সুনীল বড়ুয়া,সীমান্ত এলাকা থেকে ফিরে:
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অস্থিরতার কারণে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ তো আছেই,এখন এরসাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মাদক চোরাচালান। আর চোরাচালানের জন্য প্রধান রুট হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে নাফনদীকে। নাফনদী কেন্দ্রিক দুই দেশের কিছু দালাল রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পাশাপাশি এখন মাদক চোরাচালানীদের সহযোগিতা করছে।
স্থানীয়রা বলছেন, উখিয়া,টেকনাফ এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের অন্তত ২০টি পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পাশাপাশি এখন মাদক চোরাচালান বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে আশীর্বাদ হিসাবে কাজ করছে মিয়ানমারে বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক।
বিজিবি সুত্রে জানা গেছে,শুধুমাত্র নভেম্বর মাসেই পাচারকালে ১৮ লাখ ৩৮ হাজার ২৩৯ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় আটক করা হয় ২৮ জনকে। এসব ঘটনায় ৩৩জনকে অভিযুক্ত করে বিজিবির পক্ষ থেকে থানায় ৪২ মামলা করা হয়। এছাড়া ওই মাসেই ওইমাসে বিয়ার ,মদ,ফেন্সিডিলসহ প্রায় ১০ লাখ টাকার নিষিদ্ধ পণ্য জব্দ করা হয়। শুধু মাদক চোরাচালান নয়,বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের চেষ্ঠাকালে প্রায় দুইহাজার রোহিঙ্গা বোঝাই অন্তত ২০০টি নৌকাকে নাফনদী থেকে স্বদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
কোষ্টগার্ড সুত্রে জানা গেছে,সর্বশেষ গতকাল শনিবার (৩ নভেম্বর) ও আগেরদিন শুক্রবার দুইদিনে ২ লাখ ৮৫ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এসময় আটক করা হয়েছে ১৫ পাচারকারীকে।
সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে,মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনায় দলে দলে রোহিঙ্গারা এদেশে অনু প্রবেশ করছে। এদের বেশিরভাগ আশ্রয় নিচ্ছে টেকনাফের লেদা ও উখিয়ার কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। তারা জানায়, রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশকালে সীমান্তে বা নাফনদীতে সীমান্ত রক্ষিবাহিনীর হাতে ধরা পড়লেও মানবিক কারণে তাদের আইনের আওতায় আনা হয়না। বরং তাদের মানবিকত সহায়তা দিয়ে স্বদেশে ফেরত পাঠানো হয়।
এ অবস্থায় এ বিষয়টিকে সুযোগ হিসাবে নিয়েছে চোরাকারবারীরা। চোরাকারবারিরা রোহিঙ্গা বোঝাই ছোট ছোট নৌকায় করে এখন নিয়ে আসছে ইয়াবার বড় বড় চালান। নাফনদী কেন্দ্রিক মিয়ানমার ও বাংলাদেশের কিছু দালালের সহযোগিতায় নাফনদীকেই চোরাকারবারিরা পাচারের নিরাপদ রুট হিসাবে ব্যবহার করছে। এ সময় কিছু কিছু চালান আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেও বেশিরভাগই পাচার হচ্ছে দেশের বিভিন্নস্থানে।
তারা জানান, বিশেষ করে টেকনাফের খারাংগ্যাঘোনা, লম্বাবিল, কান্জরপাড়া, ঝিমংখালী মিনা বাজার, নয়াবাজার, খারাংখালী, মৌলভী বাজার, হ্নীলা, আলীখালী, লেদা, নয়াপাড়া, জাদীমুরা, দমদমিয়া, জালিয়াপাড়া, নাজিরপাড়া, নাইট্যংপাড়া, সাবরাং ও শাহপরীরদ্বীপ বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম, তুমব্রু, উখিয়ার থাইংখালীর রাহমতের বিল ও পালংখালীর বটতলী এলাকাকে চোরাকারবারিরা নিরাপদ রুট হিসাবে ব্যবহার করছে।
