দৈনিকশিক্ষা:
প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে সকল শিক্ষার ভিত্তি। এখানে শিশু যে শিক্ষা অর্জন করে তা ভবিষ্যত্ জীবনে প্রতিফলিত হয়। শোলাকিয়া ও গুলশানের হলি আর্টিজানের ঘটনা হয়তোবা আমাদের চিন্তাকে আরো জাগ্রত করে। তবু আমরা যারা শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করি তারা অন্তত একটা সিদ্ধান্তে উপনীত।
প্রাথমিক শিক্ষাকে আর একটু ঢেলে সাজাতে হবে। আমাদের শিক্ষার্থীদের আদর্শিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। তাহলে আমাদের সন্তানেরা কোনোদিন জঙ্গি হয়ে উঠবে না।
কোনো ধর্মই মানুষ হত্যা অনুমোদন করে না। ইসলামের নামে যে সব তরুণ জঙ্গিবাদের দিকে যাচ্ছে, তারা ভুল পথে যাচ্ছে। এই পথ ঠিক নয়। এর মাধ্যমে তারা দেশেরও ক্ষতি করছে। এসব কথা যদি শিক্ষকরা ছাত্রদের বলেন, তাহলে কি তারা এ পথে যেতে পারবে?
কারো চিন্তাধারা ঠিকমতো বিকশিত না হলে বা যথার্থ জ্ঞান না থাকলে জঙ্গিরা তাদের বিপথে চালিত করতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বাংলাদেশ এসব সম্পর্কে যথাযথভাবে জানলে ওই তরুণরা সেই পথে যেত না। কাজেই সব তরুণকে এ সম্পর্কে জানাতে হবে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যে শিশুরা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানে, বাংলা সংস্কৃতি জানে, বীরশ্রেষ্ঠদের কথা জানে, ইসলাম সম্পর্কে জানে তারা বড় হয়ে কখনোই জঙ্গি হতে পারে না। কারণ শৈশবের শিক্ষাটাই তার ভবিষ্যত্ জীবনকে প্রভাবিত করে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কিছু ত্রুটি দূর করতে হবে। আমাদের ছাত্রছাত্রীরা আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর, সমাজ বিচ্ছিন্ন হিসেবে গড়ে উঠছে। সমগ্র শিক্ষাকাঠামোই শিক্ষার্থীদের নিজের ক্যারিয়ার ভালো করার শিক্ষা দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতা, প্রশ্ন করার মানসিকতা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা গড়ে উঠছে না।
শিক্ষা ব্যবস্থা এখানে ব্যর্থ হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সৃজনশীলতার বিকাশের জন্য অন্য যে অনুষঙ্গগুলো খুবই জরুরি, সেগুলো নেই। খেলাধুলা, শরীরচর্চা, নাটক, গান, আবৃত্তি, সাংস্কৃতিক শিক্ষাদীক্ষা এগুলো উঠে গেছে। শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় শিক্ষা এবং মানবতাবোধের শিক্ষা দেওয়াটা জরুরি ছিল।
বাবা-মায়ের কোলই হচ্ছে সন্তানের জন্য প্রথম পাঠশালা। পিতা মাতা সন্তানকে ভালো আদব-কায়দা ও স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে শিক্ষা দেবেন। বাবা-মার উচিত সন্তানদের সময় দেওয়া যাতে করে তারা সন্তানদের কিসে আগ্রহ, তাদের বন্ধুবান্ধব কারা ইত্যাদি বুঝতে পারেন এবং সেই মোতাবেক সঠিক নির্দেশনা দিতে পারেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে সে কী করে, কোথায় যায়, কার সঙ্গে চলাফেরা করে এসব খবর রাখতে হবে। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুর মতো সব কথা শেয়ার করতে হবে।
একজন শিক্ষকের কাজ শুধু সিলেবাস শেষ করাই নয়, নীতি-নৈতিকতা শিখিয়ে তাকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে তৈরি করা। এজন্য পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও বিভিন্ন বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সে যেন একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
শিশু-কিশোরদের মানবিকতা বিকাশের পথগুলো প্রশস্ত করতে হবে। গণতন্ত্র কী? মূল্যবোধ কী? ইসলাম কী? — এগুলো পরিপূর্ণভাবে জানতে হবে। বন্ধুরা বন্ধুদের কষ্ট শেয়ার করবে। একজন অপর জনকে বিপদের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করবে— এ শিক্ষা শিশু বয়সেই লাভ করবে।
একটা শিশুর ভেতর যদি সত্যিকার দেশপ্রেম ও শুভবুদ্ধির উদয় হয়, তাহলে সে কোনোদিন জঙ্গি হতে পারবে না। প্রাথমিক শিক্ষায় আমরা জঙ্গিমুক্ত বাংলাদেশের এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে চাই।






