নিজস্ব প্রতিনিধি, চকরিয়া:
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড থেকে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন শ্যামল বড়ুয়া। এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া তেমন কঠিন বিষয় নয়। কিন্তু যাঁরা শ্যামলের গল্প জানেন, তাঁদের কাছে এই ফলাফল অনন্যই মনে হবে। শ্যামলের অসুস্থ বাবা লেখাপড়ার খরচ জোগাতে পারেননি। অদম্য এই তরুণ মুদি দোকানে কাজ করেন ও অন্যকে পড়িয়ে নিজের লেখাপড়ার খচর জোগাড় করেছেন। কেবল তা–ই নয়, বোনের লেখাপড়ার খরচও জুগিয়েছেন তিনি। এলাকার লোকজনের মুখে মুখে ফিরছে এখন তাঁর গল্প।
শ্যামলের বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ঘুনিয়া গ্রামে। গত ২৮ আগস্ট তাঁর বাড়ি গেলে নিজের সাফল্যের কথা শোনান তিনি।
শ্যামলের বাবা বাদল বড়ুয়া ২০১২ সাল থেকে অসুস্থ। তাঁরা তিন বোন এক ভাই। দুই বোনের আগেই বিয়ে হয়েছিল। বাবার অসুস্থতার পর বন্ধ হয়ে যায় শ্যামল ও তাঁর ছোটবোন তৃষ্ণার পড়ালেখা। লেখাপড়া বন্ধ হওয়ায় সে বছরই বাড়ি ছাড়েন শ্যামল। পাশের জেলা বান্দরবানের লামা উপজেলার লামামুখ বাজারে গিয়ে চাকরি নেন একটি মুদির দোকানে। দোকানের মালিক পরিমল কান্তি দাশের অনুপ্রেরণায় ভর্তি হন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের লামা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় শাখায়। সারা দিন দোকানে চাকরির পর রাত জেগে পড়ালেখা চালিয়ে যান তিনি। পাশাপাশি ছোট বোনকেও পড়ালেখার খরচ জোগান। ২০১৪ সালে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ ৪ দশমিক ৬৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। তাঁর খরচেই এখন ছোট বোন তৃষ্ণা বড়ুয়া দিগরপানখালী উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়ছে।
শ্যামল বড়ুয়া বলেন, ‘মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পাসের পর চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে চকরিয়া কমার্স কলেজের ব্যবসায় বিভাগে ভর্তি হই। বাড়ি থেকে কলেজের দূরত্ব দুই কিলোমিটার। পুরো পথটাই হেঁটে যেতে হতো। সন্ধ্যায় পড়তে বসতে হতো কুপির আলোয়। এরপর শিক্ষকদের সহযোগিতায় এগোতে থাকে পড়ালেখা। মুদি দোকানের কাজ ছেড়ে টিউশনি করে লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করি। কয়েকজন শিক্ষক আমাকে বিনা পয়সায় প্রাইভেট পড়াতেন।’
শ্যামল বড়ুয়া আরও বলেন, ‘আমার মা সব সময় পড়ালেখায় অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ জোগাতেন। যখন পড়ালেখার খরচ জোগাড় করতে পারতাম না, তখন মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে আমাকে খরচ দিতেন। কলেজের শিক্ষকদের সহযোগিতা ছাড়া এ অর্জন সম্ভব হতো না।’
চকরিয়া কমার্স কলেজের শিক্ষক মো. ইলিয়াছ আজাদ আমাদের রামু কে বলেন, ‘শ্যামল অদম্য মেধাবী। কলেজে ভর্তির প্রথম বছরেই তাঁর মেধা দেখে শিক্ষকেরা তাঁর প্রতি হাত বাড়িয়ে দেন। যে যেভাবে পেরেছেন সহযোগিতা করেছেন। অবশেষে কলেজের একমাত্র জিপিএ-৫ তাঁর হাত ধরেই এসেছে।’
কলেজের অধ্যক্ষ ওমর ফারুক বলেন, ‘অদম্য ইচ্ছাশক্তি না থাকলে অন্যকে পড়িয়ে জিপিএ-৫ পাওয়া সম্ভব নয়। তাঁর সাফল্যের পেছনে মূলত তাঁর এই ইচ্ছাই বড় শক্তি। তাঁর পড়ালেখা নির্বিঘ্ন করতে সমাজের বিত্তবানদের তাঁর পাশে দাঁড়ানো উচিত।’