নাম প্রকাশে অনিশ্চুক টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকার এক বাসিন্দা জানান,বাংলাদেশ-মিয়ানমার দুই পাড়ের পেশাদার কিছু চোরাকারবারি এখন জেলের ছদ্মবেশে ইয়াবা পাচারে নেমেছে। এমনকি এসব জেলেরা আইনশৃংখলা বাহিনীর সন্দেহ এড়াতে নৌকায় মাছ ধরার জাল,খাবার-দাবারসহ ধরার নানা উপকরণও মজুদ রাখছে। এসব চোরাচালান সিন্ডিকেটে দু’পাড়েই দালাল রয়েছে। এসব দালারেরা এ পাড়ে বিজিবি এবং ওপারে বিজিপির গতিবিধি অনুসরণ করে,পরে মোবাইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করে সীমান্তের সুবিধাজনক ও নিরাপদ স্থান দিয়ে মাদক বিভিন্নস্থানে পাচার করে।
উখিয়া রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ ও প্রত্যাবাসন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নুর মোহাম্মদ সিকদার জানান, সীমান্তে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ এবং মাদক চোরাচালান হয় মূলত দু’দেশের কিছু দালালের বোঝাপড়ার মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে দুদেশের মধ্যে যোগাযোগে বড় আর্শিবাদ হচ্ছে মোবাইল নেটওর্য়াক। টেকনাফ সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে স্থাপিত একাধিক মোবাইল কোম্পানির টাওয়ারের ফ্রিকোয়েন্সি মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রায় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। যে কারণে মিয়ানমারে অবস্থানরত চোরাচালানিরা বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্কের ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে মুঠোফোনের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে। ফলে দুদেশের চোরাচালানীরা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গতিবিধি লক্ষ্য করে একে অপরকে তথ্য সরবরাহ করে থাকে।
উখিয়ার কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আবু সিদ্দিক এ প্রতিবেদককে জানান, এ ক্যাম্পে আগে থেকেই ৪২ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করে আসছে। এখন এরসাথে নতুন যোগ হয়েছে আরো প্রায় একহাজার ৫শ পরিবার। এভাবে প্রায় প্রতিদিনই রোহিঙ্গারা আসতে থাকায় এখানে এখন থাকা খাওয়ার চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
একই অবস্থা টেকনাফের লেদা অনিবন্ধিত ক্যাম্পেও । এ ক্যাম্পের চেয়ারম্যান দুদু মিয়া ও এ ব্লকের নেতা (মেম্বার) মো. ইলিয়াছ জানান, এ ক্যাম্পে ছয়টি ব্লকে আগে থেকে বসবাস করতো ২ হাজার ৯২টি পরিবার। গত দুই সপ্তাহে এখানে নতুন আশ্রয় নিয়েছে আরো দেড়হাজার পরিবার। এখন এ ক্যাম্পেও মানবিক সংকট চলছে বলে তারা জানান।
টেকনাফের ২ বিজিবির অধিনায়ক লে.কর্ণেল মো.আবুজার আল জাহিদ আমাদের রামু কে বলেন, মিয়ানমারে সহিংসতা দেখা দেওয়ার পর থেকে সীমান্তে বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে। বিজিবি’র সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। তবুও অনুপ্রবেশ যে হচ্ছেনা তা নয়। এছাড়া আমাদের অংশে কাটা তারের বেড়া নেই,সীমান্ত সড়ক নেই, নানা সমস্যা এবং সীমাবদ্ধতার মাঝে কাজ করে যাচ্ছে বিজিবি। এ কারণে আসাধু লোকজন সুযোগ নিবেনা তা বলা যাবেনা। তিনি বলেন,বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত নাফ নদীর বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের রোহিঙ্গা বোঝাই ৯ টি নৌকা ফেরত পাঠানো হয়েছে। প্রতিটি নৌকায় ১০ জনের বেশি রোহিঙ্গা ছিল।
টেকনাফ কোস্টগার্ড স্টেশন কমান্ডার মো.নাফিউর রহমান আমাদের রামু কে জানান, কোস্টাগার্ড নাফ নদীর মোহনা থেকে ২০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত টহল দিতে পারে। নাফ নদী ও উপকূলের পুরো অংশ তাদের টহলের আওতায় নেই। তবুও যদটুকু সম্ভব বিজিবির সাথে সমন্বয় তারা কাজ করে যাচ্ছে।






