বাবুল শর্মা:
জন্মাষ্টমী প্রতি বছরই আসে। ভগবান শ্রী কৃষ্ণকে নিয়ে সমগ্র হিন্দু সমাজ আজ জেগে উঠেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন এই দিনে উপবাস করে, পূজা করে, নাম সংকীর্তন করে। কথায় বলে সনাতন ধর্মের বারো মাসে তেরো পার্বন। এগুলোর মধ্যে জন্মাষ্টমীই শ্রী কৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি অন্যতম।
আজ সনাতন ধর্মের প্রাণপুরুষ মহাবতার শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথিশুভ জন্মাষ্টমী। এই মহাপুণ্য তিথিতে দেবকী ও বাসুদেবের আকুল প্রার্থনায় সাড়া দিয়া অত্যাচারী কংসের কারাকক্ষে পুত্ররূপে আবির্ভূত হন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।
শ্রীমদ্ভগবদ গীতায় উল্লেখ আছে, ‘যখনই পৃথিবীতে অধর্মের প্রাদুর্ভাবে ভক্ত ও সাধারণের জীবন দুর্বিষহ ও অতিষ্ঠ হইয়া ওঠে, দুরাচারীর অত্যাচার ও নিপীড়ন বৃদ্ধি পায়, তখন ধর্ম সংস্থাপনের জন্য কৃপাবশত ঈশ্বর অবতার রূপে এই নশ্বর পৃথিবীতে আগমন করিয়া থাকেন। তাঁর আবির্ভাবে ধরণী হয় পাপভারমুক্ত। সাধুসজ্জন ও ভক্তদের মনে সঞ্চারিত হয় অনাবিল আনন্দ। তাঁহার এই জন্মলীলাই জন্মাষ্টমী হিসাবে অভিহিত ও স্মরণীয়।’
বলাবাহুল্য, ইহা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই পৃথিবীতে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্মধারী শ্রীকৃষ্ণরূপে আবির্ভূত হইয়াছিলেন দ্বাপর যুগে। তাঁর জন্ম হইয়াছিল বর্ণমালা পিতাসন পরিহিত অবস্থায়। ছিল বহুমূল্য বলয় ও মণিমুক্তাখচিত অলংকারাদি। তাঁহার আগমনী বার্তায় কারাগারের লোহার শিকল ও বন্ধ দরজা আপনা-আপনি উন্মুক্ত হয়ে যায়। অঝোর বারিধারার বর্ষণ হতে রক্ষায় অনন্তদেব ফণা বিস্তার করে চক্রধারণ করেন। ভরা ভাদ্রের প্রমত্তা যমুনা তাঁর গমনপথ সুগম করে দেয়।
তিনি মানবদেহ ধারণ করে ১২৫ বৎসর জীবিত ছিলেন। তাঁর জীবনকালকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মথুরায় তাঁর জন্ম, গোকুলে নন্দালয়ে পরিবর্ধন, মথুরায় কংস বধ, রাজ্যাধিকার, কুরুক্ষেত্রে পা-বদের সঙ্গে সখ্যতা, দ্বারকায় রাজধানী স্থানান্তর ও অতঃপর লীলাবসান।
শ্রীকৃষ্ণের শ্রেষ্ঠ অবদান শ্রীমদ্ভগবদ গীতা। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণের মুখ নিঃসৃত বাণীসমূহই এই মহাগ্রন্থে স্থান পেয়েছে। সব বেদ ও উপনিষদের ইহাই সারসংক্ষেপ। গীতায় ঈশ্বর সাধনার বিভিন্ন পথ রয়েছে। জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তি-যেকোন পথ ধরে সাধনা করলে ঈশ্বরকে লাভ করা যায়।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের পরমাত্মীয়। সনাতনী ধর্ম ও ইতিহাসের এক আধ্যাত্মিক ও অবিস্মরণীয় পুরুষ। তাঁর গীতা মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায়, বিশ্বাস ও প্রেমেই শ্রীকৃষ্ণকে পাওয়া যায়। তিনি অপরাজেয়, ক্ষমাশীল ও পুণ্যময়। তাঁর শুভ আবির্ভাব তিথিতে আমরা বিশ্বের সব মানব সমাজ ও জীবের কল্যাণ কামনা করি। এই দিনে মন্দিরে মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ প্রার্থনা, কীর্তন, গীতাপাঠ, ধর্মীয় সঙ্গীত, আলোচনা সভা, মহাপ্রসাদ বিতরণ ও কৃষ্ণপূজা। পথে পথে বের হয় নয়নাভিরাম শোভাযাত্রা ও আনন্দ মিছিল।
ঈশ্বর ভক্তের কাছে সাকার, আবার তিনি জ্ঞানীর কাছে নিরাকার। শ্রী ভগবত গীতায় বলা আছে, যে ভক্ত যেভাবে আমার উপাসনা করে আমি তাকে সেভাবেই পুরস্কৃত করি। হে পার্থ! মানুষ সর্বপ্রকারে আমার পথেরই অনুসরণ করে, অর্থাৎ মানুষ যে পথই অনুসরণ করুকনা কেন, সব পথেই আমাকে পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশ একটি ধর্ম সহিষ্ণু ও উদার দেশ। এরপরও এসব কর্মসূচি সফল করে তুলতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি, মাননীয় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতবৃন্দ, জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ প্রশাসন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, উপজেলা পুলিশ প্রশাসন, পৌর কর্তৃপক্ষ, বিদ্যুৎ বিভাগ, সাংবাদিক, পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দসহ সর্বস্তরের জনগণের সার্বিক সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য।
শরতের এই পূর্ণলগ্নে ভগবান শ্রী কৃষ্ণের নিকট প্রার্থনা জানাই, তিনি বিশ্বের সকল মানুষ এবং সাম্প্রতিক বিপর্যয়ে সমগ্র বিশ্বের আপামর জনসাধারণকে সুখে শান্তিতে ও আনন্দে রাখুক।
জন্মাষ্টমী/২০১৬ উদযাপন সুন্দর ও সার্থক হউক, ইহাই আমাদের প্রত্যাশা। এই উপলক্ষে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানাই জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও উষ্ণ অভিনন্দন।







