওতালদের পূর্ব পুরুষের জমি ফেরত দিন। গত ৬ নভেম্বরের হত্যার পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে বের করে তাদের বিচার করুন।’
মানবাধিকার কর্মী খুশী কবীর চিকিৎসাধীন আহত সাঁওতালদের হাসপাতালের বেডে হাতকড়া পড়ানোর নিন্দা জানান। তিনি অবিলম্বে তাদের হাতকড়া খুলে দেওয়ার ও এই ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে তারা শাড়ি, লুঙ্গি, কম্বল ও নগদ টাকা সহায়তা প্রদান করেন।
এর আগে রবিবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল সাঁওতাল পল্লী মাদারপুরে যান। ওই প্রতিনিধি দলে ছিলেন সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক টিপু মুন্সী, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী এবং কেন্দ্রীয় সদস্য রেমন্ড আরেং। এছাড়া আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য (গাইবান্ধা-জয়পুরহাট) উম্মে কুলসুম স্মৃতি, গাইবান্ধা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সৈয়দ শামস উল আলম হিরু, সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দিক প্রমুখ সেখানে যোগ দেন।
এ সময় অন্যান্য অধিবাসীদের সঙ্গে রমিলা কিসকু ও রুনা সরেন অভিযোগ করে বলেন, ‘গোবিন্দগঞ্জ আসনের এমপি আবুল কালাম আজাদ এবং সাপমারা ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আহম্মেদ বুলবুল আমাদের চিনিকলের ইক্ষু খামারের জমিতে বসিয়েছে। আবার তারাই আমাদের সেখান থেকে উচ্ছেদ করেছে।’ সাঁওতালদের ওপর হামলা ও হত্যার বিচার, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ক্ষতিপূরণ, নিরাপত্তা এবং বাপ-দাদার জমি ফেরতের দাবি জানান তারা।
মাদারপুর ক্যাথলিক চার্চ প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের সমাবেশে বক্তারা ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দেন। সাঁওতাল পল্লীতে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করে তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার সুবিধা করে দেওয়াসহ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেন তারা। এছাড়া জমির বিষয়টি আইনগতভাবে দেখে সমাধান করা হবে বলে তারা উল্লেখ করেন।
আওয়ামী লীগের অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক টিপু মুন্সী আহতদের চিকিৎসার জন্য ব্যক্তিগতভাবে এক লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেন।
বিভিন্ন প্রতিনিধি দল গোবিন্দগঞ্জ পরিদর্শণ করার সময় সাংবাদিকদের কাছেও অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। মাদারপুর গ্রামের সুভাষ হেমভ্রম জানান, স্থানীয় বাঙ্গালিদের সঙ্গে তাদের দীর্ঘকালের সহাবস্থান ও অত্যান্ত আন্তরিক সম্পর্ক। কিন্তু কিছু সংখ্যক প্রতারকের কারণে তারা যেমন সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারে বসতি গড়ে ছিলেন। তেমনি ওই প্রতারকরাই আবার সেই বসতি থেকে আজ তাদের উচ্ছেদ করলো। লাভ-ক্ষতির হিসাবে তাদের সহায় সম্পদ সব ধ্বংস হয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের সম্পর্কে ফাটল দেখা দিয়েছে।
তিনি আরও জানান, অনেকে পুলিশের ভয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। দিনে এলাকায় থাকলেও রাতে আবার তারা অন্যত্র গিয়ে ঘুমান। ঘটনার দিন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিরপেক্ষ ভূমিকা না রাখায় প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখতে ভয় পাচ্ছেন তারা।
এদিকে স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, সহায়তা করার জন্য বার বার ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে গিয়ে কোনও সারা পাননি তারা। গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান জানান, ঘটনার পর ত্রাণ, পুনর্বাসনসহ যে কোনও ধরনের মানবিক সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য ওই দুই পল্লীতে যাওয়া হলেও তারা কাছে ভিড়ছে না।
সাহেবগঞ্জ ফার্ম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল বাকি বলেন, ‘জেলা ও উপজেলা প্রসাশন, জনপ্রতিনিধি ও স্কুলের শিক্ষক সবাই মিলে চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু ভুক্তভোগীরা কারও ওপর আস্থা রাখতে পাচ্ছে না। উচ্ছেদ ঘটনার পর থেকে ভয় ও আতঙ্কে সাঁওতাল পল্লীর শিশু-কিশোররা বিদ্যালয়ে আসছে না।’
প্রসঙ্গত, গত ৬ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রংপুর চিনিকলের জমিতে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে তীরবিদ্ধ হন ৯ পুলিশ সদস্য এবং গুলিবিদ্ধ হন চার জন সাঁওতাল। এদের মধ্যে তিন জন সাঁওতাল নিহত হন। পরবর্তীতে পুলিশ-র্যাব ওই দিন সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এক অভিযান চালিয়ে মিলের জমি থেকে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করে। এসময় তাদের ঘরবাড়িতে আগুন দেয় ও লুটপাট চালায় স্থানীয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় গোবিন্দগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক কল্যাণ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রবিবার রাতে ৩৮ জনের নাম উল্লেখ করে সাড়ে ৩শ’ জনকে আসামি দেখিয়ে মামলা দায়ের করেন। এপর্যন্ত পুলিশ চার জনকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু হত্যা ঘটনায় এখনও কোনও মামলা হয়নি। ওই ঘটনায় কোনও তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়নি।
এদিকে, সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতাল পরিবারদের পুনর্বাসন ও ত্রাণ সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মো. আব্দুস সামাদ রবিবার জানান, ৬ মেট্রিক টন চাল এবং ৫০ হাজার টাকা জরুরি ত্রাণ বরাদ্দ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ১শ’ ৫০টি পরিবারের মধ্যে এই ত্রাণ প্যাকেজে খাদ্য সহায়তা বাবদ চাল, ডাল, তেল ও আলু প্রদান করা হয়। এছাড়া গৃহহীন ছিন্নমুল সাঁওতাল পরিবারদেরকে পুনর্বাসন করার লক্ষ্যে গোবিন্দগঞ্জের কাটাবাড়ি এলাকায় ১০ একর খাস জমি বরাদ্দ করা হয়েছে।






